আমি এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গ দিলেও এলোগেইছের সে মিশন সফল হত না। দীর্ঘ ২৫ বছর পর আমি কথাটা এজন্য পরিষ্কার করেছি যে, বার্ধক্যে যেন ব্যাপারটি আমাকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত না করে। সত্যিই আজ নিজকে বেশ ফুরফুরে লাগছে।
সুলতানার হাত থেকে যিরা এক পেগ মুখে নিলেন পরে বাকীটা রেখে দিলেন। ৭০-এর সিঁড়িতে তার বয়স। চুলের সবটাই বলতে গেলে সাদা। চোখে-মুখে দীপ্তি। এ বয়সেও তিনি সুলতানাকে একান্ত করে চান।
সুলতানা বললো, একটি পুরানো কথা আমার মনে পড়ে গেল। ফ্লোরার কথা তোমার মনে আছে? ওকে আমি মাত্র একবার দেখেছি। নজরকাড়া সুন্দরী সে। একবার আমীরে স্পেনকে বলেছিলাম, রোকে কিডন্যাপ করুন কিংবা কিনে আনুন। হেরেমে ওকে স্থান দিন। একথা তোমাকে বলিনি কোন দিনও। এ এক রহস্য। আজ বলছি শোন।
ফ্লোরা হেরেমে এলে তোমার মর্যাদায় ভাটা পড়ত। বয়সে সে তোমার চেয়ে ছোট। দেখতেও মনোরমা। আমীরে স্পেন তার প্রেমে দেওয়ানা হয়ে যেতেন। তুমি তাকে একথা বলতে গিয়েছিলে কেন? তাকে খুশী করতে কি?
না। তাকে দেওয়ানা বানাতে। ফ্লোরা হেরেমে এলে আমীরে স্পেন পুরোপুরি আমাদের জালে আটকা পড়বেন। আমি একরাতে জায়গিরে এলোগেইছের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম। বলেছিলাম, আমীরে স্পেন সিংহশাবক হতে চলেছেন। তার সর্বকনিষ্ঠ। স্ত্রী মোদাচ্ছেরা তার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। ফ্লোরা এসে গেলে আমরা পুরোপুরি তাকে কুপোকাত করতে পারব। কিন্তু এলোগেইছ এ প্রস্তাবে রাজী হলো না। সে বলল, ফ্লোরা পবিত্রা নারী। হেরেমে গিয়ে সে কেবল নাপাকই হবে। পরে জংগলে কিংবা নির্জনে যীশুর নাম জপতে জপতে নিজকে বিলিয়ে দেবে এবং আমীরে স্পেনের কাছে সব কথা বলে দেবে। এতে আমাদের সকল রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে।
তোমার অজানা থাকার কথা নয় সে আমাকে দেশের কোন এক অংশের রাণী বানানোর প্রস্তাবনা রেখেছে। আমার ইশারায় নেচে থাকে; কিন্তু আমার কথায় সে এতটুকু নিজস্ব চিন্তাধারা থেকে টলেনি সেদিন। সত্যি বলতে কি, আমি বেশ রাগও করেছিলাম। এলোগেইছ ওই সময়টায় মদ গিলে আমার সাথে কথা বলেছিল। আমি তখন বেশ চটে চটে কথা বলেছিলাম। তার মিশন সফল করতে অনেক কিছুই করতে পারতাম। এজন্য সে আমাকে নারাজ করা ভালো মনে করেনি।
