তাঁর কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। দাউদের ওখানে যা কিছু ঘটতো, যেসব চক্রান্ত করা হতো, সব কিছুই হতো আমার জ্ঞাতসারে। এসবের খবর আমি যথারীতি তাকে জানিয়ে দিতাম। দাউদের হারেমেই আমি সুলতান মাহমুদ সম্পর্কে জেনেছি। দাউদের কাছে রাজা আনন্দ পাল ও বিজি রায় ক’দিন পরপর আসতো। ওরা সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করতে এবং তার সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে নিয়মিত শলা-পরামর্শ করতো।
আপনার স্বামী সম্পর্কে আমি জানতে পেরেছিলাম যে, তিনি সুলতানের সেনাবাহিনীর এক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। এজন্যে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু দাউদের হারেমের সুন্দরী কিশোরী আর মদ সুরার ফাঁদে পড়ে নিজের কর্তব্য ভুলে গেলেন। এমন কি নিজের বাহিনীকে ধ্বংস করার চক্রান্তে নিজেই জড়িয়ে পড়লেন।
একথা আমি বান্ধবীর পিতাকে জানানোর পর তিনি আপনার স্বামীর একজন দেহরক্ষীকে ডেকে তাকে সব কথা বুঝালেন এবং হারেম থেকে আমাকে পালানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই রক্ষীর সাথে আমি গজনী এসেছি। আমরা আপনার স্বামীকে ভ্রান্তিতে রেখে তার আগেই গজনী পৌঁছে সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করি। কয়েকদিন পর দেহরক্ষীদের নিয়ে আপনার স্বামী গজনী পৌঁছে দাউদের চক্রান্ত বাস্তবায়নের জন্যে সম্পূর্ণ প্রতারণাপূর্ণ তথ্য সুলতানকে অবহিত করেন। সুলতান তার প্রতারণা প্রমাণের জন্যে আমাকে ও সেই দেহরক্ষীকে তার সামনে হাজির করেন। আমি আপনার স্বামীর প্রতারণা ফাঁস করে দিলে তিনি নিজের পরিণতি বুঝতে পেরে কোমর থেকে তরবারী বের করে আচমকা পেটে বিদ্ধ করেন।”
কাসেম ও তার মা নীরবে রাবেয়ার কথা শুনছিল। রাবেয়ার কথা শেষ হলে তার মা উঠে আসেমের তরবারীটি হাতে নিয়ে কাসেমের দিকে বাড়িয়ে বললেন–“আমি তোমার পেটে শত্রুবাহিনীর তরবারী বিদ্ধ দেখতে চাই। তবে এর আগে ঐ তরবারী দিয়ে অন্তত একশ’ শত্রু তোমাকে নিধন করা চাই।”
“এ তরবারী আমাকে দিয়ো না। এ তরবারীতে যে রক্ত লেগে আছে তাতে শরাবের প্রভাব রয়েছে, এ তরবারী নাপাক; এ নাপাক তরবারী দিয়ে কি জিহাদ করা যায়?” বলল কাসেম।
আসেম ওমরকে অতি সাধারণ মানুষের মতো দাফন করা হলো। তার স্ত্রী আসেমের মৃত্যুতে অনুতাপ করল বটে কিন্তু মোটেও আর কান্নাকাটি করল না, যেমনটি একজন কৃতি সেনাপতির মৃত্যুতে তার প্রেয়সী স্ত্রী করে থাকে। আসেমের স্ত্রীর মনে হিন্দুদের প্রতি পাহাড়সম ঘৃণা। সে যৌবনে হিন্দুদের অপহরণের শিকার হয়। তার বিশ্বাস, নিরীহ অবলা কিশোরীদের অভিশাপের কারণেই প্রতাপশালী জয়পালের রাজয় ঘটেছে। আল্লাহ মেহেরবানীতে সে আসেম ওমরের মতো দক্ষ সৈনিককে পেয়েছিল স্বামী হিসেবে। বিয়ের পর অল্পদিনের মধ্যেই আসেম অধিনায়ক পদে উন্নীত হয়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, ইসলাম