“মা! আপনি যেভাবে রোদন করছেন, আপনার মতো মহিলার পক্ষে তার জন্যে শোক-তাপ করা খুবই বেমানান। হাতের তরবারীটা ছুঁড়ে মেরে কাসেম মায়ের উদ্দেশে বলল, তাকে কেউ হত্যা করেনি। নিজের তরবারী দিয়েই সে আত্মহত্যা করেছে।”
কাসেম উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল– “মা! সত্যি করে বলুন তো, আমি কি প্রকৃতপক্ষে তারই সন্তান? আপনি কি আগে হিন্দু ছিলেন? আমি কোন হিন্দুর ঔরসজাত নই তোআমি কি লালিত পালিত হয়েছি কোন গাদ্দারের ঘরে?”
“কাসেম!” আর্তচিৎকার করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন মা। “এসব তুমি কি বলছছ? কি ঘটেছে! কি দেখছি আমি! তুমি কাকে গাদ্দার বলছে! বোখারা বলখের বিদ্রোহীদের পরাভূতকারী কমান্ডার, আজীবন পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে জিহাদকারী অকুতোভয় সৈনিক, যুদ্ধের ময়দানে পাহাড়ের মতো অবিচল যোদ্ধা, দীনের সেবক মুজাহিদ বাবাকে তুমি গাদ্দার বলছো! তিনি তো সুলতানের দূত হয়ে মুলতান গিয়েছিলেন। কবে ফিরেছেন? তিনি গাদ্দার হবেন কি করে? কি হয়েছে বাবা, বল! আমাকে খুলে বল!”
“আমি বলতে পারবো না মা! আপনাকে মুলতানের এক মহিলা সব বলবে। সে আসছে। এছাড়াও দূতের দেহরক্ষী হিসেবে যে কয়জন সৈনিক আব্দুর সহযাত্রী হয়েছিল তাদের একজনও আসছে। তার কাছ থেকেই আপনি সব জানতে পারবেন। এই তো এসেছে তারা!”
প্রথমেই ঘরে প্রবেশ করল মুলতানের মহিলা। প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ্ তাকে কাসেমদের বাড়িতে পাঠিয়েছেন। কাসেম খেয়াল করল, মহিলাটির বয়স বেশি নয়, যুবতী। কিন্তু যৌবনের কান্তি-কোমনীয়তা নেই তার চেহারায়। নির্যাতন, নিপীড়নের ছাপ স্পষ্ট তার চোখে-মুখে। চেহারা দেখেই বোঝা যায়, বহু ঝড়-ঝাঁপটা গেছে এই মেয়ের জীবনে। তারপরও মেয়েটির
চেহারায় একটা মোহনীয় ভাব, বিচক্ষণতা ও দ্বীপ্তিময়তা বিদ্যমান– যা যে কোন স্ক পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম।
মেয়েটি কাসেমদের ঘরে প্রবেশ করেই নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, “আমার এ নাম রাবেয়া, আমাকে আপনাদের ঘরে পাঠানো হয়েছে।”
“আমার স্বামী মুলতানে কি করেছিলেন?” জিজ্ঞেস করল আসেম ওমরের স্ত্রী।
“ওই ধরনের পরিবেশে শরীফ ধরনের লোকেরা যা করে থাকে, তিনিও তাই করেছেন।” জবাব দিল রাবেয়া। রাবেয়া বলে চলল, “আসেম ওমরকে দাউদ বিন নসর কীভাবে মদ নারী আর সুরা নর্তকীর মায়াজাল এবং ক্ষমতার মোহ দিয়ে ফাঁদে আটকে ফেলেছিল। রাবেয়া সবিস্তারে বলল– “মদ, নারী, গান-বাজনা, আয়েশ-উপভোগ ছাড়া দাউদের ওখানে নীতি-নৈতিকতার কী আছে আপনার স্বামীর প্রতি আমার বিশেষ কোন আকর্ষণ ছিল না। তিনি কে তা আমি আগে জানতামও না। কিন্তু দাউদ বিন নসর সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার ধোকা দিয়ে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করেছিল। সেই ষড়যন্ত্রের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছিলেন