“এই মেয়েটিকে অন্দর মহলে পাঠিয়ে দাও। এর সেবা-যত্নে কোন ত্রুটি হয় যেন। আর এই সৈনিকেরও খানা-দানা ও বিশ্রামের সুব্যবস্থা কর। ওকে শাহী মেহমানখানায় থাকতে দাও। এরা যে আসেমের আগেই পৌঁছে গেছে সে কথা প্রকাশ হয় না যেন।”
ওদের পৌঁছার চার পাঁচদিন পর আসেম ওমর সুলতানের দরবারে পৌঁছাল। আসেম সুলতানকে বলল, “দাউদ বিন নসর আপনার জন্যে দামী দামী উপঢৌকন পাঠিয়েছে এবং অধীর আগ্রহে আপনার আগমন প্রত্যাশা করছে। সে আপনাকে মুলতানে স্বাগত জানাতে উগ্রীব। দাউদের দেয়া ষড়যন্ত্রের মানচিত্র সুলতানের কাছে মেলে ধরে সে বলল, এটা দাউদের বলে দেয়া পথ। এ পথে আমাদের সৈন্যরা অতিক্রম করলে সে সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। আসেম আরো বলল, দাউদ বিন নসর আমাদের খুব নির্ভরযোগ্য দোস্ত।”
“মুলতান পর্যন্ত সৈন্য নিয়ে যাওয়ার পথ আমি দেখে ফেলেছি। তবে তুমি আমাকে বল, বিজি রায় ও আনন্দ পালের সৈন্যরা কোন কোন জায়গায় ওঁৎ পেতে থাকবে এবং রাতের আঁধারে কীভাবে গুপ্ত হামলা করবে?”
“বিস্ময়ভরা চোখে সুলতানের দিকে তাকাল আসেম। নির্দেশ দিলেন সুলতান, ওদের দুজনকে নিয়ে এসো।”
একটু পরই আসেম ওমরের হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তারক্ষী আর সেই তরুণী এসে দাঁড়াল তার সামনে।
“এই যুবতাঁকে চেনো?” গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন সুলতান। “তোমার কি মনে আছে, দাউদের প্রাসাদে বসে যখন তুমি তোমার ঈমান আর আমার জীবন বেচাকেনা করছিলে তখন এই যুবতী তোমাদের মদ পরিবেশন করছিল? তুমি কি আমার মুখেই তোমার কৃতকর্মের বিস্তারিত শুনতে চাও, না ওর মুখে শুনবে এর চেয়ে কি এটাই ভাল নয় যে, কৃতকর্মের বর্ণনা তুমি নিজের মুখেই দাও।”
উঠে দাঁড়াল আসেম ওমর। কৃত অপরাধ আর পাপাচারের বোঝ ওর ঈমানী শক্তিকে বিলীন করে দিয়েছে। সত্যের মুখোমুখি হতে সাহস হলো না তার। আস্তে করে তরবারীটা কোষমুক্ত করে আগাটা বসিয়ে দিল পেটে এবং দুহাতে তরবারীর বাট ধরে এমন জোরে চাপ দিল যে পিঠ ফুরে বেরিয়ে গেল। একটা চাপা চিৎকার দিয়ে পড়ে গেল মেঝের ওপর। তড়পাতে লাগল ওর দেহ।
প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন সুলতান। ওর দেহকে শহরের বাইরে খোলা জায়গায় ফেলে এসো। ঈমান সওদাকারী দাফন কাফনের হকদার নয়।”
সেনাপতিদের ডেকে পাঠালেন সুলতান। নির্দেশ দিলেন, “এখনই সেনাদের তৈরি হতে বলুন। আমি আজই মুলতানের উদ্দেশে রওয়ানা হবো। ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। পথে কয়েক জায়গায় যুদ্ধ করতে হবে আমাদের। পৌত্তলিকদের পাশাপাশি কারামাতী চক্রান্তও এবার খতম করব ইনশাআল্লাহ।”
.
