কিছুক্ষণের মধ্যে বিদ্রোহীরা নীচে এসে গেল। থমকে থমকে চলছিল তারা। তাদের একজনে বলল, ওদের তালাশ করে মারা দরকার। আমাদের মূল ঘাঁটিতে বেটারা যেন পৌঁছে না যায়।
দেখ দেখ! আরেকজনে বলল, ওরা বেশ সামনে অগ্রসর হয়েছে। ঘাঁটি দেখে ফেললে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হবে বৈকি।
মুসলিম সেপাহীদ্বয় জীবন বাঁচানোর তাগিদে হন্যে হয়ে ঘুরে ফিরছে। তাদের কানেও বিদ্রোহীদের উপরোক্ত কথা যায়। বলে, খুব সম্ভব ওরা সে জায়গার কথা বলছে যেখানে ওদের নেতারা থাকে এবং যাবতীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে।
শুনেছি যে কুমারী মরিয়মের আর্বিভাব ঘটেছিল কবরস্থানে, সেও এখানে আছে। অপরজনে বলল।
আমাদের কমান্ডার বলেছিল বিদ্রোহী নেতা হাশেম কর্মকার। সে তার সাথে এক তন্বীতরুণীকে রেখেছে। ওই তরুণীকে তারা পবিত্র মনে করে।
আল্লাহর নাম নাও দোন্ত। অপরজনে বললো, ওই স্থান তালাশ করো! মরতে হলে কিছু করেই তবে মরব। ধর্মের নামে ওরা ধোকা দিলে সেই ধোকাকে আমরা ইসলামের নামে খতম করব। ওপরে অবস্থান নেয়া বিদ্রোহীরা বলেছে, আমরা না আবার আগে বেড়ে যাই।
এদের উপরে যারা ছিল তারা আগে বেড়ে গেল। মুসলিম সেপাহীরা পালানোর পথ পেয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা আত্মরক্ষার স্থলে এ মুহূর্তে গেরিলা হামলার চিন্তা করল। কেননা ওই চার বিদ্রোহী সওয়ারদের তারা দেখতে পাচ্ছে। সেপাহীরা চাচ্ছে বিদ্রোহী ছড়িয়ে পড়ুক-তাহলে যুতসই হামলা চালানো সম্ভব।
বাস্তবেও তাই হলো, ওরা আলাদা আলাদা চলতে লাগল। মুসলিম সিপাহীরা যেখানটায় আত্মগোপন করেছিল সেখানটা পাহাড়ের প্রান্ত। তাদের নীচে নামার কথা। বিদ্রোহীরা কেটে পড়ার পর উভয়ে বিদ্রোহীদের অবস্থান নেয়া ওপরের প্রান্তর।
এখান থেকে তারা একটি আলোকোজ্জ্বল গুহা দেখতে পায়। বিদ্রোহীরা ওই গুহার সামনে এসে দাঁড়াল। এ সময় গুহার মুখে এক নজরকাড়া সুন্দরীকে দেখা গেল।
এ সেই মেয়ে বোধ হয়! জঙ্গলে ওই মেয়ে ছাড়া আর কার থাকার কথা? বলল মুসলিম সেপাইয়ের একজন।
***
টলেডোর গভর্নর হাউজ।
বিক্ষিপ্ত পায়চারী করছেন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। গোয় হাতের মুঠোয় মুঠো পুরে তিনি বলছেন,
কর্ডোভা থেকে এখনো কমান্ডো আসছে না কেন? দূত এখনো ফিরে আসেনি, বিলাসী আবদুর রহমান বোধ হয় যিরাবের সংগীতে ডুবে আছে, বগলদাবা করে আছে সুলতানকে।
কর্ডোভা থেকে ফৌজ আসার আগে বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে আলাপ করলে কেমন হয়। তাদের থেকে জানুন না তাদের দাবী কি? বলল জনৈক ফৌজি কমান্ডার।
ওরা টলেডো লেখে দিতে বললে এই প্রস্তাবনা তুমি মেনে নেবে কি? মনে করছ পরাজিত হবার পর দুশমনের কাছে আমি করুণা ভিক্ষা চাইব? কোরআন বর্ণিত বিধানের বাইরে যাব? জানো কোরআনে পাকের বিধান কি? কোরআনের ভাষণ হচ্ছে, সন্ত্রাসের শেষ ছিটেফোঁটা থাকা পর্যন্ত জেহাদ চালিয়ে যাও। কুফরের ফেত্নাকে আমার আঙ্গিনায় প্রবেশানুমতি দিতে পারি না।
