সুলতানার এ কথাগুলো সত্য। যিরাব ও তার মাঝে তৃতীয় কেউ থাকত না, কিন্তু সুলতানার এই লুকোচুরির মাঝে একটা স্বার্থ লুকিয়ে ছিল। প্রেমাভিনয়ের মাধ্যমে সে যিরাবকে ব্যবহার করত। সুলতানার ভেতরে ভেতরে সম্পর্ক খ্রীস্ট মৌলবাদীদের সাথে, ধুরন্ধর নীতিজ্ঞানহীন ধর্মান্ধ এলোগেইছের সাথে। সুলতানা এলোগেইকে বলে রেখেছিল, যিরাকে প্রেম মরীচিৎকার মোহে আটকে অবাধে কার্যোদ্ধার করতে চাচ্ছি, কিন্তু ক্রমশসে আমার থেকে সটকে পড়ছে।
প্রেমের আদিম নেশায় সে কেবল ধরা দিয়েছে হেরেমে, আবদুর রহমানের পৌরুষবহুল পেশীতে সে-ই একমাত্র নারী, আবদুর রহমানের মত সিংহশাবক যার ছলনার পড়ে ছাগ শিশুতে পর্যবসিত। কেমন একটা যাদু, একটা অনুরাগে সে আটক ফেলে এক মর্দে মুজাহিদকে। মাঝপথে যিরা তার সান্ত্বনার ধন ও আরাধনার বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়। এতে অর আত্মিক প্রশান্তি হয়। এভাবে একই সময়ে সে আমীর স্পেন ও যিরাবের মধ্যে মরীচিকা সৃষ্টি করে। দ্বি-চারিণী আর কাকে বলে।
কিন্তু কালের প্রবাহে সবকিছুতে এসেছে পরিবর্তন। পরিস্থিতি গেছে পাটে। গোটা প্রকৃতিতে পালাবদলের হিড়িক। স্পেনের নদ-নদী এরপর পানি প্রবাহিত করেনি। স্পেনের অলি গলি ও শহর বন্দরে যে রক্ত শুকায়নি, তথাপিও সুলতানার প্রকৃতিতে কোন পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন যা এসেছে তাহলো, সে এক বাচ্চার মা হয়েছে আর আমীরে স্পেন তার বাচ্চার স্বীকৃতি দিয়েছে। ইতিপূর্বে সে রাণী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এজন্য ছিল পাগলপারা। সে ঈসায়ীদের সাথে যোগসাজশ করেছে। আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে তখত তাজ উল্টানোর ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু সাফল্যের সোনার হরিণের নাগাল পায়নি।
প্রথম ও সর্বশেষ সন্তানের মা হয়ে তাই সে তাকে স্পেনের ভাৰী গভর্ণর বানানোর জন্য জন্য আদাজল খেয়ে নামে। তার যৌবন এখন পুরানো দিনের কাহিনী। পুত্র তখন জোয়ান। আমীরে স্পেন বার্ধক্যের বারিধি তীরে উপনীত। বিষধর কালনাগিনীর চরিত্রে সুলতানা, ভরা নাগিন সে। যে কোন নারী-পুরুষকে দংশনে নীল করতে সে বদ্ধপরিকর। যাকে নিয়েই পুত্রের ভবিষ্যৎ-এ সে অন্ধকার দেখেছে তাকেই সে ছোল মেরেছে।
যুগের পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে মানব-সভ্যতায়। কত দোস্ত দুশমনে আর দুন-দোস্তুতে রূপ নিয়েছে, কিন্তু সুলতানা সুলতানাই থেকে গেছে, কালনাগিনী রয়ে গেছে। এক সময়কার যৌবনের রাণী এখন বার্ধক্যের কালসাপ। বয়সের ভারে বুড়ি হয়েও সে নিজকে বিশ্বসুন্দরী ভাবতে থাকে।
***
পঞ্চাশের ঘরে সুলতানার বয়স। মিথ্যা নয়। বাস্তবিকই এ বয়সে তাকে ষোড়ষীই মনে হয়। আমীরে স্পেনের নয়নমণি সে। শাহজাদীর মত ব্রাজকীয় তার জীবন। কোন দুঃখ নেই, ভাবনা নেই। ডালিমের লালদানার মত গণ্ড, মাথায় দীঘল কালো একরাশ চুল, চোখের জ্বর চমক সেই আগের মতই। স্বাস্থ্য সুস্থ্য-লাবণ্যবহুল।
একবার তার চাকরাণী চুল পরিপাটি করছিল। চিরুনি রেখে চাকরাণী তার একটা চুল উপড়াল। সুলতানা আহু করে উঠল। চাকুরাণীকে বলল, কি হলো? সে বলল, পেকে যাওয়া সাদা চুল উপড়ে ফেললাম।
মিথ্যা সুলতানা বলল, এখনই চুল পেকে সাদাঁ?