ও মুসলিম বাহিনীর জন্যে নিবেদিত প্রাণ সেই কৃতি স্বামীকে হিন্দুরা চক্রান্তের ফাঁদে ফেলে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করল। কাসেমের আম্মা পেশোয়ারে সুলতানের অভিযানের কথা শুনে খুশি হয়েছিলেন। এজন্যে তিনি স্বামীর কাছে সফরসঙ্গী হওয়ার বায়না ধরেছিলেন। স্বামী আসেমও পেশোয়ারের আঞ্চলিক ভাষাভাষী হিসেবে কাজে লাগতে পারে মনে করে স্ত্রীকে পেশোয়ার নিয়ে এসেছিল। কাসেমের মায়ের মন ছিল প্রচণ্ড হিন্দু বিদ্বেষে অগ্নিকুণ্ড। সে কোনদিন তার মতো অসংখ্য যুবতীর উপর হিন্দুদের নির্যাতনের কথা বিস্মৃত হতে পারেনি। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন নিভানোর যে স্বপ্ন নিয়ে কাসেমের মায়ের পেশোয়ার আগমন সেই মায়ের হৃদয় এখন আত্মগ্লানি ও বিষাদে ভরপুর। অসহনীয় কষ্ট তার সাহসী মনটাকে ভেঙ্গে খান খান করে দিচ্ছে। কাসেমের মা জীবনের সব স্বপ্ন স্বামীর পরিবর্তে পুত্রকে সঁপে দিল। ছেলেটিকে সে এখন অত্যাচারী হিন্দুদের বিরুদ্ধে সাহসীরূপে গড়ে তুলতে সচেষ্ট। রাবেয়াকে এক বঞ্চিতা ভাগ্য বিড়ম্বিতা অবলা মেয়ে হিসেবে নিজের কাছেই রেখে দিল। ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি থেকে সুলতানের বাহিনীকে বাঁচানোর জন্যে রাবেয়া যে কঠিন দায়িত্ব পালন করেছে, এজন্য তিনি রাবেয়াকে সাধুবাদ জানালেন। তার জন্যে প্রাণ খুলে দু’আ করলেন।
আসেম ওমর যেদিন ষড়যন্ত্রের নকশা নিয়ে গনীর উদ্দেশে রওয়ানা হল এর পরদিনই দাউদ বিন নসর বেরায় গিয়ে বিজি রায়কে জানাল, সুলতানকে পরাজিত করতে সে কি ফাঁদ পেতেছে। কিভাবে সুলতানের প্রেরিত দূতকে বিভ্রান্ত করে ধোকা দিয়ে চক্রান্ত বাস্তবায়নের ক্রীড়নক বানিয়েছে। বিজি রায় দাউদের সংবাদ নিয়ে সেদিনই লাহোর চলে গেল আনন্দ পালের কাছে। আনন্দ পালকে সে বলল, অল্প কদিনের মধ্যে দুশমন আমাদের জালে ধরা দিচ্ছে। আপনার কাজ দাউদের নকশা অনুযায়ী পথিমধ্যে মাহমুদের সৈন্যদের নাস্তানাবুদ করে দেয়া। আনন্দ পাল বিজি রায়ের কথা শুনে বলল, “আপনি কিভাবে দাউদের কথায় আশ্বস্ত হলেন? দাউদ নিজেও তো একজন মুসলমান। দাউদ চক্রান্ত করে আমাদের সর্বনাশ ঘটাবে না এমনটা কি করে বিশ্বাস করা যায়? মুসলমানদের। উপর এতোটা ভরসা করা কি ঠিক হবে?”
“আপনি এখনও জানেন না, দাউদ আসলে মুসলমান নয়। আপনার তো কারামতীদের সম্পর্কে জানা নেই। ওরা আবার মুসলমান হলো কি করে? ওরা যত অপকর্ম করে তা তো কোন অমুসলমানও করে না। ওদেরকে ধর্মহীন বললে ভুল হবে না। ওরা নামমাত্র মুসলমান। আসলে ওরা চরম ইসলাম বিরোধী। তারপরও যদি দাউদ আমাদের সাথে কোন ধরনের প্রতারণা করে তবে তার পরিণতি হবে খুবই কঠিন। সে তো চতুর্দিকে আমাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রতারণা করলে ওর রাজ্য আমরা দখল করে ওকে হত্যা করব, না হয় জীবনের জন্যে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করব।
