আরব দেশে কোন মা এমন সন্তান জন্ম দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। তুমি কি আদর-লেহাজ ভুলে গেছো?
এ সময় আপনি আদর-লেহাজের যোগ্য নন। আদব-লেহাজ পাওয়ার যোগ্য তখন আপনি যখন দুশমনের সামনে পিঠটান করে দাঁড়ান। রণাঙ্গনের আদব। আলীজাহ! এতে তোমার কোনো আফসোস নাই যে, আমি বাবার সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণচিত্তে কথা বলছি। কিন্তু ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনায় ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করলেই কেবল আমার অনুশোচনা। আপনার মৃত্যুর পর জাতি বলবে, এ সেই লোকের সন্তান যিনি স্পেনের জাতিসত্তার শেকড় দুর্বল করে দিয়েছিলেন।
কি বলতে চাও তুমি?
জোয়ান বেটা বেরিয়ে গেল। নিয়ে এলো ছেঁড়াকাটা জামাধারী এক লোককে। তার মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে টানা সফরের ক্লান্তিতে সে নেতিয়ে গেছে। উমাইয়া যিরাব ও সুলতানাকে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন।
বাবা! এ দূত টলেডোর। বড্ড পেরেশান অবস্থায় আমার কাছে এসেছেন। তিনি আপনার সাথে জরুরী আলাপ করতে চান। এত দ্রুত ছিল তার সফর যে, রাতেও সামান্য বিশ্রাম নেয়ার ফুরসৎ মেলেনি। পথিমধ্যে তার একটা ঘোড়া টানা সফরের ধকল সইতে না পেরে মারা গেছে। জনৈক মুসাফির থেকে ঘোড়া হাওলাত করে কোনক্রমে আপনার বালাখানায় পৌঁছেছেন।
টলেডোয় খ্রীস্টানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। দূত বললেন, প্রথমদিকে তারা আমাদের সেনাক্যাম্পের ওপর গেরিলা হামলা চালায়। ফৌজি রসদ বহরের ওপরও তারা বারকয়েক হামলা চালিয়েছে। ওদের সন্ধানে বাহিনী পাঠিয়ে কোন ফল হয়নি। কবরস্থানে ভেল্কিবাজি করে নগরবাসীকে বিদ্রোহে নামানো হয়েছে। বিদ্রোহীদের অস্ত্র চালনা দ্বারা বোঝা যাচ্ছে, তাদের কমান্ডার টেনিং-প্রাপ্ত বিদেশী কেউ। তবে মাদ্রিদের মত গণ বিদ্রোহ হয়নি।
যতদূর জানা গেছে, হাশেম কর্মকার এই বিদ্রোহের শিরোমণি, কিন্তু কোন খোঁজ নেই। জানা গেছে, ফ্লোরা নাম্নী এক মেয়ে যাকে সকলে দ্বিতীয় মরিয়ম সাব্যস্ত করেছে এই বিদ্রোহে সে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। শহরবাসী রীতিমত সৈনিক সেজেছে। সুযোগ পেলেই তারা হামলা করে বসে।
বিদ্রোহীরা সরকারী কোষাগার লুণ্ঠনের চেষ্টা করছে কি? প্রশ্ন আঃ রহমানের।
আমীরে স্পেন, দূত বললেন।
ওরা কি সৈনিকদের মত সুশৃঙ্খল?
না। ওদের ভাবখানা ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের মত। আবদুর রহমান দূতকে আরো কিছু প্রশ্ন করার পর বিদায় করলেন। শাহী প্রহরীকে ডেকে সেনাপতি ও মন্ত্রীকে দেখা করতে বললেন।
***
টলেডোর দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল।
ঘন ঝোঁপ ঝাড়ে স্থানটি ভরা।
এ এলাকা জনশূন্য। পাহাড়ের গায়ে বিশাল বিশাল গর্ত। এসব গর্তে একটা আলো জ্বলছে। এ গুহাই হাশেম কর্মকারের ঘাঁটি। একলোক ওখানে প্রবেশ করল। তাকে দেখে চতুর্দিকের লোক একত্রিত হল। তন্মধ্যে আছে সুন্দরী এক তরুণী। ফ্লোরা যার নাম।
বিদ্রোহীদের মনোবল তুঙ্গে তো? ফ্লোরা জিজ্ঞেস করল, কি সংবাদ এনেছ?