বৃদ্ধা চাকরাণী হেসে লুটোপুটি খায়। চাঁদের মত সাদা চুল তার সামনে মেলে ধরা হয়।
শুধু একটা নয় মা! চাকরাণী বলল, আরে। আপনার চুল এমন যে, এর থেকে পাকা-কাঁচা চেনা মুশকিল। বেশ কিছু চুলে পাক ধরেছে।
বেশ কিছু! এমনভাবে সুলতানা বললো যেন তার প্রিয়জন মারা গেছে।
হা! বেশ কিছু। কিন্তু আপনি ঘাবড়ে গেলেন যে চুল সেতো পাকবেই। মৃত্যু সেতো একদিন আসবেই। আমিও যুবতী ছিলাম। আমার রূপ লাবণ্যও তো একসময় আমীর-ওমরাহদের চোখ ঝলসে দিত। আমার রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে বর্তমান আমীরের বাবা আল-হাকাম আমার বাবাকে শাহী আস্তাবলের একটি হীরক খচিত তলোয়ার উপহার দিয়েছিলেন। পরে তাকে দরবারে বিশেষ মর্যাদার আসনে আসীন করেছিলেন। পুরস্কার ও অন্ন-অনুদানে দুহাত ভরে দিয়েছিলেন। আমিও এক সময় ভাবতাম, রূপ-যৌবন বুঝি অম্লান, কিন্তু প্রথম পাকা চুল আমার সেই ভুল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। সেই চুল আমি উপড়ে ফেলেছিলাম। পরে একদিন ভাবলাম, যে চুলরাজি দ্বারা এক সময় আমীরে স্পেনকে পায়ের জিঞ্জির বানিয়েছিলাম তাতে পাক ধরবেই। আমার ভুবন মোহিনী রূপ-জৌলুসে ভাটা পড়বেই।
সুলতানা মা। আমার কোন আশ্রয় ছিল না তখন। হেরেমের চৌহদ্দি থেকে আমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেবার কথা। আমি দেখেছি পরবর্তীতে শাসক দল তী তরুণী আমদানী করেছে। যাদের ইশারায় এরা নেচেছে। আমার বয়স এখন ৭৫-এর কোঠায়। হেরেমের দাসী-বাদীও রাজ মহিষীদের জীবন্ত দলিল আমি, সূর্য সাক্ষীও বলতে পার। সুলতানা! তোমারে জীবনেও সে পালা এসে গেছে। আবদুর রহমান বুড়িয়ে গেছে। এক্ষণে কোন যুবতী তাকে উন্মাতাল করতে পারবে না, ইতিপূর্বে করা হত যা।
সুলতানা ফেলে আসা সোনালী অতীতে ফিরে গেল। খামোশ দাঁড়িয়ে টহল দিতে লাগল।
সুলতানা। বৃদ্ধা চাকরাণী বলতে লাগল, তুমি এত ভড়কে গেলে যে? তোমার খোশ কিসমত যে, যৌবনের সোনালী দিনগুলোতে যে মর্যাদা ছিল তোমার আমীরে স্পেন এ বয়সেও সে পজিশন থেকে তোমায় নামায় নি, অবমূল্যায়ন করেনি। আমি তোমার হিতাকাঙ্ক্ষী, শুভানুধ্যায়ী। তোমার প্রতিটি রহস্যে আমাকে শরীক করেছে। এজন্য বড় নির্মম বাস্তব কথাটি আজ শোনালাম। তুমি এতে তকলিফ পেয়ে থাকলে আমায় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখো।
