“আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য কি এবং পথিমধ্যে কি কি বিপদ হতে পারে তা আমি জানি সুলতানে আলী মাকাম। মেহেরবানী করে আপনি আমাকে অনুমতি দিন, যাতে আমি নিজের পছন্দমতো সহযোদ্ধা নির্বাচন করতে পারি। আশা করি, বেঈমান গুপ্তঘাতকরা আমাদের অগ্রযাত্রা রুখতে পারবে না।”
সুলতান মাহমূদ সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহকে বললেন, “কাসেমকে তার পছন্দমতো সহযোদ্ধা নির্বাচনের সুযোগ দিন।”
অগ্রগামী দলে নির্ভীক, সাহসী ও পারদর্শী পাঁচ’শ যোদ্ধা বেছে নিলো কাসেম। তারা পেশোয়ার থেকে সবার আগে রওয়ানা হলো। এই দলের অধিনায়ক কাসেম বিন ওমর। কাসেমের অশ্ব সবার আগে। তার পাশাপাশি অন্য একটি ঘোড়ায় আরোহী এক মহিলা। কাসেম জানতো, নিকাব পরিহিতা সহযাত্রী কে। বেশ কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর কাসেমের ঘোড়া থেমে গেল। থেমে গেল কাফেলা। কাসেম নিজ অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে নিকাব পরিহিতার মুখোমুখি হয়ে বললো, “এখন আমাকে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দাও মা!” মহিলার কদমবুচি করে বলল কাসেম।
মাও ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন। কাসেমের ডান বাহুতে তাবিজের মতো একটা ছোট্ট পুটলী বেঁধে বললেন- “এটা পবিত্র কুরআনের সেই আয়াত যার বরকতে সকল বাধা পায়ে দলে তোমরা মঞ্জিলে পৌঁছে যাবে সাফল্যের সাথে । শর্ত হলো, তোমার ঈমানদারীর উপর অবিচল থাকতে হবে। মানুষের শারীরিক সামর্থ অটুট রাখতে হলে ঈমানী শক্তি মজবুত থাকা অপরিহার্য। আলবিদা হে প্রিয় পুত্র! যদি তুমি জীবিত ফিরে এসো তাহলে খুশি হবো, তবে সবচেয়ে খুশি হবো যদি তোমার লাশ ফিরে আসে আর তোমার শাহাদাঁতের বিনিময়ে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে।” এতটুকু বলার পর মায়ের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। আবেগে তার শরীর কাঁপতে শুরু করল। দু’চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুর অঝোর ধারা।
কাল বিলম্ব না করে কাসেম এক লাফে অশ্বপৃষ্ঠে উঠে বসে ঘোড়ার বাগে টান দিল। চলতে শুরু করল অগ্রগামী কাফেলা। অনেক দূরে গিয়ে পিছনে ফিরে তাকাল কাসেম। একটি টিলার উপরে ছায়ার মতো অস্পষ্ট একজন অশ্বারোহী গোচরীভূত হলো। কাসেম অনুমান করল, তার মা হাত নাড়িয়ে তাকে আলবিদা জানাচ্ছেন। ঘোড়া সামনে চলতে লাগল। একটি উঁচু টিলা মা ও ছেলেকে অদৃশ্য করে দিল।
পেশোয়ারের এক বিশাল প্রান্তরে সেনাবাহিনীর সামনে এসে সুলতান মাহমূদ যখন দাঁড়ালেন তখন ভোরের অন্ধকার ভেদ করে পূর্বাকাশে সূর্য উঠছে। রসদপত্র বোঝাই করা দীর্ঘ সারি ধীরলয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সৈন্যরা সুলতানের নির্দেশের অপেক্ষায় পঁড়িয়ে।
