আমরা পরস্পরে কথা বলেছি। সেনাপতি বললেন, কেউই জন্মোৎসবের পক্ষে নয়।
জন্মোৎসবের সময়ও তো হাতে নেই। মন্ত্রী বললেন, শহরে অনিরাপত্তা ও থমথমে ভাব বিরাজমান। প্রতিদিনই খ্রীস্টানদের লাশ ঝুলছে দুএকটা।
আপনারা নিজেরা যখন কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন তখন আর দেরী কেন? তাড়াতাড়ি তার কাছে যান। বললেন মোদাচ্ছেরা।
উবায়দুল্লাহ ও হাজে আবদুল করিম যখন দরবারে প্রবেশ করেন তখনও আবদুর রহমানের পার্শ্বে যিরাব বসা। সে তাকে বুঝাচ্ছে, শহরে কোন প্রকার অনিরাপত্তা নেই। সর্বত্রই শাস্তির ফোয়ারা বয়ে চলেছে। সমগ্র প্রদেশের অবস্থাও এমন।
সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বললেন, আমীরে মুহতারাম! আমরা অনুষ্ঠিতব্য জানন্মাৎসব সম্পর্কে দুচারটি কথা বলতে এসেছি।
সেনানিবাসে কি জন্মোৎসব পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে? প্রশ্ন যিরাবের।
ফৌজ অভিযানে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহরের ফঁসে ওঠা বিদ্রোহাগ্নি ফৌজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। বিপ্লবের আগুন এখানেও ধরতে পারে বলে ধারণা। মন্ত্রী বললেন।
আমীরে মুহতারাম। আমরা জানতে চাই ফৌজ জন্মোৎসবের প্রস্তুতি নেবে নাকি নেবে টলেডো যাত্রার প্রস্তুতি? আজ না হোক কাল ওখান থেকে খবর আসবে– কমান্ডো পাঠাও।
কিন্তু উৎসবে সময় নষ্ট হবে কতটুকু? কিছুদিনের প্রস্তুতি, উৎসবে একরাত-এই তো নাকি? যিরাব বলল।
পতাকা ভূলুষ্ঠিত হতেও তো সময় লাগে না খুব একটা যিরাব। সেনাপতি বললেন।
আর ওই দেশের পতাকা ভূলুষ্ঠিত হতে তো এক মুহূর্তও লাগার কথা নয় যে দেশের রাজার উপদেষ্টা এক সঙ্গীতজ্ঞ। কেন তুমি জানো না দেশের মহানগরীগুলোয় কি হচ্ছে?– প্রশ্ন মন্ত্রীর।
আমীর আবদুর রহমানের চেহারায় অস্বস্তির রেখা ফুটে উঠল। তিনি ধড়ফড়িয়ে উঠলেন। বললেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আমাকে জানাও। তিনি রাগতঃকণ্ঠে বললেন, যিরাব তো আমাকে এইমাত্র বলল, দেশে শান্তি বিরাজ করছে।
শহরে এক খ্রীস্টানের লাশ ঝুলছে। ইসলাম বিদ্বেষীর কর্মকাণ্ড তার নিজস্ব নয়- কোন না কোন ষড়যন্ত্রের ফসল এটা যা প্রতিহত করা না গেলে বিপ্লব, অভ্যুত্থান অনিবার্য।
বিদ্রোহ ফওরান আমরা প্রতিহত করব যিরা বলল।
নাচ-গান ও জন্মোৎসব পালনের দ্বারা বিদ্রোহ দমন করা যায় না যিরাব। সেনাপতি বললেন, আর তোমাদের মোটা ব্রেন একথা বুঝতে অপারগ যে, বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে?
