কাছের একটি ইমারতের বহিরাঙ্গণে সুলতান মাহমূদের প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ আত্তায়ী দাঁড়ানো। কাসেম বিন ওমরকে পিতার লাশের পাশে বিষণ্ণ মনে দাঁড়ানো দেখে আব্দুল্লাহ্ পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। যুবক কাসেমের প্রতি তার ভীষণ মায়া হলো। তিনি তার কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রেখে নিজের দিকে ফেরালেন। বললেন, তোমার বাবার কাহিনী শুনলে তা তোমাকে এই করুণ দৃশ্য থেকে আরো বেশি দুঃখ দেবে। পিতার মায়া-মমতা, তার কৃতিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা মন থেকে দূর করে দাও। বরং এর জায়গায় তোমার দীন, ঈমান, কর্তব্য ও দেশপ্রেমকে স্থান দাও।
“তাজা রক্ত দেখে মনে হচ্ছে, তাকে এখানেই কিছু আগে হয়তো হত্যা করা হয়েছে।” বলল কাসেম বিন ওমর। “কি অপরাধে তাকে এমন নির্মম হত্যার শিকার হতে হলো। আমি জানি, তিনি সুলতানের বিশেষ দূত হিসেবে মুলতান গিয়েছিলেন। কিন্তু তার এমন অবস্থা হলো কেন?”
“তোমার পিতা আত্মহত্যা করেছে। তাকে কেউ হত্যা করেনি। এখানে তার কোন শত্রু নেই, ছিলও না। সে নিজেই নিজের সাথে দুশমনি করেছে। সে তার দীন-ঈমান, দেশ, জাতি ও সেনাবাহিনীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর সেই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতিতে আত্মহত্যা করে প্রায়শ্চিত্ত করেছে তোমার পিতা।” বললেন আবু আব্দুল্লাহ্।
আবু আব্দুল্লাহ কাসেম বিন ওমরের উদ্বেগ নিরসনের জন্যে তার পিতার পূর্বাপর ইতিবৃত্ত সবিস্তারে জানালেন। বললেন, কি কারণে কোন্ প্রেক্ষিতে সে আত্মহত্যার পথ অবলম্বন করেছে।
“পিতার অপরাধের শাস্তি কি আমাকেও ভোগ করতে হবে, মাননীয় সেনাপতি!” বিনীতভাবে জানতে চাইল কাসেম। “আমাকে কি সেনাবাহিনী থেকে অপসারণ করা হবে।
“এখনও পর্যন্ত সুলতান এমন কোন নির্দেশ দেননি। সুলতানের পরে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আমার হাতে। আমিও এমন কোন সিদ্ধান্ত নেইনি। আমার দৃষ্টিতে তুমি সাহসী ও কর্তব্যপরায়ণ কমান্ডার। আমি আশা করি, দায়িত্বের প্রতিক্ষেত্রে কর্তব্যনিষ্ঠায় তুমি আমার পদ পর্যন্ত পৌঁছবে। সবেমাত্র শুরু। এখনও গোটা জীবন তোমার সামনে রয়েছে। আমি আশা করি, তুমি তোমার পিতার ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিবে। বুঝতে চেষ্টা করবে, পাপের কতত আকর্ষণ, কীভাবে অপরাধ একজন নিষ্ঠাবান সেনাধ্যক্ষকে পথভ্রষ্ট করে।
ভাবতে পারো, ভোগ আর জাগতিক লিন্স আসেম ওমরের মতো কর্তব্যনিষ্ঠ সেনাধ্যক্ষকেও নিজের দেশ, সেনাবাহিনী আর দীন-ধর্ম থেকে কিভাবে বিচ্যুত করেছে! সুলতান মাহমূদের মতো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে পরাজিত করতে, নিজের গড়া মুসলিম মুজাহিদদেরকে বেঈমানদের হাতে পরাজিত করে গোলাম বানানোর কি ভয়ংকর জালে পা দিতে পারে। সেই চিন্তা করো, অপরাধ যখন মানুষকে তাড়া করে তখন আসেম ওমরের মতো বীর বাহাদুর যোদ্ধাও কাপুরুষের মতো আত্মহত্যার পথ অবলম্বন করে। তুমি যুবক। যুবকদের জীবনে সবচেয়ে আশংকার বিষয় হচ্ছে, গুনাহর আহ্বান তাদের পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা কঠিন হয়ে পড়ে। যৌবনের যন্ত্রণায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”
“মাননীয় সেনাপতি! আমাকে কি পিতার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দেয়া হবে।”
“তোমাকে অবারিত সুযোগ দেয়া হচ্ছে। চল। লাশের পেট থেকে তরবারী বের করে আনন। তোমার বাবার মৃতদেহ সমাধিস্থ কর। কাফন-দাফনের ব্যবস্থা কর।”
“আমি কি সেই মহিলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবো, যিনি মুলতান থেকে এসেছেন এবং যে আমার পিতার অপরাধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী?”
“তুমি লাশ বাড়িতে নিয়ে যাও। সেই মহিলাকে আমি তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সে তোমার আম্মুকেও সব ঘটনা বলবে। তুমি ইচ্ছে করলে, সেই সৈনিকের সাথে কথা বলতে পারবে যে সৈনিক এই মহিলাকে সাথে করে নিয়ে এসেছে।” বললেন প্রধান সেনাপতি।
পিতার দেহ থেকে তরবারী বের করে আনলেন কাসেম বিন ওমর। প্রধান সেনাপতি আসেমের লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
স্ত্রীকে নিজের সাথে পেশোয়ার নিয়ে এসেছিল আসেম। আসেমের স্ত্রী ছিল পেশোয়ারেরই মেয়ে। ৯৭৭ খৃস্টাব্দে রাজা জয়পাল যখন প্রথম সুলতান সুবক্তগীনের বিরুদ্ধে সেনাভিযান চালায় তখন সম্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে জয়পাল পালিয়ে যায়। তার সাথে ছিল অনেক মুসলিম বন্দী নারী ও বেসামরিক লোক। এরা সুবক্তগীনের সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়। সেই বন্দিনীদেরই একজন আসেমের স্ত্রী কাসেমের মা। এর পূর্বে রাজা জয়পালের বাহিনী পেশোয়ার অঞ্চলের অধিবাসীদের বাড়িঘর লুটপাট ও তরুণীদের অপহরণ করে সেনাবাহিনীর সেবিকা হিসেবে নিয়ে এসেছিল। এদেরই একজনকে বিয়ে করেছিল আসেম। আসেমের স্ত্রী পেশোয়ারের আঞ্চলিক ভাষা জানতো। তাই আসেম যখন পেশোয়ার যাওয়ার নির্দেশ পেল তখন আঞ্চলিক ভাষাভাষী হিসেবে স্ত্রীকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিল সহযোগিতার প্রয়োজনবোধে। সেই পৌত্তলিক বাহিনীর হাতে অত্যাচারিতা মহিলার উদরে জন্ম নিয়েছে কাসেম। সৈনিক বাবার ঔরসজাত আর অত্যাচারিতা মায়ের উদরজাত কাসেম স্বভাবগতভাবেই পৌত্তলিকতা বিরোধী এক দ্রোহ। ইসলামী চেতনার এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। কাসেম মায়ের কাছেই শিখেছিল তার মাতৃভাষা। আর অবস্থানগত কারণে গজনীর ভাষা তো জানতই।
আসেমের লাশ দেখে তার বিধবা স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ল। কিন্তু কাসেমের হাতে রক্তমাখা তরবারী দেখে কান্না থেমে গেল তার মায়ের। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে।
