জানি। তোমার সত্য নিয়তে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমীরে স্পেন আমার পদমর্যাদায় কোন প্রকার কমতি আনেননি। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেল অথচ আমায় একটিবারের জন্যও কাছে ডাকেননি তিনি। স্বেচ্ছায় কখনও কাছে গেলে কর্মব্যস্ততার বাহানায় দূরে ঠেলে দিয়েছেন। নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ প্রান্তরে অবস্থান আমার। যিরাব না থাকলে হয়ত মারাই যেতাম।
তোমার পুত্র জোয়ান হয়েছে সুলতানা। খোদা তোমার পুত্রকে দীর্ঘজীবী করুন। এখন থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনায় নিজকে উৎসর্গ করো। তাকে ভাবী আমীর বানানোর কোশেশ করো। আমীরে স্পেন বার্ধক্যে উপনীত। প্রতিটি যুদ্ধে সে অংশ নিচ্ছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারেন। তোমার পুত্রের জন্য কিছু একটা করো।
তাতো আমি করবই, কিন্তু ওকে ভাবী আমীর বানানো নিয়ে একটি শব্দও মুখে আনেননি আবদুর রহমান। এরও একটা কারণ আছে। আমার পুত্রই পরিস্থিতি ঘোলা করে তুলেছে। ওকে শাহযাদা বানানোর খেয়াল করেছিলাম, কিন্তু ও আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। বানাতে চেয়েছিলাম শাহ্ সওয়ার, পাঠিয়েছিলাম তেগ-তলোয়ার চালাতে সমরবিদদের কাছে, কিন্তু পালিয়ে এসে আমার সব আশার গুড়েবালি দিয়েছে। হয়ে উঠেছে বিলাসী ও অমিতব্যয়ী।
বিলাসী ও অমিতব্যয়ী হয়েছে তাতে কি! আবদুর রহমানের ৪৫ পুত্রের কে না। বিলাসী ও অমিতব্যয়ী? চাকরাণী বলল।
সুলতানা আয়েনার সামনে গিয়ে বসল। চাকরাণীকে আর কোন কথা বলার সুযোগ দিল না। খোলা চুল পেছন থেকে সামনে এনে দেখল। একগাছি সাদা চুল তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। চেহারা আয়নার একেবারে কাছে নিয়ে গিয়ে দেখল তাতে মসৃণতা নেই, আছে ভাঁজ পড়ার ভূমিকা।
তুমি যাও। চাকরাণীকে বলল সে, যিরাব অবসর থাকলে বলো সুলতানা ডেকে পাঠিয়েছে।
***
চাকরাণী চলে যাবার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেহারা আয়নায় পরখ করল। চোখ দেখল। দেখল চোখের কোণে কালচে সরুরেখা। পরখ করল হাত। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে বারবার দেখল। অস্থিৰ্ব্ববে এগিয়ে গেল বেলকনির দিকে। পরে এলো করিডোরে। দরজা ফাঁক করে কারো আগমনের প্রতীক্ষা-মহড়া।
খানিকবাদে কামরায় কারো পদধ্বনি শোনা গেল। মনে মনে যার প্রতীক্ষা সে এলো বুঝি। পেছনে ফিরে তাকাল সুলতানা।
হ্যাঁ, যিরাব এসেছে। প্রেমের ছলনায় যাকে আজীবন উপেক্ষায়ই করে এসেছে সে। ওই চেহারায় কত আকুতি ছিল। ওই মনে কত শত আকাঙ্ক্ষা বাসা বেঁধেছিল। তবে প্রতিবারই সে সুলতানাকে ডেকে পাঠিয়েছে। আজ বোধ হয় এর ব্যতিক্রম। আজ প্রথম সুলতানা তাকে ডাকল। এতে ভো যিরাবের আনন্দে আত্মহারা হবার কথা, কিন্তু একি! যিরাবের সেই অবয়বে কত পরিবর্তন। ভাবনার সাথে আনন্দে ডুবে যায় সে। আচমকা তার ভাবনা জাল স্নি হয় এই ভেবে যে, বেচারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অথচ বসতে বলার সৌজন্যটুকু তার লোপ হয়েছে। যিরাবকে বসবার আমন্ত্রণ জানায়। যিরাব বসেন। তার চোখে মুখে সেই স্মৃতি নেই। সুলঅনা বলে,
আমার প্রেম আপনার হৃদয় থেকে মুছতে বসেছে বুঝি?