সুলতানা দম নিল। আমার বলতে লাগল, তুমি বিরক্ত হচ্ছে না তো যিরি! আমার ভালবাসার জালে তোমাকে আটকাবার জন্য এ কথা বলছি না। ফ্লোরা আমার মিশনে শামিল হলো। কোন এক রাতে আমরা একটি কক্ষে একত্রিত হই। জনৈক পাদ্রী আমাদেরকে ওখানে গোপন করে রেখেছিলেন। ফ্লোরা যখন জানতে পারল, বিশেষ এক উদ্দেশ্যে আমি আমার নারীত্ব থেকে বঞ্চিত রয়েছি তখন সে আমার সাথে প্রাণ খুলে আলাপ করল। ভাবতেও পারিনি কচি বয়সের মেয়ে এতটা বিজ্ঞতার সাথে কথা বলতে পারে। তার কথায় আমার মাঝে নব উদ্দীপনা ও অদম্য স্পৃহা দেখা দিল।
এলোগেইছ আমাকে বলল, ফ্লোরার প্রেম সে মন থেকে মুছতে পারছে না। থামল সুলতানা- যিরাব বললেন, মোর হয়ত জানা নেই এলোগেইছ ও তার কি পরিণতি ঘটেছে।
জানি। সকলেই জানে।,
হয়ত ওদের মৃত্যু সংবাদ তোমার জানা। কিন্তু ওদের সম্মিলিত মিশনের খবর তোমার জানা নেই এবং এক নারীর ভরসা করে এলোগেইছ কি ভুলটাই না করেছিল? যিরাব অতীতের একটি ধূসর পর্দা উন্মোচন করলেন, আপনার জীবদ্দশায়ই স্পেনে যীশুরাজত্ব কায়েমের জন্য মুসলমানদের রাজ্যহারা করার ইবলিসি প্ল্যান করেছিল ফ্লোরা। স্রেফ একারণেই সে তার নারীত্ব ও যৌবনকে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। সেজেছিল পাদ্রী। খ্রীস্টানরা তাকে দ্বিতীয় মরিয়ম মনে করছিল। খ্রীস্টানরা ভেল্কি আগুনের ধোঁয়ায় কবরস্থানে যীশুর এক নিবেদিত প্রাণ সেবিকা হিসেবে তাকে তুলে ধরে জনতার খ্রীস্টত্বকে জাগরুক করতে সচেষ্ট হয়েছিল। এরাই মাদ্রিদ ও টলেডোয় বিদ্রোহ করিয়ে হাজারো খ্রীস্টানকে যমালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থাদি করেছিল। কিন্তু এতে ওদের ফল শূন্যের কোঠায়ই থেকে গিয়েছিল। মোহাম্মদ ইবনে আঃ জব্বারকেও তাদের দলে ভিড়িয়ে ছিল। তুমি আবদুর রহমানকে ময়দান নামতে যারপরনাই বাধা দিয়েছিলে কিন্তু………
কিন্তু মোদাচ্ছেরা তার ওপর যাদু চালিয়েছিল। সুলতানা বলল।
স্রেফ মোদাচ্ছেরা নয়- স্পেনের সালাররাও তাকে জাগরুক করে তুলেছিল যাদের ঈমান ছিল শক্ত মজবুত। শহীদী চেতনা ছিল পুঁজি। স্পেন বিজেতারা ছিল তাদের আবেগের উৎস। এদেশে ইসলামী ঝান্ডা পোথিতকারীরা ছিল তাদের স্পৃহার সূতিকাগার। ওরা তাকে কি করে মর্দে মুমিন বানিয়েছিল তা তোমার অজানা নয়।
তুমিও কি ফ্লোরাকে আমার চেয়ে সুন্দরী মনে কর? নেশার বুঁদ হয়ে সুলতানা বলল।
আমি কাকে কি মনে করতাম সে প্রশ্ন এখন থাক। তুমি আমার কাছে অতীত কাহিনী জানতে চেয়েছো জানাচ্ছি; কাজেই আমাকে আমার কথা বলতে দাও। তোমারই কারণে আমি ঈসায়ীদের পক্ষে নির্লজ্জ দালালী করেছি। আবার জায়গীরে দরবেশরূপী এলোগেইছের সাক্ষাৎ করেছ তুমি। তোমার প্রেমে অন্ধ ছিলাম আমি। এলোগেইছ আমাকে বলেছিল, আমি আরব থেকে এসেছি–আজই মুসলমানদের তাহযীব-তামাদ্ন বদলে দাও। তুমি বলেছিল, স্পেনে মুসলিম শাসনের বারোটা বাজাও, খ্রীষ্টানরা আমাদের একটা প্রদেশ দেবে। সে প্রদেশের রাজা হব আমি, তুমি হবে রাণী।
