আমার গোস্তাকির জন্য আগাম মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আপনি সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলের কথা বলছেন। অসম্ভবকে এই মুহূর্তে আমাদের সম্ভব করে দেখাতে হবে। কর্ডোভার কমান্ডো আগমন পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারব না। উদ্দীপনা ও স্পৃহাকে এ মুহূর্তে কাজে লাগাতে হবে। বিদ্রোহীদের উৎসগিরি খতম না হওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহ দমন হবে না। আমাদের কোরবানী দিতে হবে প্রচুর। আমরা জানবাযি রাখতে প্রস্তুত। আমরা বেশী অপেক্ষা……………., কমান্ডার আর কিছু না বলে মূৰ্ছা খেয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়ল। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম ও উপস্থিত উপ-সেনাধ্যক্ষরা তাকে ঘিরে ধরল। তার পেটে কাজ কাপড় মোড়ানো। অধিক রক্তক্ষরণের ফলে তিনি শাহাদত বরণ করলেন। কোনো মোজেযাবলেই এতক্ষণে তিনি কথা বলেছেন। কাপড় সরিয়ে দেখা গেল তার পেট ফাড়া।
এই জানবায যখন এখানে এসেছিল তখন সে জীবিত ছিল না। তার রুহ-ই। এতক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলেছে। উহধ্বনি দিয়ে তিনি বলছেন, কওমের কোরবানী ও উদ্দীপনা শাসকদলের দহলিয়ে গিয়ে অর্থহীন ও নিশ্চল হয়ে ফেরে। কর্ডোভার দূত এখনও আসেনি। আমাদের আমীর বোধ হয় টলেডো পরিস্থিতি এখনও ঠাওর করতে পারেন নি। তিনি ঠাওর করতে না পারলেও আমরা পারছি। তিনি রাজত্ব ও ক্ষমতার পূজারী। আমরা স্বাধীনতার অমীয় চেতনায় বিশ্বাসী। স্পেন কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়। যতক্ষণ জিন্দা আছি ততক্ষণ আমরা একে বুকের তাজা খুনে রক্ষা করে যাব। মরলেও যার যার দায়িত্ব আদায় করেই তবে মরব। কিন্তু হাশেম কর্মকারের তথ্য কে দেবে আমায়?
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দুহাত উঁচিয়ে আসমানের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে ওঠেন। তোমার নামে…………তোমার সাহায্যে……..আমাদের ভুলে যেও না খোদা……..।
***
খোদাতায়ালা সিংহশাবকদের ভুলতে পারেন না। কর্ডোভাবাসী ভুলে গিয়েছিল যে, মোয়াল্লেদীন আন্দোলন কি। তারা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে মুসলিম জাতির সামনে। এ সেই আবদুর রহমান যিনি ফ্রান্সের ওপর হামলার ছক এঁকেছিলেন, সেই তিনি বিদ্রোহকে খুব আমলে আনছিলেন না। সঙ্গীতজ্ঞ যিরাব ও ছলনাময়ীর কোপানল থেকে বাবাকে ছড়িয়ে আনলেও আবদুর রহমানের ভুল ধারণা ভাঙ্গাতে পারেননি আমীর পুত্ৰ উমাইয়া। আবদুর রহমান সেনাপতিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদেরকে বলার সুযোগ দেননি তেমন একটা তিনি। সেনাপতি বলেছিলেন।
