কর্ডোভা ছেড়ে এক সময় সে টলেডো আসে। টলেডোর খ্রীস্টানদের জড়ো করে। এক মহান আন্দোলনের নেতা বনে বসে।
টলেডোয় ইতিপূর্বেও বিদ্রোহ হয়েছিল। এতে বিদ্রোহীদের প্রচুর জানমালও ক্ষয় হয়েছিল। টলেডোয় আচমকা একদিন আওয়াজ ওঠে যে, কবরস্থানে জনৈক দরবেশের আবির্ভাব ঘটেছে। যিনি হামেশা বলে চলেছেন, ঈসা মসীহের অনুসারী হে জাগো। তোমাদের হাতে ক্ষমতার আসছে। লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, এ হয়ত কোনো পাদ্রীর অশরীরী আত্মা। মানুষকে অমীয় বাণী শোনাচ্ছে। ওদিকে গীর্জার পাত্রীদের কাছে এ খবর শোনানো হলে তারা বলল, ওই আওয়াজদাতা অশরীরী আত্মাকে কবরস্থান থেকে তাড়ানো উচিত হবে না। এ ধরনের পুণ্যাত্মা মানুষকে সৎপথ দেখায়।
কদিনের ব্যবধানে জানা গেল কবরস্থান থেকে দিয়াশলাই-এর রশি উঠছে, সেই রশ্মি থেকে ভেসে আসছে, তোমাদের ঘুম হারাম করে দাও। জাগে, অপরকে জাগাও। সেই কেয়ামতকে রুখখা, যা তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
খ্রীস্টানরা অশরীরী আত্মা ও প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করত। ওযুগে এ বিশ্বাস সবার মনে বদ্ধমূল হত। তারা ধারণা করত প্রেতাত্মা মানুষের ক্ষতি করতে পারে আর পুণ্যাত্মা করতে পারে উপকার। কাজেই দলে দলে সকলে কবরস্থানের উদ্দেশ্যে যেতে থাকে। কবরস্থান খুবই প্রশস্ত। সেখানে রকমারী বৃক্ষ ঠাসা। লোকেরা এর বাইরে দাঁড়িয়ে রূহের আওয়াজ ও দিয়াশলাইয়ের রোশনাই দেখত।
এক রাতে উৎসুক মানুষের ঠাসা ভীড়। জলদগম্ভীর স্বরে ঘোষণা এলো, অশরীরী পুণ্যাত্মা আজ নয়া কোনো পয়গাম নিয়ে হাজির হবে। মানুষের ভীড় আরো তীব্র হলো। মোহাম্মদ ওয়াসিমের বাহিনী চৌকি পাহারায় ছিল। কাজেই তারা ব্যাপারটি আগাগোড়া কিছুই জানতে পারল না।
জমকালো আঁধারে ঢাকা কবরগাহের পরিবেশ। ভীত-স্ত্রস্ত মানবতা চূড়ান্ত মুহূর্তের অপেক্ষায়। সকলের মনে হাতুড়ি পেটা শুরু। আচমকা দেয়ালের ও পাশ থেকে পৌরুষবহুল কণ্ঠ চিড়ে বেরিয়ে এলো একরাশ কথা। ধর্মোদ্দীপনা জাগরুক করে তোল। কল্পনায় কুমারী মরিয়মক আনো এদিকে।
লোকেরা ধর্মসংগীত গাওয়া শুরু করল। সংগীতটি নেহাৎ হৃদয়স্পর্শী। কবরগাহের রশ্মি উপরে উঠতে লাগল। আগুনের আশে পাশে সাদা ধোয়ার আনাগোনা। যেন মেঘ খণ্ড কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠা নামা করছে। এতে দেখা যাচ্ছে এক নারী প্রতিকৃতি। আগুনের রশ্মি আরো উঁচুতে উঠতে লাগল। ওতে দেখা গেল নারীর একরাশ চুল কাঁধে ছড়ানো।
সমবেত স্থানে পিন পতন নিস্তব্ধতা। ভক্তিভরে কেউ কেউ হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে বসে গেল। বলতে লাগল, গোনাহের কাফফারা আদায় করো। ওঠো খোদার পুত্রের রাজত্ব কায়েম কর। যদি না করো তাহলে আমি ব-বিজলী হয়ে তোমাদের ওপর আপতিত হবো।