আপনার স্বামী। আমি তখন তাকে জানতে পারি, যখন আমাকে তাদের মদ আপ্যায়নের নির্দেশ দেয়া হলো। আমি নিজ হাতে উভয়কে মদ ঢেলে দিয়েছি। তারা উভয়ে আকণ্ঠ পান করেছেন। তাদের বৈঠকে আমাকে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আমি তাদের কথোপকথনের সময় উপস্থিত ছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত আমিও এই চক্রান্তের অংশে পরিণত হয়েছিলাম। আমার বাবা এক কাপুরুষের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছিল। সেই ব্যক্তি আমাকে দাউদ বিন নসরের কাছে উপহার হিসেবে রেখে যায়।
করুণ পরিণতির শিকার হয়ে মানসিকভাবে আমি ভেঙে পড়েছিলাম। গুনাহ আর পাপক্লিষ্ট জীবন-যাপনে বাধ্য হওয়ায় মনের দিক থেকে আমি মরেই গিয়েছিলাম। বেঁচে থাকা আমার কাছে অভিশাপ মনে হতো। কিন্তু একজন জ্ঞানী ও সাধক ব্যক্তি আমার মৃতপ্রায় হৃদয়টিকে সজীব করে তুলেছেন। তিনি আমার এক বাল্যবান্ধবীর পিতা। তিনি আমাকে বোঝালেন, দাউদ বিন নসর ইসলামের দুশমন। তুমি ওর হেরেমের অভ্যন্তরের ঘটনাবলী গভীরভাবে জেনে ওর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করে দীন ও মিল্লাতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পার। বাহ্যত তোমার জীবন কষ্টকর হলেও আল্লাহ্ হয়তো তোমার অসহায়তাকে ক্ষমা করে দীন ও ইসলামের জন্য তোমার খেদমতে সন্তুষ্ট হবেন। তাঁর কথায় আমি সান্ত্বনা পেলাম। অল্প দিনের মধ্যে দাউদের হারেমে সবচেয়ে আস্থাভাজন ও কর্তব্যপরায়ণ সেবিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমি সক্ষম হলাম। আর বান্ধবীর পিতাকে দাউদের কার্যক্রম সম্পর্কে যথারীতি অবহিত করার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিলাম।”
রাবেয়া বলল, “কারামাতী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সীমাহীন জঘন্য। তেমনি ওদের কাজকর্ম ও চালচলন। কারামাতীরা নিজেদের মুসলমান দাবী করে বটে কিন্তু এমন কোন গুনাহর কর্ম নেই যা ওরা বৈধ মনে করে না। মুলতান কারামাতীদের প্রধান কেন্দ্র। ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ওদের বিভ্রান্তির শিকার হয়ে দলে দলে কারামাতী হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য কারামাতীদের বিরুদ্ধেও কিছু সংখ্যক লোক সক্রিয় রয়েছে কিন্তু তারা প্রকাশ্যে নয় অতি গোপনে। ওখানে কারো পক্ষে কারামাতীদের বিরুদ্ধাচরণ করে টিকে থাকা অসম্ভব। আমার বান্ধবীর পিতা কারামাতী বিরোধী দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি বিশুদ্ধ আকীদায় বিশ্বাসী, আমলদার খাঁটি মুমিন ব্যক্তি। তিনি সব সময় বলেন, তার সামর্থ নেই– এজন্যে তিনি গজনী আসতে পারছেন না। তিনি বলেন, সাক্ষাৎ হলে সুলতান মাহমূদকে তিনি মুলতান অভিযানের জন্যে অনুরোধ করতেন, কারণ, কারামাতীরা মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের চেয়েও ভয়ংকর ও বিপজ্জনক।…
