ফওরান এক লোককে ডেকে তার ঘোড়ার পিঠে হাশেম কর্মকারের লাশ চাপানো হলো। যিনি এই লাশ নিয়ে গেলেন তিনি নামীদামী এক গোয়েন্দা। ছিলেন খ্রীস্টান ছদ্মবেশে। এই বেশে তিনি খ্রীস্টানদের বহু তথ্য উদঘাটন করেছেন। তাকে বলা হলো, শহরে ঘোষণা করা হোক, এ সেই হাশেম যে তোমাদেরকে বিদ্রোহে মদদ করেছে। কর্ডোভা থেকে পিপীলিকার মত বাহিনী আসছে। কারো রক্ষা নেই। বিদ্রোহীদের এমন শাস্তি দেয়া হবে ইতিহাসের কলম যা লিখতে কেঁপে ওঠবে। কর্ডোভা বাহিনী কোথাও তবু গেড়ে আছে, যে কোন সময় টর্নেডো গতিতে এসে পড়বে।
***
বিদ্রোহীরা যে বাহিনী গড়ে তুলেছিল তাদের অর্ধেকটা বাইরে তাঁবু গেড়ে ছিল, বাদ বাকীটা শহরের ভেতরে। এক খবরে জানা গেল, বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ফ্রান্সের কমান্ডার এসেছে। এ দ্বারাই মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম বাহিনীর পরাজয়ের কারণ অবলীলায় বুঝে আসে। এ বাহিনীর মনোবল তুঙ্গে কেননা ছোটখাট বিজয় তারা অর্জন করে যাচ্ছিলেন। মুসলিম ফৌজ তাদের মোকাবেলায় নগণ্য।
***
পরদিন।
বিদ্রোহী সেনা ছাউনিতে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, তাদের আধ্যাত্ম গুরু ও প্রধান নেতা হাশেম কর্মকারের লাশ শহরের প্রবেশ ফটকের সামনে ঝুলছে। লাশ যারা ঝুলিয়েছিল তারা শহরের প্রধান ফটকে বিদ্রোহীদের প্রহরা দেখেছিল। কাজেই তারা ভেতরে ঢুকতে পারেনি। ফ্লোরার ব্যাপারে রটেছিল, সেও মারা গেছে। ফ্লোরাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। অবৈধ প্রেমের দরুন তার প্রেমিক ক্ষুব্ধ হয়ে এ কাজ করেছে। আরো ছড়ানো হলো, ফ্লোরা ছিল একটি রহস্য। সে বিবাহ বহির্ভূত এক লোকের সাথে একই ছাদের নীচে শুয়েছে। তার সাবেক প্রেমিকই তাকে হত্যা করেছে।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম খ্রীস্টানদের বেশে আজো ছদ্মবেশী গোয়েন্দা ছড়িয়ে দেন। তারা এসে সংবাদ দেয়, মিশন সফল। শহরের বাইরে ছাউনি ফেলা বিদ্রোহী প্রধান ফটকে ভীড় জমায়। হাশেম কর্মকারের শেষ পরিণতি দেখার জন্য হুলুস্থুল বেঁধে যায়।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম তার নগণ্য বাহিনী পূর্ব হতেই সতর্ক অবস্থায় রেখেছিলেন। রাতের বেলা তিনি সৈনিকদের উদ্দেশে এক জ্বালাময়ী ভাষণ রেখেছিলেন।
ভোমরা আল্লাহর সৈনিক। দুশমনদের সংখ্যাধিক্যে ঘাবড়ে যেও না। আল্লাহর রাসূল কোনদিনও কাফেরদের সংখ্যাধিক্যের প্রতি ভুক্ষেপ করেননি। তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিটি যুদ্ধেই বলতে গেলে কাফেরদের দল ভারী ছিল। কিন্তু বিজয়ের সোনার হরিণ মুসলমানদের পদচুম্বন করছে। আজরাসূলের পবিত্ৰাত্মার চেতনা আমাদের জেহাদী বক্ষে জাগরুক করে তোল। খ্রীস্টানরা তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করেছে মনে করো না বরং খ্রীস্ট-ই ইসলামের ওপর বিজয় লাভ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কর্ডোভার বিলাসী আমীরের উদাসীনতা তোমাদের যেন ভাবিয়ে না তোলে। ওরা দুনিয়াদারে। এ জীবনই ওদের কাছে সবকিছু, কিন্তু তোমাদের আসল জীবন মরণের পরে। তোমরা খোদার সৈনিক, খোদার প্রিয় মুজাহিদ। আর কোন মুজাহিদের কাছে জাগতিক জৌলুস প্রাধান্য পেতে পারে না। বিদ্রোহীরা একবার আমাদের পরাভূত করেছে। ঐ পরাজয়ে হতোদ্যম হয়ে একেই আগামী দিনের বিজয়ের মাইল ফলক মনে করে এগিয়ে যাও। টলেডো কাফেরদের কজায়। যে হিংস্রতার শিকারক্ষেত্র বানাতে আদা নুন খেয়ে নেমেছে ওরা– তোমাদের নয় তা, তোমরা কি এই বেইজ্জতির প্রতিশোধ নিতে চাও না?