উঁহু। পূর্বের থেকে সেটা আরো বেড়েছে; কিন্তু সেই সোনালী অতীতে আমরা ফিরে যেতে পারব না, যৌবনের কলকাকলীতে এক সময় মুখরিত ছিল যা। কাজেই অতীত ইতিহাসের স্মৃতিচারণ এক্ষণে নিবুর্পিতাকে খানিক বাড়িয়েই তুলবে। তোমার, পেয়েশানিরও কারণ বোধ হয় সেটা। সময় যত ফুরিয়ে যাচ্ছে-তুমি আলেয়ার আলোর মত এর পেছনে ছুটছ, অতীতকে স্মৃতির এলবামে সযত্ন লালিত্যে রেখে দাও সুলতানা। চলমান সময়কে প্রশান্তির সাথে ব্যয় করার চেষ্টা করো।
হ্যাঁ যিরাব! আমরা বারবার পেছন অতীতে ফিরতে চাচ্ছি। অতীত থেকে আমি মুখ ফেরাতে পারছি না। যদিও সে অতীতের সৌন্দর্য সুষমা আমার নেই তথাপিও বিগত সৌন্দর্যের কল্পনায় আমি আমার সৌন্দর্য চর্চা করতে চাই এবং করবও। নিঃসঙ্গতা আমাকে পুড়ে ছাই করছে। আমার মধ্যে কেমন যেন একটা ভয় আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠছে। সুখময় কিছু আলাপ করো যিল্প। তোমার ভাণ্ডারে শব্দের কমতি নেই। শব্দে শব্দে আমাকে নিয়ে চলো তোমার ধূসর অতীতের ডিকশনারীতে। ভোমার বাহুতে কি, এখন জোর নেই যিরাব? আমার যৌবনে ভাটা পড়েছে এ শুষ্ক কথার নিরস জ্ঞান আমাকে দিও না যিরাব!
দেহ থেকে তুমি দৃষ্টি হটাতে পার না সুলতানা। আপনার রুহকে সজীব করো। দেহ বুড় হলে রূহ জোয়ান হয়ে যায়। আমি আমার শারীরিক শক্তি রূহের মধ্যে স্থানান্তর করেছি।
সুলতানা ভয়াতুর শিশুর মত যিরূবকে জাপটে ধরতে চাচ্ছিল, কিন্তু যিরাব উঠে দাঁড়ালেন।
তুমি মিথ্যা মরীচিৎকার পেছনে ছুটছে। কালকের উপাখ্যানের স্মৃতিমন্থন করে তুমি আজকের বাস্তবতা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছ। দেমাগকে ড্রাইভিং সিটে বসাও, তারপর তোমার সাথে অতীতের আলাপ করব। বললেন যিরাব। শরাবের একঢোঁক সুলতানাকে সরস করে তুলল। তার ওষ্ঠ ও ভাষা দুটোতেই পরিবর্তন আসল। সে তার বাহু যিরাবের বুকে এলিয়ে দিয়ে বললো, যিরাব! আমি তোমার দাসী। তুমি সেই-সথা যার সাথে আমার আন্তরিক সম্পর্ক। তুমি আমাকে এতটুকু সন্দেহের চোখে দেখেনি যে, মুসলমানের সবচেয়ে নিকৃষ্ট দুশমন এলোগেইছের সাথে আমার নেপথ্য সম্পর্ক এবং তার সাথে হাত মিলিয়ে আমি স্পেনের তখতে তাউস উল্টানোর কাজে কোশেশ করে যাচ্ছি। তোমার প্রতি আমার একটি অভিযোগ যে, তুমি কোনদিন এ ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করোনি।