সংবাদ আমাকে শুনতে দাও! তুমি এখনও অপরপি। বিদ্রোহ ও যুদ্ধে আবেগ কাজে আসে না বলে এক লোক আগন্তুককে বললো, হ্যাঁ। বলল খবর কি?
সব কাজই ঠিকঠাকমত চলছে। আগন্তুক বললো, আপনার নির্দেশনা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। তাজা খবর হচ্ছে, জনৈক মুসলিম দূতের কর্ডোভা যাত্রা। ওখান থেকে ফৌজ আসবে। টলেডোর সরকারী বাহিনীকে আমরা অতি দ্রুত শেষ করতে পারব। কিন্তু কর্ডোভা বাহিনী এসে পড়লে পরিস্থিতির মোকাবিলা মুশকিল হয়ে পঁড়াবে।
আমাদেরকে সেনা শৃঙ্খল হতে হবে। সকলকে বাড়ী বাড়ী অস্ত্র রাখতে বলেছি। নির্দেশ পেয়েই যেন সকলে সশস্ত্র নেমে পড়ে। হাশেম বলল।
হাশেম তার আশে পাশের লোকদের বলল, আমাদের কিছু লোক টলেডোর বাইরে থাকবে, তারা যেন কর্ডোভা বাহিনীকে পথিমধ্যেই আটকে দিতে পারে।
কিছুদিনের মধ্যে টলেডোর বাইরে এক বাহিনী গড়ে তোলা হলো। টলেডোর গভর্নর ছিলেন মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। তার বাহিনী ছিল খুবই নগণ্য। শহরের শান্তি, নিরাপত্তা ছিল এদের হাতে ন্যস্ত। এই বাহিনী গেরিলা বিদ্রোহীদের সন্ধানে থাকত। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমের হেড কোয়ার্টার টলেডোর বাইরে একটি সুন্দর শ্যামলিমাময় স্থানে। তার কাছে খবর আসে, টলেডোর দুতিন মাইল দূরে শক্ত বাহিনী গড়ে তোলা হচ্ছে। খুব সম্ভব এরা টলেডোর ওপর হামলা চালাবে। এমনটা হলে এ শহর খীস্ট রাজ্যে রূপান্তরিত হবে।
মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম দ্রত একদল বাহিনীকে প্রস্তুতি নিতে বললেন। বাহিনী প্রস্তুত হলো। এদের নেতৃত্বভার নিজেই নিলেন।
ইবনে ওয়াসিমের আত্মতৃপ্তি ছিল এই ভেবে যে, তিনি অপেশাদার লোকদের বিরুদ্ধে সৈন্য মার্চ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হলে দেখলেন ওরা সংখ্যায় বেশী। তিনি হুকুম দিলেন ওদের একটাও যেন জীবন্ত ছাড়া না পায়। বিদ্রোহীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে লড়াই করে পিছু হটে যায়। আচমকা মুসলমানদেরকে তিনদিকে থেকে একদল সুদক্ষ ফৌজ হামলা করে বসে। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম অবস্থা বেগতিক দেখে সেনাদের পিছু হটতে বললেন।
তিনি বাহিনীকে ফেরৎ এনে দেখলেন অর্ধেক ফৌজ তার খোয়া গেছে। তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন বিদ্রোহীরা ছোট ছোট দলে আক্রমণ করবে কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে তার ভুল ভেঙ্গে দেয়।
***
পলায়নকালে দুমুসলিম সেপাইকে চার বিদ্রোহী পশ্চাদ্ধাবন করছিল। এলাকাটি ঘন পাহাড়ী ঝোপে ঠাসা। তারা ওই ঝোপে আশ্রয় নিল। বিদ্রোহীরা ঘোড়পৃষ্ঠে এদের ওপর এলোপাতাড়ি তীর মেরে যাচ্ছিল, কিন্তু সমস্ত তীর নিশানচ্যুত হলো। মুসলিম সেপাই পাহাড়ের ঝোপে আশ্রয় নিল বটে, কিন্তু তাদের ধারণা এখান থেকে বেরোনো খুব। একটা সহজ নয়। তারাও ঘোড়া ছেড়ে পারলে ছুটতে লাগল। জঙ্গল খুবই ঘন। বিদ্রোহীদের অনুসন্ধানী আওয়াজ তাদের কানে ভেসে আসছে। তারা বেশ ওপরে উঠে গেছে যেখান থেকে অবলীলায় নীচে দেখা যায়।