ফৌজ নারাধ্বনি করে। হ্যাঁ, হা! আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই। শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। কর্ডোভার তখতে তাউস উল্টে আমরা সেখানে বোদার রাজ কায়েম করব। শহীদের ফোঁটা ফোঁটা খুনের বদলা আমরা এক একটা বিলাসীকে হত্যার মাধ্যমে নেব ইনশাআল্লাহ।
এরপর মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে আর বলতে হলো না। তার কাছে হাশেম কর্মকারের নিহত হবার খবর আসা মাত্রই বিদ্রোহীদের তাঁবু গুটানো শুরু হয়ে যায়। তারা সেনা ছাউনি ছেড়ে পালাতে থাকে।
সেনা ছাউনি ওখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে। তিনি সুযোগমত তার বাহিনী ছড়িয়ে দিলেন। এবার ফৌজ এক মাইল লম্বা কাতার ধরে কোচ করতে লাগল। মুসলিম ফৌজের চলার পথে বিধস্ত। কিছু তবু দেখা গেল। কমাণ্ডারদের নির্দেশে তাবু ও ডেকচিসহ খড়ের কুটোয় আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। বিদ্রোহী বাহিনী শহরের প্রবেশদ্বারে ভীড় করে দাঁড়ানো ছিল। সেই ভীড় থেকে আর্তনাদ ভেসে এলো, ফৌজ এসে গেছে, কর্ডোভার ফৌজ।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করতে বললেন। বিক্ষিপ্ত আকারে চারদিক থেকে তার ফৌজ বিদ্রোহীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু পলায়ন করার সুযোগ নেই তাদের। পালাবে কোথায়। পলায়নের তামাম পথ রুদ্ধ। ক্রীড়া ও মহড়ার ময়দানে এটি। যাদের হাতে অস্ত্র ছিল তারা মুসলিম সিপাহীদের মোকাবেলায় নামল। বাদবাকীরা ফটকের ভেতরে চলে গেল। যারা লড়াইতে নেমেছিল তাদের সাথেই মারা পড়ল। ভেতর থেকে বিদ্রোহীরা প্রবেশ দরজা রুদ্ধ করে দিল। ওদিকে মুসলিম বাহিনী দেয়ালের ওপর থেকে তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করছিল।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের টর্নেডো বাহিনী যে গতিতে এসেছিল সে গতিতেই আবার পিছপা হলো। বিদ্রোহীদের অর্ধেকটা ইতোমধ্যেই শেষ। তাই শহর রক্ষা তাদের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম আসমানের দিক দুহাত উঁচিয়ে ফরিয়াদ করলেন। আশু বিজয় কামনায় তার দুচোখ বেয়ে নামল অশ্রর ফোয়ারা। ইতিহাস তার এ বিজয় গাঁথাকে মোজেযা হিসেবেই উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তার ফরিয়াদ শুনলেন। পরের দিন খবর এলো, আবদুর রহমানের পুত্র উমাইয়ার নেতৃত্বে কমান্ডো আসছে কর্ডোভা থেকে। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম ঘোড়ায় চেপে তাকে সংবর্ধনা জানাতে ছুটে গেলেন।