“মুজাহিদ ভাইয়েরা! আজ তোমরা আমার নির্দেশে নয়, আল্লাহর নির্দেশে অভিযানে বের হচ্ছে। তোমরা আজ এমন এক ভূখণ্ডে যাচ্ছে, যে ভূখণ্ড মুহম্মদ বিন কাসিম ও তার সহযোদ্ধাদের আযানের ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল। কিন্তু বেঈমানেরা এখন আর সে দেশে উচ্চকিত হতে দেয় না সুমধুর আযানের আওয়াজ। সেখানে আজ ইসলামের নাম নিশানা নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম। মসজিদগুলো আজ পরিত্যক্ত। কাফের বেঈমানেরা অপবিত্র করছে আল্লাহর ইবাদতখানাগুলো, দুঃশাসন চলছে জালেমদের। তোমাদেরই বোন-কন্যাদের সম্ভ্রম লুষ্ঠিত হচ্ছে সে দেশের ঘরে ঘরে। সেই নির্যাতিতা মা বোনেরা তোমাদের আগমন অপেক্ষায় অধীর নেত্রে তাকিয়ে রয়েছে।
পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডে যদি একজন মুসলিম নারী নির্যাতনের শিকার হয় তবে সেই নির্যাতিতাকে রক্ষা করার জন্যে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে জিহাদ করা সক্ষম প্রত্যেকটি মুসলমানের জন্যে অবশ্যকর্তব্য। পবিত্র কুরআন নির্দেশ দিয়েছে–’বেঈমানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও, যতক্ষণ না জুলুমের অবসান হয়। পৌত্তলিক বাহিনী তোমাদের উপর তিনবার আক্রমণ করেছে, প্রত্যেকবার তোমরা তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে। হিন্দু রাজারা তোমাদেরকে পদানত, পরাজিত করে ইসলামের শক্তিকে ধ্বংস করে দিতে বদ্ধপরিকর। আজ যে অভিযানে তোমরা যাচ্ছে, এটা মামুলী দুটি বাহিনীর যুদ্ধ নয়, দুটি চির প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শের সংঘাত।
ইসলামই একমাত্র সত্যধর্ম এবং মানবতার মুক্তির সনদ– এই অমোঘ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং পুনর্বার বেঈমানদের জানিয়ে দিতেই পরদেশে আজকের এই অভিযান। মুলতানের পথঘাট অপরিচিত হলেও তোমরা সেটিকে পরদেশ মনে করো না, ওখানকার মাটি মুসলমানদের বরণ করতে উন্মুখ। মুলতানের বৃক্ষ-তরুলতা, মুলতানের জমিন বিন কাসিমের জিহাদী চেতনায় উজ্জীবিত, মুজাহিদ কাফেলার অশ্ব পদচারণায় ধন্য হতে উদগ্রীব। সেখানকার আলো-বাতাস, বৃক্ষ-তরুলতা পর্যন্ত তোমাদের অপেক্ষায় অধীর। তোমাদের স্বাগত জানাতে প্রতীক্ষায় রয়েছে মুলতানের প্রতি ইঞ্চি মাটি। মুলতানের আকাশ তোমাদের তকবীর ধ্বনিতে তৃপ্ত হওয়ার অপেক্ষায় ব্যাকুল।”
সুলতান মাহমূদের আবেগ আপ্লুত ভাষণ দীর্ঘতর হতে লাগল। কমান্ডার ও অধিনায়কদের যুদ্ধকৌশল ও করণীয় সম্পর্কে অফিসিয়াল নির্দেশনা তিনি আগেই দিয়েছিলেন। অভিযান শুরু হওয়ার আগে প্রতিটি সৈনিকের মনে এ প্রত্যয় তিনি জন্মানো জরুরী মনে করলেন যে, “তোমাদের এ যুদ্ধাভিযান দেশের ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধির জন্য নয়, রাজত্ব প্রসারের উদ্দেশ্যে নয়, এটি জিহাদ। মজলুম মুসলমানদের মুক্তির জিহাদ, ইসলামী ভূখণ্ডকে পুনর্দখলের জিহাদ। মুসলমানদের হৃত গৌরব উদ্ধারের জিহাদ, মুছে দেয়া ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করার জিহাদ।”
