আপনি একথা মনে করবেন না যে, মাহমূদের সৈন্যরা এই মুহূর্তে আমাদের উপর হামলা করতে আসছে। মাহমূদ চাচ্ছে মুলতানকে ওদের সেনা ঘাঁটি বানাতে। মুলতানকে কেন্দ্র বানিয়ে মাহমূদ আপনার ও আমার এলাকা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে।
আমি দু’জন গোয়েন্দা পেশোয়ারে পাঠিয়েছি। যখনই মাহমূদের সৈন্যরা মুলতান থেকে রওয়ানা করবে তখনই ওরা দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে আমাকে আগাম খবর দিবে। আমি ঝটিকা বাহিনীকে পাহাড়ী এলাকায় পাঠাচ্ছি। যখনই মাহমূদের বাহিনী সংকীর্ণ পথে এসে ঢুকবে ওরা পাহাড়ের উপর থেকে তীরবৃষ্টি বর্ষণ করে ওদের নাস্তনাবুদ করে ছাড়বে। তাছাড়া ওরা মাহমূদের প্রত্যেক ছাউনীতে রাতের অন্ধকারে ঝটিকা আক্রমণ করে পালিয়ে আসবে। এভাবে ক্রমাগত হামলার শিকার হয়ে ওদের অগ্রসর হতে হবে। মাহমূদের বাহিনী যদি মুলতান পৌঁছতে সক্ষমও হয় তবে তাকে অর্ধেক সৈন্য পথে হারাতে হবে। এরপর মাহমূদকে হত্যার ব্যবস্থাও করে রেখেছি আমি।”
দীর্ঘ সময় আনন্দ পাল ও বিজি রায় সুলতান মাহমূদকে চক্রান্তের বেড়াজালে আটকানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা করল। জনকের তিনবার ধারাবাহিক পরাজয়ের কারণে আনন্দ পাল ছিল সুলতানের আনুগত্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সর্বশেষ যুদ্ধে জয়পালের পরাজয়ের পর মুক্তিপণ ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জয়পাল সুলতানকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এখন থেকে আর কোনদিন তার সেনাবাহিনী সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করবে না এবং যুদ্ধ খরচ আদায় করা ছাড়াও বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর সে সুলতানের কোষাগারে জমা দিবে। কিন্তু জয়পালের ছেলে আনন্দ পাল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আত্মঘাতক বাবার প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে চললো। সে জন্যে আনন্দ পালের মনে সুলতানের আক্রমণ আশংকা ছিল প্রবল। সে কিছুতেই সুলতানকে ঘটাতে চাচ্ছিল না। কিন্তু সুলতানের বাহিনী এদিকে অগ্রসর হোক এটাও ছিল তার কাছে আতংকের ব্যাপার। আনন্দ পাল ভাবছিল, মাহমূদের বাহিনীকে ক্ষতি করতে গিয়ে বিজি রায় আবার তার জন্যে বিপদ ডেকে আনে।
ঝটিকা অভিযানের যে শক্তি মুসলিম সেনাদের রয়েছে, আমাদের সৈন্যদের তা নেই। ঝটিকা অভিযানের জন্যে সৈনিকদের মেধাবী, সাহসী, কৌশলী ও ত্যাগী হতে হয়। আমাদের সৈন্যদের মধ্যে এসবের অভাব আছে।” বলল আনন্দ পাল। “আপনি ঝটিকা বাহিনী পাঠান, তাতে আমার সমর্থন থাকবে কিন্তু আমার পক্ষে সরাসরি কোন সেনাবাহিনী পাঠানো সম্ভব নয়।”
“পেশোয়ার থেকে এদিকে আসতে হলে মাহমুদকে সিন্ধু নদ পেরিয়ে আসতে হবে। সিন্ধু নদের উপরে আমরা নৌকার যে পুল তৈরি করে রেখেছি ওখানে আমি ওদের ঠেকানোর ব্যবস্থা করব, যাতে তারা নদ পেরিয়ে আসতে না পারে। পুলের আশপাশে আমি সৈন্য মোতায়েন করব যাতে ওরা নদ পেরিয়ে আসার সুযোগ না পায়। তারপরও যদি ওরা নদ পার হতে সক্ষম হয় তাহলে ওদের পথ রোধ করার দায়িত্ব আপনার। আমাদের সবার চেষ্টা হওয়া উচিত, ওরা যদি এদিকে এসেই যায় তবে যেন আর জীবিত ফিরে যেতে না পারে।” বললো বিজি রায়।
ওদের ভাবনার চেয়েও দ্রুতগতিতে সুলতানের বাহিনী মুলতান অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। সুলতান কারামাতীদের শিকড় উপড়ে ফেলার জন্য খুব দ্রুত অভিযানের নির্দেশ দিলেন। তার কাছে তখন রসদের কোন ঘাটতি ছিল না, তাই প্রস্তুতি নিতেও তেমন ভাবতে হয়নি। সুলতান সেনাপ্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে তাদেরকে অভিযানের কৌশল বলে নিলেন। তিনি এও বলে দিলেন, “পথিমধ্যে যথাসম্ভব কম ছাউনী ফেলতে হবে। ছাউনী যেখানেই ফেলা হোক, রাতের পাহারা জোরদার রাখতে হবে। গুপ্ত হামলার শিকার থেকে আত্মরক্ষার
জন্যে ছাউনীর আশপাশে ঝটিকা বাহিনী নিযুক্ত রাখতে হবে। কেননা, মুলতান। পর্যন্ত পৌঁছতে প্রতি ক্ষেত্রে গেরিলা আক্রমণের আশংকা রয়েছে। এই আশংকা থেকে বাহিনীকে নিরাপদ রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।”
অগ্রণী দল নির্বাচনে সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহ্ আততায়ীকে নির্দেশ দিলেন সুলতান। বললেন, “এমনটা মনে করো না যে, অগ্রগামী দল পথ পরিষ্কার করে দিবে আর বাকী সৈন্যরা মানুষের ক্ষেতের ফসল, গাছের ফল আর আচার খেতে খেতে নির্বিঘ্নে মুলতান পৌঁছে যাবে। যেখানে আমরা যাচ্ছি, পথের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি শস্যদানা, প্রতি ইঞ্চি মাটি আমাদের প্রতিপক্ষ। এ পথের প্রতিটি পাহাড়, টিলা ও ঝোঁপঝাড় আমাদের জন্যে মৃত্যুদ। অগ্রণী বাহিনীকে মেপে মেপে পা ফেলতে হবে। ঈগলের মতো সতর্ক দৃষ্টি আর হরিণের মতো সদা জাগ্রত থাকতে হবে। গতি হবে ক্ষীপ্র, লক্ষ্যভেদী। মনে রেখো, অগ্রণী দলকে প্রতিক্ষেত্রে প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে। প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিহত করে তাদের সামনে এগুতে হবে। মূল বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকেও সার্বক্ষণিকভাবে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সাধারণ কমান্ডাররা বুঝতেই পারছিল না, সুলতান এ অভিযানে অগ্রণী দলকে কেন এত সতর্ক থাকতে বলছেন। সবার অজানা থাকলেও কাসেম বিন আসেমের জানা ছিল সুলতানের সতর্কবাণীর মর্ম-রহস্য। জানা থাকার কারণে সুলতানের নির্দেশনার পর সে দাঁড়িয়ে বলল
“সুলতানে আলী মাকাম! আমার প্রস্তাব যদি আপনার হুকুমের বরখেলাপ এবং আপনার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয় তবে আমার অনুরোধ, আমার ইউনিটকে অগ্রণী দলের দায়িত্বে দেয়া হোক।”
