“তোমার কি নাম?” জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
“ওর নাম কাসেম বিন ওমর।” কাসেমের পরিবর্তে জবাব দিলেন সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহ। “সে আসেম ওমরের ছেলে।”
কাসেমের দিকে তাকিয়ে সুলতানের চেহারায় ভাবান্তর ঘটল। তিনি একটু নীরব থেকে বললেন, “অগ্রণী দল পরে নির্বাচন করা হবে, তুমি পাশের ঘরে বস, তোমার সাথে পরে কথা বলব।”
অভিযানের সময়, কৌশল ও প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়ে সবাইকে বিদায় করে দিলেন সুলতান। সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহ ও কাসেমকে ডেকে একান্ত বৈঠকে কাসেমকে জিজ্ঞেস করলেন–”তুমি অগ্রণী দলের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী কেন?”
“এ অভিযানে পথে পথে যে সব কঠিন বিপদের মুখোমুখি সুলতানের বাহিনীকে হতে হবে তা সবই আমার পিতার তৈরি। তাই পিতার তৈরি বিপদের মোকাবেলা সবার আগে ছেলেরই করা উচিত বলে আমি মনে করি।” বলল কাসেম।
“মুহতারাম সুলতান! ওর আম্মা আমার কাছে এসেছিল। স্বামীর আত্মহত্যায় তার কোন অনুতাপ নেই। সুলতানের জন্যে তার স্বামীর এতো বড় বিপদাংশকা সৃষ্টির জন্যে সে অত্যন্ত দুঃখিত। সে আমাকে বলেছে, তার ছেলেকে সে আল্লাহর পথে কুরবান করতে চায়। তাকে যেন অগ্রণী বাহিনীতে সুযোগ দেয়া হয়, যাতে সে তার বাবার অপরাধের কাফফারা করার সুযোগ পায়।”
“তুমিও কি তোমার আম্মার মতো আত্মবিশ্বাসী, না তোমার পিতার মতো তুমিও বেঈমানদের শিকারে পরিণত হবে?” কাসেমকে জিজ্ঞেস করলেন সুলতান।
“শপথ করা ছাড়া আপনাকে আশ্বস্ত করার আর কোন উপায় আমার নেই–মহামান্য সুলতান! আমি প্রতিজ্ঞা করে বলতে পারি, মায়ের উদ্দীপনাই আমি ধারণ করি, পিতার দুর্বলতা নয়। সৈনিক হিসেবে আমি পিতার উত্তরসূরী । আমি আমার পিতাকে একজন বিচক্ষণ, সাহসী ও বুদ্ধিমান সেনাপতি হিসেবেই দেখেছি, শুনেছি, কিন্তু তার করুণ পরিণতি দেখার পর বেঈমানদের চক্রান্তের উচিত শিক্ষা দিতে আমি শপথ গ্রহণ করেছি।”
“তুমি হয়তো জানো না, তোমার মায়ের বুকে বেঈমানদের প্রতি কি আগ্নেয়গিরি জ্বলছে। যৌবনের শুরুতেই সে বেঈমানদের দ্বারা অপহৃত হয়ে হিন্দু নরপশুদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছে। তোমার মায়ের মতো তখনকার বহু তরুণীর সৌভাগ্য যে, হিন্দুরা পরাজিত হয়ে ওদের ফেলে চলে যায়। আমরা ওদের উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর লোকদের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেই।
কাসেম! তুমি তরুণ। তুমি হয়তো জান না, হিন্দুরা মুসলমান তরুণীদের সম্ভ্রমহানীকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে। অথচ মুসলমানরা নারীর মর্যাদা রক্ষা আর ইসলামের জন্যে জীবন দিতে কত আন্তরিক ও অকুণ্ঠ! একজন মুসলমান অমুসলিম নারীর সম্ভ্রমকেও পবিত্র আমানত মনে করে জীবন দিয়ে তার সম্ভ্রম রক্ষা করে। ইসলাম নারীর গায়ে হাত দেয়াকে কবীরা গুনাহ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ সাব্যস্ত করেছে, আর বেঈমানরা নারীর সমহানীকে পুণ্যের কাজের মতো উৎসাহিত করে। কাসেম! বিশ্বের কোন মুসলিম তরুণী লাঞ্ছিত হলে সারা বিশ্বের মুসলিম তরুণদের ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া উচিত। মুসলিম তরুণী লাঞ্ছিতের সংবাদে প্রতিশোধ স্পৃহায় বিশ্ব মুসলিমের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। তাই আমাদের মুসলিম বোনদের লাঞ্ছিতের প্রতিশোধ আমাদের নিতেই হবে। নরপশুদের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। না হয় আমাদের সন্তানরা ওদের পাশবিকতা ও দন্ত-নখরাঘাতে বারবার রক্তাক্ত হবে।”
“প্ৰতিশোধ! কন্যা জায়াদের লাঞ্ছিত করার প্রতিশোধ!”
