এ তাহলে সে-ই। তোমরা জানো না কি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এটি। ওই মেয়ে-ই বিদ্রোহীদের প্রাণকেন্দ্র। আমি ওর বুকে খঞ্জর ফুলা ঢুকিয়েই তবে ক্লান্ত হব। শেষের দিকের কথা বলতে গিয়ে মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠল।
তিনি তখনই তার কমান্ডারদের ডেকে পাঠালেন। বললেন, স্রেফ ১৫ জন সেপাই। যাদের স্পৃহা-উদ্দীপনা অজেয়, ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তীক্ষ্ণ মেধা, প্রত্যুৎপন্নমতি।
কিছুক্ষণের মধ্যে ইসলামের নামে আত্মোৎসর্গী ১৫ জন জানবার্য তৈরী হয়ে গেল। তিনি সকলকে বলে দিলেন, এরা দুজন তোমাদের পথ প্রদর্শক। রাতের বেলা ওই গুহায় অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে হবে। দেখো কেউ যেন পলায়ন করতে না পারে। মেয়েটাকে জীবন্ত গ্রেফতার করো। আমরা খ্রীস্টানদের দেখাতে চাই এ-ই তোমাদের তথাকথিত কুমারী মরিয়ম যার ভেলকি তোমরা কবরস্থানে দেখেছ।
গভর্নর অপর এক হুকুমে বললেন, বাদবাকী ফৌজ এখানে জমায়েত কর। এতে উপকার হবে দুটি– টলেডো বাসী ভাববে, ফৌজ পরাজিত হয়ে পলায়ন করছে। এবং সেক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা প্রচণ্ড হামলা চালানোর সাহস পাবে। এতে বিজয়ের দিনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে তারা।
গভীর রাতে ১৫ জন জানবা সেপাই দুর্গম টিলায় এসে দাঁড়াল। সাথে দু পথ প্রদর্শক। টিলাটিকে প্রশস্ত এক কেল্লাই বলতে হবে। এরা একসাথে যাচ্ছিল না, যাচ্ছিল দূরত্ব বজায় রেখে।
আচমকা ঘন ঝোঁপ থেকে আওয়াজ এলো– কে? জলদি এসো!
সামনের জানবায সেপাই থমকে দাঁড়াল। আহ্বানকারী তার সামনে এসে দাঁড়াল। আচমকা পেছন থেকে এক মুজাহিদ ওই বিদ্রোহী পাহারাদারের পিঠে খঞ্জর ফলা আমূল ঢুকিয়ে দিল। মুজাহিদরা তাকে সুগভীর ঢালে নিক্ষেপ করল। পরে আবার শুরু হলো দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পথচলা। একটি গিরিপথ থেকে চলতে গিয়ে তারা আবার আরেক আওয়াজ পেল। সকলেই পথ ছেড়ে পাশের ঝোপে আত্মগোপন করল। স্রেফ দুমুজাহিদ মূলপথে অগ্রসর হলো।
তোমরা কে গো ভাই! জনৈক সিপাহী জিজ্ঞেস করল, আমি যখমী, আমি পানি তালাশ করে ফিরছি। আহ্বানকারী একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। এক বিদ্রোহী এ সময় দূরে আত্মগোপন করে এ দৃশ্য অবলোকন করছিল। অবস্থা বেগতিক দেখে এক লাফে অগ্রসর হলে দুমুজাহিদ তার বুকে খঞ্জর ঢুকিয়ে দিল।
মুসলিম কমান্ডার বললেন, ঘাটির পথে ওদের পাহারা খুবই নিচ্ছিদ্র মনে হচ্ছে।
আরেকটু অগ্রসর হয়ে আমাদের মূলপথ থেকে হটে যেতে হবে। পাড়ি দিতে হবে দুর্গম পথ। মুখে তালা দিতে হবে সকলের।
স্থানটি দুর্গম কেল্লা থেকে কোনো অংশে কম নয়। আরো উঁচু টিলায় চেপে তারা আলোর সন্ধান পেল। দুবিদ্রোহী পাহাড়ের মোড়ে আগুন জ্বেলেছিল। শাঁ করে দুতীর এসে এদের ঘায়েল করল।