আমার উদ্দেশ্য সেটা নয়। বিদ্রোহীদের সাথে আমি কোন প্রকার সমঝোতার কথা বলছি না। চাচ্ছি আলোচনা চালিয়ে কালক্ষেপণ করতে। কমান্ডো আসতেই আমাদের এমন কোনো প্ল্যান নিতে হবে যাতে ওদের পিলা বিদীর্ণ হয়ে যায়।
সন্ধি-সমঝোতাকে যদিও আমরা একটি চাল হিসেবে নেই তথাপিও আমাদের আবদুর রহমান একে একটা মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করবেন। বিলাসিতার সাথে দেশ চালানোর সহজ পন্থা হচ্ছে দুশমনকে দোস্ত করে জাতিকে ধাঁধার মধ্যে রাখা এবং আত্মপ্রবঞ্চিত হওয়া। এমন একটা সময় আসবে যখন আমাদের জাতি দুশমনের হুমকিতে ভীত হয়ে জাতির বাদশাহদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনীগুলোকে মিথ্যে ঠাওরাবে। এ সময় শাহী প্রহরী এসে বলল, জনৈক কমান্ডার আপনার সাক্ষাপ্রার্থী।
এতে অনুমতির কি দরকার? কাউকে আসতে বাধা দিও না। সবার জন্য আমার দরজা উন্মুক্ত। আমি বাদশাহ কিংবা স্পেনের আমীর নই।
কমান্ডার ভেতরে এলেন। তাজা খুনে তার জামা লালে লাল।
তুমি কি যখমী? প্রশ্ন ইবনে ওয়াসিমের।
আমি আমার যখম দেখতে আসিনি। একশ সৈন্য নিয়ে আমি চৌকি প্রহরায় যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে বিদ্রোহী গেরিলা বাহিনী আমাদের ওপর চড়াও হয়। সংখ্যায় ওরা দুশ এর কম হবে না। আমার বাহিনী যতটা ক্ষিপ্র, চৌকস ও সুদক্ষ ততটা ওরাও। আমি আমার অধীনদের বীরত্বের উপাখ্যানও শোনাতে আসিনি। বলতে এসেছি, আমার একশ-এর ৬১ জনই শাহাদতের শিরীন শরাব পান করেছে। তবে তারাও দুশমনের একশ জনকে জাহান্নামের পথ দেখিয়েছে।
ওই চৌকি বাঁচানো সম্ভব হয়েছে কি?
না। চৌকি প্রহরী সামান্য ছিল। বিদ্রোহীরা ওটি দখল করে নিয়ে গেছে। আমি বলতে এসেছি বিদ্রোহীদের সংখ্যা এত বেশী যে, তাদের মোকাবেলা করার মত সেপাই আমাদের নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে এই যে, দূরের ঘন ঝোঁপ-ঝাড়ে কিছু একটা আছে। বিদ্রোহীদের মদদ ও নির্দেশনা ওখান থেকেই আসছে বোধ হয়। হাশেম কর্মকার ও ফ্লোরা ওদের কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় নেতাগোছের-এমর্মেও তথ্য আমার কাছে। আমার ধারণা ওরা গভীর ওই অরণ্যের কোথাও ঘাঁটি গেড়ে আছে। কাজেই এ মুহূর্তে আমার পরামর্শ জানবার্য একটা টিম গঠন করে ওদের কলিজায় আঘাত করার ব্যবস্থা করা হোক।
আমি দুর্গম ওই পাহাড়ী অবস্থান সম্পর্কে সর্বশেষ অবহিত। ওখানে কাউকে খুঁজে বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। প্রথমত দুএকজন অনুসন্ধানী লোক পাঠানো লাগবে। তারা যুতসই রিপোর্ট দিলেই কেবল জানবার্য টিম পাঠানো যেতে পারে। ইবনে ওয়াসিম বললেন।