“আমি সেই প্রতিশোধ নিতেই প্রস্তুত। সুলতানে আলী মাকাম!”
“কাসেম! তারুণ্য এক ধরনের অন্ধত্ব।” বললেন সুলতান। “ছোট বেলায় আমি আমার শাইখ ও মুর্শিদের কাছে শুনেছি, মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতার চেয়ে নেক কাজ করার প্রবণতা বেশি শক্তিশালী। কিন্তু সেই প্রবণতা মানুষের ইচ্ছাধীন। মানুষ যদি নিজ ইচ্ছা শক্তিকে নেক কাজ করার প্রতি ধাবিত করে তখনই সে পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। আহ্! তোমার পিতার মৃত্যু আমাকে অতটুকু কষ্ট দেয়নি, যতটুকু কষ্ট দিয়েছে তার নৈতিক অবনতি। সারা জীবনের জিহাদ, ইসলামের খেদমতে নিজের অবদানকে সে মুলতানের কদিনের রঙ তামাশা আর আমোদ-আয়েশে জলাঞ্জলি দিয়ে দিল। এখানে ফিরে এসেছিল সে শুধু শরীরটি নিয়ে; তার হৃদয়কে মুলতানের নাচঘরেই সে হত্যা করে এসেছিল। এই মাটির পাপ পঙ্কিল দেহের মায়া ত্যাগ কর কাসেম, রূহকে পঙ্কিলতা মুক্ত রাখতে চেষ্টা কর। আমার মুর্শিদ শাইখ আবুল হাসান খিরকানী বলেছেন, মানুষের হৃদয় বা আত্মা আল্লাহ্ পবিত্র আমানত। যে এ পবিত্র আমানতে কালিমা লিপ্ত করল, সে আল্লাহর আমানতে খেয়ানত করল। কাসেম! আত্মাকে পবিত্র রাখতে চেষ্টা কর! তোমার পিতা তার রূহকে নাপাক করে ফেলেছিল যার ফলে একজন খ্যাতিমান কৃতি ব্যক্তিত্ব হওয়ার পরও তাকে অপমানজনক মৃত্যুবরণ করতে হলো। তার এই লজ্জাজনক পরিণতির জন্য আমার মনে খুবই কষ্ট কাসেম …।
দেখো, মুলতানের সেই মেয়েটি পাপের সাগরে নিমজ্জিত থাকার পরও সে তার আত্মাকে নেক কাজে নিয়োজিত রেখেছিল। ইসলামের সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। যার ফলে আল্লাহ্ তাকে পাপ-পঙ্কিল জগৎ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে-ই তোমার পিতার অধঃপতন ও চক্রান্তে জড়ানোর কথা আমাকে অবহিত করেছে। দেখোয় ইসলামের জন্যে নিবেদিতা এক অবলা মহিলার দ্বারাও আল্লাহ্ তা’আলা কতো বড় কাজ নিতে পারেন। সে যদি আমাকে যথা সময়ে অবহিত না করতো, তবে না জানি আমাদের কতো কঠিন বিপদের মুখোমুখি হতে হতো। কাসেম! তুমি হয়তো আমাদের অভিযানের উদ্দেশ্য জানো! এটাও হয়তো বুঝতে পেরেছে, পথে পদে পদে কঠিন বাধা ডিঙাতে হবে।”