প্রাথমিক এই বিজয়ের পর ওই পাহাড় থেকে নেমে আরেকটি পাহাড়ে চড়ল তারা। পনের জন জানবাযের দুজন মূল ঘাটির মূলে এসে দাঁড়াল। আড়ি পেতে তারা গুহার খবরাখবর নিয়ে এলো। এদের দ্বারা জানা গেল, ফ্লোরা এখানে নেই। সন্ধ্যার পূর্বে সে পলায়ন করেছে। ভেতরে আলো জ্বলছে টিমটিম। গুহার অভ্যন্তর বেশ চওড়া।
গুহার ভেতরে অবস্থান করে বিদ্রোহীরা মদের ড্রাম সামনে নিয়ে নেশা করছে। বলে চলেছে বিদ্রোহের আগামী দিনের নানা পরিকল্পনা। শাঁ করে তিনটি তীর তিন বিদ্রোহীর সীনা এফোঁড় ওফোড় করে দিল। ভেতরে এদের সংখ্যা জনাত্রিশেক হবে মাত্র। গুহাটি মসৃণ নয় তবে প্রশস্ত। প্রকাণ্ড পাথরে ঠাসা। এক একটি পাথরের পেছনে এক একজন একে আড়াল করে দাঁড়াতে পারে।
বিদ্রোহীরা হুঁশিয়ার হয়ে গেল। সকলেই ওসব পাথরের আড়ালে গিয়ে তীর নিক্ষেপ শুরু করল। বিদ্রোহীরা এতই দিশেহারা হলো যে, মশল ও প্রদীপ নেভানোর হুঁশটুকু তারা হারিয়ে ফেলল। বেশ খানিকক্ষণ তীর বিনিময় চলল। চার জানবায মুজাহিদ বুকডন করে ভেতরে গেল। তারা ঐ প্রকাণ্ড পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে সরাসরি তীর নিক্ষেপ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে লাগল। এদের দেখাদেখি আরো চার মুজাহিদ সাহস করে ভেতরে এলো। তলোয়ার ও বর্শা যুদ্ধ শুরু হলো এবার। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই যুদ্ধ খতম হয়ে গেল। ভেতরের সকল বিদ্রোহীকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়া হলো।
মুজাহিদদের মাত্র তিনজন শহীদ ও দুজন যখমী হলো। মুজাহিদ কমান্ডার যখমী বিদ্রোহীদের জিজ্ঞেস করলেন, হাশেম কর্মকার কৈ। সে এক যখমীর দিকে ইশারা
করলে। দেখা গেল বেটা অক্কা পেয়েছে। তার দেহে দুটি তীর বিদ্ধ। তার লাশ টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসা হলো।
শেষ রাত।
ফ্লোরার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দুশ্চিন্তা গ্রস্ত। তার চিন্তার ললাটে বেশ কটা ভাজ। বিক্ষিপ্ত পায়চারী করছেন ও দিগন্তে চোখ ফেলছেন। পাশে জনাতিনেক কমান্ডার।
এক সময় অপেক্ষার পালা শেষ। খবর এলো, মুজাহিদবৃন্দ এসে পড়েছে। তিনি দৌড়ে বের হলেন। গেরিলা মুজাহিদ ও ওই দুপথ প্রদর্শক দণ্ডায়মান। সামনে তিন শহীদের তিন লাশ মোবারক ও দুখমী। এ ছাড়া পৃথক একটি লাশও দেখা গেল।
এই কি হাশেম কর্মকার? প্রশ্ন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের।
হ্যাঁ! এ লোকই।
এই লাশ শহরের চৌরাস্তায় লটকে দাও। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম হুকুম দিলেন, ওকে গোটা খ্রীস্টান সম্প্রদায় ও মোয়াল্লেদীন আন্দোলন কর্মীরা দেখুক। ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই এ লাশ লটকাও। এরপর দেখা যাবে ফ্লোরা কোথায়।
