উমাইয়া আবদুর রহমানের কোন স্ত্রীর গর্ভজাত ইতিহাস সে ব্যাপারে খামেশ। মোদাচ্ছেরা তখন যুবতী স্ত্রী। তার গর্ভে ২১/২২ বছরের যুবক পুত্র অসম্ভব।
উমাইয়া বলেন, আমি আব্বজনকে বাধ্য করেছি টলেডোয় একদল ফৌজ পাঠাতে। ইবনে ওয়াসিম তাকে টলেডো পরিস্থিতি জ্ঞাত করলেন। ওই রাতেই টলেডো অবরোধ করা হলো। দরজার ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয়। কিন্তু বিদ্রোহীরা এতে এতটুকু প্রভাবিত হয়নি।
অবরোধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো। কোনো ফল না পেয়ে উমাইয়া অবরোধ তুলে নিতে বললেন। বিদ্রোহীরা তো অবাক। কর্ডোভা বাহিনীর অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার কথা নয়। বিদ্রোহীদের কমান্ডার বললো, একজন মুসলিম সেনাও যেন জিন্দা ফিরে যেতে না পারে। তোমরা পশ্চাদ্ধাবন করো, ফরান দরজা খুলে দাও। শহর থেকে হাজার হাজার বিদ্রোহী বেরিয়ে এল। বাধ ভাঙ্গা প্লাবন সে কোন ছার।
ওই সময় কর্ডোভা বাহিনী কালতারাডা পাহাড়ের পাদদেশে উপনীত হয়েছিল। খ্রীস্টবাহিনীর পশ্চাদ্বাবন দেখে উমাইয়া সকলকে আত্মগোপন করতে বললেন। এ দেখে খ্রীস্টানদের হিম্মত বহুগুণে বেড়ে গেল। দ্রুতগতিতে তাদের ঘোড়া পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করল। সমগ্র বাহিনী পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশ করলে মুষলধারে তীর বৃষ্টি শুরু হলো। এ কৌশল উমাইয়ার। উমাইয়া প্ল্যান করেছিলেন, অবরোধ উঠিয়ে নিলে বিদ্রোহীরা একে আমাদের দুর্বল ভাববে। সে সুযোগে তারা আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করবে। আমরা পাহাড়ী এলাকায় প্রবেশের আগে ওদের ওপর আক্রমণ চালাবে। না। ওরা সত্যিই বুদ্ধিমান হলে ফটক ছেড়ে বের হবে না। বের হলে কেল্লা ফতেহ।
মৌলবাদী খ্রীস্টানরা বিজয় শেষে বোকামি করল এবং উমাইয়ার পাতা ফাঁদে ফেঁসে গেল। শাঁ শাঁ করে তীর আসতে লাগল। অনিঃশেষ সে ভীর, অব্যর্থ সে টার্গেট। খ্রীস্টানরা টলেডোমুখী হতে গিয়ে দেখল, পেছনে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় দাঁড়িয়ে উমাইয়ার পশ্চাৎ বাহিনী।
কালতারাদা পাহাড় খ্রীস্ট মৌলবাদীদের রক্তে ভেসে গেল। আটকে গেল ঘোড়ার পা। একেই বলে গণহত্যা। প্রাণ নিয়ে পালাতে পারে নি একজনও। জনৈক নও মুসলিম কমান্ডার উমাইয়ার সাথে এসেছিলেন। তিনি দক্ষ কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও খ্রীস্টালাশের পাহাড় ও রক্তকন্যা দেখে বেঁহুশ হয়ে পড়লেন। সেই বেহুঁশী দেখে আর হুশ ফিরে পাননি।
এদিকে মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম তার সাধের টলোডোয় প্রবেশ করেন বিজয়ীর বেশে যেখানে তখন বাধা দেয়ার কেউ নেই।
২.৫ সুলতানা ও যিরাব
