এলোগেইছ ফ্লোরাকে বুকে চেপে ধরে। যে অনুভূতিকে এতদিন সে কল্পনায় হাতড়েছে ধ্যানঘোরে অনুসন্ধান করেছে সে অনুভূতির জীবন্ত সত্তা তো এই মানবীয় এক দিলাশ গোশতপিণ্ড।
ফ্লোরাকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে সে বলে, দাঁড়াও। আগুন জ্বালাতে দাও। তোমাকে স্বপ্নীল জীবনের বর্ণিল আলোতে আবিষ্কার করতে দাও।
কামরায় আলো জ্বলে উঠল।
ঐতিহাসিক পি, স্কট বলেছেন, এলোগেইছ ও স্পর্শকাতর ফ্লোরা প্রথম সাক্ষাৎ থেকে একই ছাদের নীচে ঘুমিয়ে আসছিল এবং ফ্লোরা নিজকে এলোগেইছের কাছে সঁপে দিয়েছিল। বিশেষ এক আত্মত্যাগের উদ্দেশে সে এলোগেইছের রুমে গিয়েছিল কিন্তু তার হৃদয়ে এমন এক অনুরাগের সৃষ্টি হয়, ওই যুগে যার নজীর মেলা মুশকিল। ওরা বিয়ে তো করেনি, কিন্তু একে অপরকে ছাড়া চলতে পারেনি কোন দিনও।
ফ্লোরা তার জীবন, যৌবন, সতীত্ব ও খ্রীস্টত্বের সবটুকুই এলোগেইছের কাছে সঁপে দিল।
দুতিন দিন তারা ওই রুমে বাস করল। এ সময় কজন খ্রীস্ট পাদ্রী তাদের কাছে এসে এক নয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এলোগেইছ-ফ্লোরা কোনো এক সুযোগে ছদ্মবেশে কর্ডোভা ছেড়ে যায়।
***
এর পরবর্তী রোববার (খীস্টানদের জুমার দিন) থেকে সমস্ত গীর্জায় পাদ্রীদের মুখে একই কথার পুনরাবৃত্তি শোনা যেতে লাগল। তারা ভাষণে বলল, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়ানো হয়েছে, এক্ষণে এখানকার সমস্ত খ্রীস্টানদের শূলে চড়ানোর পায়তারা চলছে। ফ্লোরা নামী এক নজরকাড়া সুন্দরী তন্বীকে স্রেফ একারণেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে যে, সে খ্রীস্টান। প্রকাশ্য জনাকীর্ণ আদালতে সে ইসলাম ও মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে। কয়েদখানার স্থলে তাকে অজ্ঞাত স্থানে বন্দী করে রাখা হয়। যতদূর সম্ভব জানা গেছে, এ মুহূর্তে মেয়েটি লাপাত্তা। কেউ জানে না কোথায় সে।
এসব ভাষণে সুকৌশলে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে। গীর্জায় যারা প্রার্থনা করতে এসে থাকত তাদেরকে উস্কে দেয়া হত। পাদ্রী বলত, সমগ্র খ্রীস্টজনগণকে ফ্লোরার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। করতে হবে তথাকথিত সেই অপরাধ যে অপরাধে ফ্লোরাকে বন্দী করে সাজা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ ও ধর্মোদ্দীপনার পথ কেবল এই একটাই।
গীর্জা থেকে ফুলে ফেঁপে ওঠা এই ধূম্রজাল এক সময় গোটা শহরে ছেয়ে যায়। এমনো একটি উদ্ভট কাহিনী প্রচারিত হয় যে,
ফ্লোরার বন্দীখানায় প্রতি রাতে মুসলিম অফিসারের আনাগোনা ছিল। সবচে মারত্মক কথা যা প্রচার হলো তা হলো, খোদ স্পেন গভর্নর আবদুর রহমান পর্যপ্ত তাকে হেরেমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