আমি মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে চিনি। সামান্য ঘটনায় লোকটা ঘাবড়ে যায়। টলেডোর খ্রীস্টানরা এতটা দুঃসাহসিক নয় যে, তারা বড় মাপের বিদ্রোহ করবে। আমার মন বলছে, ডাকাতরা দুএকটা কাফেলা লুণ্ঠন করেছে। আপনারা কি আমাকে টলেডোয় বিশাল এক বাহিনী পাঠানোর পরামর্শ দেন? আপনারা দেখছেন, কর্ডোভা পরিস্থিতি ক্রমশঃ আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে।
ডাকাতদের খপ্পরে পড়লে তার ঘাবড়ানো উচিত নয়। তথাপিও আমাদের কোনো খুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। এখানকার পরিস্থিতি জানতে লোক পাঠানো যেতে পারে। সেনাপতি বললেন।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের কক্ষ থেকে কমান্ডারের লাশ উঠানো হলো। তিনি তার সামান্য বাহিনীকে ব্যবহারের প্ল্যান আঁকছিলেন মনে মনে। ইতোমধ্যে তিন-চারটি রিপোর্ট দ্বারা তিনি অবগত হলেন টলেডো নগরী কার্যত বিদ্রোহীদের দখলে। অবস্থা এমন হলে বিদ্রোহীদের দমন তার একার পক্ষে সম্ভব না। তিনি বড় দুশ্চিন্তগ্রস্ত অবস্থায় কামরায় পায়চারী করছিলেন। অপেক্ষা করছিলেন কর্ডোভা দূতের।
ইতিহাস লিখছে, আবদুর রহমান দূতের কাছে পত্র মারফত এই ফরমান লিখেছিলেন, কি হলো তোমার! বিশাল সৈন্যবহর নিয়েও তুমি সামান্য কিছু ডাকাত ও ছিনতাইরীদের রুখতে পারছ না। সামান্য কিছু লোক যদি বিদ্রোহ করেও থাকে তাহলে কেমন কাপুরুষ ও অকর্মা সেপাইদেরকে তাদের দমন করতে প্রেরণ করেছে যারা পা চালিয়ে লড়তে পারে না? খোদ নিজেই ময়দানে নেমে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কচুকাটা করো।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের শিরায় খুন উত্তপ্ত হয়ে উঠল। বিদ্রোহীদের সামনে হাতিয়ার সমর্পণ করলেও ছিল আরেক কথা। আবদুর রহমানের পুত্র তার কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়েছিল মাত্র। তিনি চূড়ান্ত লড়াইয়ে আমার প্রস্তুতি নিলেন।
যখন তিনি নয়া ফায়সালা করার চিন্তা করছিলেন তখন সেই দুই সেপাই তার কাছে এলো যারা পাহাড়ে সত্যগোপন করে ফ্লোরার ঘাটি দেখেছিল। তিনি তাদের বললেন; কি সংবাদ এনেছে তোমরা? আমাদের আর কত চৌকি ধ্বংস হয়েছে? বিদ্রোহীদের আর কি কি বিজয় সাধিত হয়েছে?
আমাদের কাছে নতুন কোন সংবাদ নেই। ওদিন আমরা দুজন লড়াই থেকে পলায়নকালে চার বিদ্রোহী আমাদের ঘিরে ফেলে। আমরা পাহাড়ী এলাকায় আপাতত গোপন রইলাম। পশ্চাদ্ধাবনকারীরা আমাদেরকে দেখতে পায়নি। তারা খুঁজতে খুঁজতে নীচে নামছিল। ওদের কথা আমরা শুনেছি। বুঝেছি পাহাড়ে বিশেষ কোনো ঘাঁটি আছে। ওরা এক সময় আমাদের না পেয়ে আগে বাড়ে। আমরা তখন ফিরে আসার প্ল্যান করছিলাম, কিন্তু কেন যেন ওদের ঘাঁটি আবিষ্কারের অদম্য স্পৃহা মনকে উতলা করে তুলল। ওখানেই বসে ওদের সে ঘাঁটি আমাদের দৃষ্টি খুঁজে ফিরল। সত্যিই আমরা সে ঘাঁটি অবলীলায় পেয়ে বসলাম।
কি পেলে তোমরা?
ওখানে একটি গুহা থেকে কিছু মানুষকে বের হতে দেখলাম। দেখলাম ভুবন মোহিনী এক সুন্দরীকেও।