এরপরে পেরিয়ে গেছে বেশ কযুগ। ভূমধ্যসাগর গড়িয়ে গেছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিউসেক পানি। সময় চলেছে তার আপন গতিতে। সে কত শিশুকে জোয়ান আর জোয়ানকে করেছে বুড়ো। আবদুর রহমানের হেরেমেও সময়ের পরিবর্তন এসেছে। যুবতী সুলতানা আজ ৫০ বছরের মাঝবয়সী। নিটোল গালে পড়েছে তার ভাঁজ বেশ কটা। আবদুর রহমানের বয়স ৬০ এর কোটা অতিক্রম করে গেছে, যিরাব ৭০-এর ঘরে। সুলতানার পুত্র আবদুল্লাহ যৌবনের সিঁড়িতে। বয়স ১৯ কিংবা ২০।
আবদুর রহমানের চিন্তাজগতে আমূল বিপ্লব সাধিত হয়েছে। যিরাবও সেই আগের যিরাব নেই। আমীর আবদুর রহমান থাকলেও বেশ কিছুকাল হুকুমত ছিল যিরাবের। তিনি সুখ ও সংগীতের যাদুতে মাতিয়ে রেখেছিলেন আবদুর রহমানকে। তার দেমাগে রাজত্বের ভূত চেপে বসেছিল। কিছু সিংহশাবক স্পেন অরণ্যে হুংকার মেরেছিল সেদিন, যে হুংকার আবদুর রহমানের আলস্য নিদ ভেঙ্গেছিল, নয়ত দ্বিতীয় আবদুর রহমানের যুগেই স্পেনের পতন ঘটে যেত। প্রতিষ্ঠিত হত খ্রীস্টানদের রাজত্ব।
যিরাব অভাবিতরূপেই অগাধ মেধার অধিকারী। তিনি বেশ কিছুকাল গবেষণার দ্বারা ভেবে দেখেছিলেন যে, আবদুর রউফ, উবায়দুল্লাহ, মূসা ইবনে মূসা, আবদুল করিম, করতুন ও আবদুর রহমানের ভাই মোহাম্মদের উপস্থিতিতে তার সকল প্ল্যান মাথা কুটে মরতে বাধ্য। প্রাসাদে তার যে মর্যাদা বিলক্ষণ তাও হারিয়ে যেতে বসেছে। হৃদয়বীণার তার দিয়ে কাউকে মোহাচ্ছন্ন করা আর ক্ষমতার বাগডোর হাসিল করা এক কথা নয়। কাজেই ক্ষমতালিন্দু মনোভাটি ও ষড়যন্ত্র শব্দটি জীবন ডায়েৰী থাকে এক সময় মুছেই ফেললেন তিনি। তবে সুলতানা প্রেম থেকে বিরত থাকতে পারলেন না। এ এক ধরনের পাগলামি; বয়স, মেধা ও চিন্তা যেখানে খেই হারিয়ে ফেলে।
তিনি সুলতানকে প্রায়ই বলতেন, আমার রাগ-রাগিণীতে সেই প্রতিক্রিয়া আর নেই যা আছে তোমার সৌন্দর্য-সুষমায়। আমার মিউজিক এখনো তোমার মুক্তাসম দণ্ডমালার হাসিবোল ফুটিয়ে তুলতে পারেনি।
সুলতানা তার পার্শ্বে থাকলে উন্মাতাল হয়ে যেতেন। সুলতানা অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে বলা শুরু করে, যিাব? এবার আপনি কারো গলে মালা পড়ান।
যিরাব বলে, জীবন একটা। সেখানে অধিকারও একজনের। দ্বিতীয় কারো প্রবেশের সুযোগ নেই। একথা ২০/২৫ বছর আগেকার। তুমি আছো তো সব আছে। তুমি নেই কিছু নেই।
কিন্তু আমি যে আমীরে স্পেনের। সুলতানা বলত, আপনি আমাকে প্রাসাদ থেকে তুলে নিতে পারবেন না। হাত ধরাধরি করে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলে যাব কৈ? সিংহশাবক নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছার পূর্বেই আমরা ধরা খেয়ে যাব। করুণ পরিণতিও আপনার অজানা নয়। কাজেই আমাকে অন্তরঙ্গভাবে পাবার আশা ত্যাগ করুন। তবে আমাকে আপনি মনে করতে পাররেন অধিকার কেবল কথার, দেহের নয়। আমি কী আপনাকে আমার জায়গীরে নিয়ে যাইনি? আমার ও আপনার গভীর সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় কাউকে রেখেছি কি কখনো?