জনকের প্রায়শ্চিত্ত
নিজের তরবারী নিজের পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে কৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করল আসেম ওমর। তরবারী বিদ্ধ আত্মঘাতক আসেমকে শহর প্রাচীরের বাইরে ফেলে আসতে নির্দেশ দিলেন সুলতান। প্রখর রৌদ্রতাপে তড়পাতে তড়পাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল সে। কারো অনুমতি ছিল না যে আসেমের মুখে এক কাতরা পানি দেবে। অতীত কৃতিত্বের জন্যে অনুগ্রহ করে সুলতান আসেমের উত্তরসূরীদেরকে অনুমতি দিলেন মরদেহ তুলে নিয়ে যথারীতি দাফন করতে ।
সুলতান মাহমূদের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় একজন অধিনায়ক ছিল আসেম ওমর। যুদ্ধবিদ্যায় সে ছিল খুবই দক্ষ, সাহসী এবং বিচক্ষণ। কিন্তু জীবনের এই যুগসন্ধিক্ষণে এসে নারীদেহ, মদের নেশা আর সামান্য জমিদারীর লোভ তাকে এমনই আদর্শচ্যুত করল যে, দূরতিক্রম্য শত্ৰু দুৰ্গ বিজয়ী আসেম, হাজারো শক্ত নিধনকারী বাহাদুর আসেম, সেনাধিনায়ক, বিচক্ষণ কূটনীতিক আসেম জবাবদিহির মুখোমুখি হতে না পেরে নিজের তরবারী পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করল। অথচ আসেম ছিল সুলতান মাহমূদের সেনাবাহিনীর একজন আদর্শ সৈনিক। তার খ্যাতি ও যশ ছিল সর্বত্র আলোচিত। প্রধান সেনাপতি আসেমের কার্যক্রমের উপর ছিলেন আস্থাবান। তার প্রতি প্রধান সেনাপতির প্রশ্নাতীত আস্থা ও বিশ্বাসই সুলতানের ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও এতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে তাকে সুলতানের বিশেষ দূত হিসেবে গুরু দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল।
কাসেম ওমর। টগবগে যুবক। সুলতানের সেনাবাহিনীর ইউনিট কমান্ডার, দুর্ধর্ষ, বিচক্ষণ, সিদ্ধান্তে অবিচল, লক্ষ্যে স্থির। ছোট বেলা থেকেই পিতার কাছে কাসেম শুনতো যুদ্ধের কাহিনী। অল্প বয়সেই পুত্র কাসেমকে ভর্তি করে দিয়েছিল সুলতানের সেনাবাহিনীতে। রণাঙ্গনে সে ছিল বাবার যোগ্য উত্তরসূরী । আসেমের মৃত্যুকালে পুত্র কাসেম পূর্ণ যুবক। সেনাবাহিনীতে সে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান করে নিয়েছে নিজের যোগ্যতা বলে।
বাবার মৃত্যুসংবাদ যখন কাসেমের কাছে পৌঁছাল তখন সে এই ভেবে অনুতাপ করল যে, সেনাবাহিনীর একজন কৃতি অধিনায়কের পদে শূন্যতা সৃষ্টি হলো। দুঃখ পেল কাসেম এই ভেবে যে, তার বাবা বিশেষ দূত হিসেবে মুলতান গিয়েছিলেন; হিন্দুরা হয়তো তাকে শহীদ করেছে। বাবা হিসেবে শুধু নয়, সেনাবাহিনীর জন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির শূন্যতা তাকে খুবই পীড়া দিচ্ছিল। তার বিশ্বাস ছিল, তার বাবার মরদেহ হয়তো মুলতান থেকে নীত হয়েছে।
মৃত্যু সংবাদবাহক কাসেমকে সাথে করে নিয়ে এলো আসেমের পাশের পাশে। উক্ত আকাশের নীচে, বালির মধ্যে, রক্তাক্ত পিতার লাশ দেখে কাসেম হতবাক। একি! তার পিতার মরদেহ তরবারী বিদ্ধ!