এই কুমারী আত্মা ফ্লোরার।
আগুন এক সময় কমে এলো। কবরগাহে নেমে এলো পূর্বেকার জমকালো পরিবেশ। পরদিন সেটা টলেডোয় বিদ্রোহের ঘনঘটা শুরু হলে।
২.৪ বিষকামড়
সেপ্টেম্বর, ৮২৯ খ্রীস্টাব্দের কোনো এক রাত।
আমীর আবদুর রহমান হেরেমে শায়িত। সঙ্গীতের সুর মূর্ঘনায় তিনি বিমোহিত। এটা যিরাবের কারিশমা। জীবন বীণার সূক্ষ্মতারে তিনি ঝংকার তুলছেন। তিনি স্থান কাল পাত্র বুঝে সংগীতের বোতাম টিপতে পারতেন। আবদুর রহমানের আবেগ ও স্পর্শকাতর দিকটা তার জানা ছিল।
সুলতানা তার পাশে বসা। যেন সে আঃ রহমানকে কোলে করে নেয়া। আমীর চুলু ঢুলু চোখে আবদুর রহমানের দিকে তাকান। সুলতানার মুখে খেলে যায় উচ্ছ্বসিত হাসি। সুলতানার রূপলাবণ্য কমার পরিবর্তে দিন দিন যেন বেড়েই চলছিল।
এ সময় সবাইকে হতবাক করে দিয়ে দরজার কপাট খুলে যায়। বিরক্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায় সুলতানা। সে দেখল, দরজায় দারোয়ান দণ্ডায়মান। উঠে দরজার কাছে গেল সুলতানা। আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন-দরজায় কে?
দারোয়ানা সুলতানা বলল- টলেডো থেকে এসেছে। জরুরী কোন পয়গাম নিয়ে এসেছে।
সঙ্গীতের রাগ থেমে গেছে। কামরায় রাজ্যের নিস্তব্ধতা। আমীর আবদুর রহমান অঙ্গ মোচড়ান।
আমীরে স্পেন! যিরাব বলল, দূত সকালেও আসতে পারে। পয়গাম অতি জরুরী হলে এক দুদণ্ড পরেও আসা যেতে পারে। আমীরে স্পেন কারো বন্দী নয়তো।
সকালে আসতে বলল। চোখ ঢুলুঢুল অবস্থায় আবদুর রহমান বললেন।
দূতকে বলো সকালে দেখা করতে যিরাব বলল।
দারোয়ান চড়ে গেল। যিরাব ও সুলতানা মুখ চাওয়া-চাউয়ি করল। উভয়ের ওপ্রান্তে ভেসে উঠল অর্থপূর্ণ হাসি। হেরেমে আবার গুঞ্জরিত হলো পিয়ানোর সুর।
খানিকবাদে আবারো দরজা খুলে গেল। উঠে গেল সেই সাথে পর্দাও। আমীরে স্পন, যিরাব ও সুলতানা সকলে চমকে উঠলেন। এবারে সুলতানা ও যিরাবের চেহারার প্রতিক্রিয়া অন্যরকম। কেননা এবারে পূর্বানুমতি ছাড়া যিনি দরজা ঠেলে পর্দা উঁচিয়ে ভেতরে আসছেন তিনি আবদুর রহমানের ২০ বছর বয়স্ক পুত্ৰ উমাইয়া। উপ-সেনাপতি। ফৌজে তার পদমর্যাদা। একরাশ ঘৃণাসুলভ কণ্ঠে সে বললো,
আপনাকে পিতা নাকি আমীরে স্পেন বলব?
কি হলো তোমার উমাইয়া! তোমাকে এতটা অগ্নিমূর্তি দেখাচ্ছে কেন? আবদুর রহমান উঠে বসে বললেন।
টলেডোর বিদ্রোহীদের কি এ খবর দেব যে, তারা যেন কাল সকালে অভ্যুত্থান করে। কেননা, আমীরে স্পেন এক্ষণে সংগীত মোহে আচ্ছন্ন? টলেডোর দূতকে কে বলেছে সকালে দেখা করতে?