এই অপপ্রচার মোয়াল্লেদীন আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিল। কর্ডোভার ঘরে ঘরে একথা পৌঁছে দেয়া হলো। পাদ্রীরা জনাকীর্ণ বাজারে বলতে লাগল, ইসলামে এমন কোন বিধান নেই যে, কোনো নারীকে বিশেষ কোন কক্ষে আটকে রেখে মুসলিম অফিসাররা তার সাথে রাত কাটাবে।
পাদ্রীরা খ্রীস্টবাদের শিক্ষা ও ইসলাম বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে লাগল। বলল, আমরা ঈসা (আ)-কে খোদা ও খোদার পুত্র মনে করি। হযরত ঈসা (আ) বলেছেন, আমার পরে যত নবী আসবে (নাউযুবিল্লাহ) তারা সকলে মিথ্যাবাদী। ওসব পাদ্রীরা হযরত রাসূলে আকরাম (স) সম্পর্কে কুশ্রী মন্তব্যও করে যাচ্ছিল।
সমবেত মুসলমানেরা এই শ্রেণীর ধুরন্ধর পাদ্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে বুদ্ধিজীবী শ্ৰেণীর শায়খরা ওদের এই বলে নিবৃত্ত করাতেন, দেখো আইনকে নিজের হাতে তুলে নিও না। ওকে কাজীর দরবারে নিয়ে চলো। একে কাজীর দরবারে হাজির করা হলো। কাজী সাহের তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলে সে বিলকুল ও কথা পাশ কেটে বলল, না! আমি এ ধরনের একটি শব্দও মুখে আনিনি, কিন্তু সাক্ষীর মাধ্যমে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। কাজী সাহেব তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। ঈদের নামাযের পর এই পাদ্রীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
এর কিছুদিন পর জান নামী জনৈক ব্যবসায়ী ও পূর্ববর্তী পাদ্রীর মত ওই অপকর্মে লিপ্ত হল। বাজারে রাসূল (স) ও কোরআনের নামে কসম খেতে লাগল। মুসলমানরা তাকে বাধা দিল। যেহেতু যে খ্রীস্টান। আর কোনো খ্রীস্টান ইসলামের নামে কসম খেতে পারে না। ইসলামের নামে সামান্য কিছু কুশ্রী ভাষা ব্যবহার করে মাফ চাইল। কাজীর দরবারেই ওঠানো হলে কাজী তাকে কমাসের জেল দিয়ে দিলেন।
***
সুলতানা বাচ্চা প্রসব করল।
মোবারক হে স্পেনশাহ! যিরাব আবদুর রহমানকে মোবারকবাদ দিতে গিয়ে বলল, বাচ্চাটি আপনার চেহারা পেয়েছে। মায়ের সৌন্দর্য নিয়ে দুনিয়ার মুখ দেখেছে। উ ৎসবের ব্যবস্থা করব কি? উৎসবটা প্রবাদ প্রতীম হওয়া চাই। সুলতানারও ইচ্ছে তার সন্তানের উৎসবটা চির জাগরুক করে রাখা দরকার।
তাতো দরকার। আবদুর রহমান বললেন, তবে আমি চিন্তা-ভাবনা করে তোমাদের বলব।
আমি তাহলে কাজ শুরু করে দেই।
মহলে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, সুলতানার সন্তান উপলক্ষে উৎসব হতে চলেছে। মহলের উৎসব জাকজমকপূর্ণ হবে। দুহাতে এনাম দেয়া হবে। শরাবের বন্যা বইয়ে দেয়া হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজারঘাট বন্ধ থাকবে দিনের পর দিন।
মোদাচ্ছেরা সালার ও মন্ত্রীকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমি যদি আমীরে স্পেনের সাথে কথা বলি, তাহলে তিনি একে প্রতিহিংসা মনে করবেন। সুলতানা পুত্র সন্তান প্রসব করেছে বলে আপনাদের কাছে খবর পৌঁছে থাকবে এজন্য জন্মোৎসব পালনের পায়তারা চলছে। আপনারা এ বিষয়ে তাকে নিবৃত্ত করার পদক্ষেপ নেবেন কি?