আমীরে মুহতারাম। আমরা কথা বলছি আপনার সাথে। স্পেন ষড়যন্ত্রভূমিতে রূপ নিয়েছে।
আর সেই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য, আমাদের সুস্থ থাকতে না দেয়া-এইতো। ফ্রান্সের আক্রমণ মুলতবি রেখে ষড়যন্ত্র শেকড় উপড়ে ফেলা ষড়যন্ত্রের কারণ এটাই বুঝি। মনে রেখ ফ্রান্স আক্রমণ ভূলিনি আমি। ওই দেশে হামলা চালানো আমার জন্য ফরয। এ ফরয আমাকে আদায় করতে হবে………..কিন্তু আমীরে স্পেন খানিক থেমে বললেন, জন্মোৎসব পালন করলে এমন কি আসে যায়।
তেমন কিছু না। খানার কিছু উজাড় হবে মাত্র। জনগণ কদিন জন্মোৎসবে মেতে উঠবে। আমরা বলতে চাই, হেরেমে মানুষ পয়দা হতে থাকবে। উৎসব ও এনামের এই পরম্পরা আমাদের বন্ধ করতেই হবে। এক্ষণে খানার অর্থ যতটা দরকার ততটা দরকার হয়নি ইতিপূর্বে–বললেন মন্ত্রী,
এ উৎসব আমাদের মর্যাদার পরিপন্থী। আগামী বংশধরের জন্য এমন কিছু রেখে যাওয়া দরকার যা স্মরণ করে তারা গর্ববোধ করবে। আমীরে মুহতারাম! এই সন্তান এমন এক নারীর গর্ভজাত যিনি আপনার বিবাহিতা স্ত্রী নন। যেহেতু আমাদের হেরেমে অবিবাহিতাকে রাখার প্রচলন জায়েজ করে নেয়া হয়েছে সেহেতু একে নিখাদ ইসলামী দৃষ্টিকোণে বিচার করলে বলুন তো বিধর্মীরা কি বলবে? বলবে, এক জারজ সন্তানের জন্মোৎসব পালন চলছে স্পেন প্রাসাদে। কি বলবে আমাদের পরবর্তী বংশধর?
আমীরে মুহতারাম! দেশের সঠিক রিপোর্ট আপনাকে দিতে পারি কেবল আমরাই। যাকে তাকে আপনার উপদেষ্টা করলে আমাদেরকে আমাদের কাজ করার স্বাধীনতা দিন। আমরা আমাদের কাজ করে যাব। আমরা ঈমানী দায়িত্ব থেকে এতটুকু বিচ্যুত হব না। আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ভিন্ন।
কাঁচা ঘুম ভাঙ্গার মত চমকে উঠলেন সিংহশাবক আবদুর রহমান। দ্বৈত সত্তার অধিকারী এই আবদুর রহমান। তার সত্তার একটা অংশ বিলাসিতার আরেকটা মৃজাহিদীর, বীরত্বের।
সেনাপতি ও মন্ত্রীগণ জানতেন আবদুর রহমানের দ্বৈত সত্তার দিকটি। তাই তারা সুকৌশলে অপূর্ব উপস্থাপনায় তার ভেতরের সিংহকে উজ্জীবিত করেন। তারা বিগত দিনে ভেবেছেন যিরাব ও সুলতানা আপদ দূর করতে, কিন্তু এতে ফল হবে উল্টো। এদের বিরহে আবদুর রহমান মদ নিয়েই কাটাবেন। হয়ে পারবেন নিয়মিত মদসেবী। ফলে নিজেও ডুববেন, জাতিকেও ডুবাবেন।
আমীর আবদুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন। টহল দিতে লাগলেন এই বলে, টলেডোর খবর কি। যিরাব! তুমি যেতে পার। জন্মোত্সব হবে না।
টলেডোর পরিস্থিতি ভালো না। এটি মাত্রীদের একটি শহর। আবদুর রহমানের বাবা আল-হাকামের যুগে এখানে একবার বিদ্রোহ হয়েছিল। প্রচুর খ্রীস্টানের হত্যা হয় তখন। হাশেম কর্মকার ছিল টলেডোবাসী। প্রথমে খ্রীস্টান থাকলেও পরে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। শহরে বিদ্রোহীদের হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে হাশেমের বাড়ীও রক্ষা পায়নি। তার বিবি-বাচ্চা ঘরদোর ছেড়ে পালিয়েছিল কিন্তু পথিমধ্যে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়। পরিবার ছাড়া হাশেম কর্ডোভা এসে কর্মকারের কাজ নেয়। এবং তলে তলে মোয়াল্লেদীন আন্দোলন শুরু করে। ফ্লোরাকে সে-ই আশ্রয় দিয়েছিল। পরে করেছিল জনৈক পাদ্রীর কাছে হাওয়ালা। তার যবানে ছিল যাদু। একবার যে তার কথা শুনত সে পাগল হয়ে যেত।
