সন্ধ্যার পর একে একে তিনজন লোক এলো। এলোগেইছ তাদের সাথে দীর্ঘ আলাপে ডুবে থাকল। এক নয়া পরিকল্পনার ক নিয়ে সকলে বেরিয়ে পড়ল।
***
বাড়ীটি প্রাসাদোপম। বাড়ীওয়ালা একটা কক্ষ এলোগেইছ, আরেকটা ফ্লোরার জন্য দিল। পরে সে শুয়ে গেল। ফ্লোরা ও এলোগেই কথা বলছিল। উভয়ে স্বধর্মের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। উভয়েই ইসলাম ও মুসলিম জাতিকে স্পেনছাড়া করতে একপায়ে খাড়া। এক সময় এরা একে অপরের ব্যক্তি জীবন নিয়ে আলাপ শুরু করে। ফ্লোরার এক প্রশ্নের জবাবে এলোগেইছ জানাল, মিশন সফল করতেই তার আজো বিয়ে করার ফুরসত মেলেনি। তবে যোগ্য পাত্রীর অভাবও এক্ষেত্রে কিছুটা অন্তরায় যে হয়নি তাও কিন্তু নয়।
আমি আর যাই হই না কেন মানুষ তো। কেউ তার প্রেম বিলাসকে আবেগের বশে কোরবানী করতে পারে না। এ দাবী এক সময় আমি করতাম। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এর উল্টো। তুমি কুমারী ফ্লোরা। আমার এ তাত্ত্বিক কথা তোমার বোধগম্য নাও হতে পারে। আমি জীবনোসর্গ করতে পারি। প্রেম-ভালবাসাও কেউ কেউ দুপায়ে দলতে পারে। সত্যি বলতে কি খ্রীস্টত্বের নামে আমি এতটাই উন্মাদ যে, দুনিয়ার কোনো কিছুই আমার সামনে ভাল লাগে না। সেই উম্মাদনাবশে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়ের সিঁড়িতে বসব না জীবনেও। তিনজন তরুণী আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। বিয়ে এক শেকল, যা আমার হাত-পা শৃঙ্খলাবদ্ধ করবে-সাফ জবাব দিয়েছি তাদের। বিয়ে আমার স্বপ্নীল– বর্ণিল রাজপথের কন্টক।
ফ্লোরা ভক্তি-শ্রদ্ধার সবটুকু অনুভূতি দিয়ে তার দিকে তাকায়। সে তাকানোতে করুণা, সে দৃষ্টি এলোগেইছের সন্ন্যাসব্রতের মাঝে লীন করার দৃষ্টি।
আমি মায়াকান্না জুড়ে দিতে চাইছি না ফ্লোরা। এলোগেইছ বলল, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে আমি এমন আত্মত্যাগ করছি; বলবে, কোনো মানুষ এমনটা করে না। এ ব্রত হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখার, এ সাধনা বিষের পেয়ালাকে অম্লত্বের মধু মনে করার, এ প্রতিজ্ঞা নিজের হাতে নিজের গলা টিপে দেয়ার। এ শিক্ষা আমি মুসলমানদের থেকে নিয়েছি। এ উপদেশ আমি ওদের থেকেই শিখেছি। পড়ে দেখেছি ওদের কোরআন। উল্টে দেখেছি তাফসীরেরও দুদশ পৃষ্ঠা। সেগুলো পড়ে আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু ঈশ্বর আমার থেকে অন্য কাজ নিতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমি ইসলাম গ্রহণের স্থলে ইসলামের সবচেয়ে বড় দুশমন সেজে বসলাম।
আরেকটা কথা তোমাকে বলে রাখি ফ্লোরা, যতক্ষণ মুসলমানরা তাদের স্বধর্মে অটল থাকবে ততক্ষণ এ ধর্মমত গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। ওরা যে দেশেই গেছে সে দেশবাসী ওদের কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমাদের পূর্বসূরিরা ওদের হেরেমে নারী সুষমার ঝিলিক দেখানো শুরু করলে ওরা এর সম্মোহনীতে ডুবে গেল। ওদের পতন কার্যত এখান থেকেই শুরু। কিন্তু কিছু জানবার্য আজো টিকে আছে, কিছু মুসলিম এলোগেইছ এখনো বিচরণ করছে-ইসলাম সে কারণেই টিকে আছে। যেমন স্পেনের কমাণ্ডার-ইন-চীফ আরবের, স্পেন গভর্নরের স্ত্রী আরবের-এতেই রক্ষা; নতুবা স্পেন গভর্নর যেভাবে মুসলিম জাতির ভাগ্য শরাবের মটকায় ঢুকাচ্ছিলেন, যেভাবে নারী বিলাসে গলা অবধি ডুবে ছিলেন তাতে ইসলামের এতোদিনে আটলান্টিকে জলমগ্ন হবার কথা। আমি ওদের থেকে শিখেছি, জীবন ও আবেগ যদি কোরবানী করা যায় তাহলে বিজয়ের সোনার হরিণ পদচুম্বন করবেই করবে।
আমার প্রেমাবেগ ও হৃদ্যিক উত্তাপ ছিল ফ্লোরা। সেই শৈশবের কোনো এক ক্ষণে আমার বাবা-মার তিরোধান। ভালবাসার নির্মল উষ্ণ পরশের থেকে উপেক্ষিত আমি। আশৈশব মাঝে মধ্যে আমার পৌরুষে যৌবনের জয়গান বেজে ওঠে। হয়ে পড়ি তখন তীর্থের কাক। খুব সম্ভব এটি আত্মিক পিয়াসা। ওই সময়টাতে মনে করি! হায় আমাকে যদি কেউ এমন জগতের সন্ধান দিত, যে জগতের বদ্ধদুয়ার খুলিনি আমি। নির্জন কক্ষে বালিশে মাথা খুঁজে মনের সাথে বোঝাপাড়া করি। আমার আবেগ, আমার প্রেম, আমার পরিকল্পনার সামনে মাথা হেঁট করে নুইয়ে পড়ে। ওই সময় কেবল একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খায়, কি করে উৎপাটিত করব গেড়ে বসা মুসলিম জাতির শেকড়। ওহ ফ্লোরা……….তোমার ঘুম আসছে। ওঠো কামরায় যাও। শুয়ে পড়গে।
ফ্লোরা খামোশ কামরা থেকে বেরিয়ে পড়ে।
***
গভীর রাত।
গোটা প্রকৃতি ঘুমের ঘোরে। আচমকা এলোগেইছের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ফ্লোরা ঘুমাতে পারেনি। তার হৃদয় ও ঠোঁটে এই গুঞ্জন, এ লোক বড্ড তৃষ্ণাতুন। কি বিশাল ত্যাগ করে যাচ্ছে। প্রেমের উষ্ণ পরশ থেকে বঞ্চিত। ফ্লোরা উঠে বসল। ঘরে-বাইরে জমকালো অন্ধকার। তার জীবনে গভীর রাতের আদিম, অনুভূতি এই প্রথম। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এলোগেইছের কক্ষ লক্ষ্য করে এগুতে থাকে সে। কামরাটি খুব একটা দূরে নয়। দরজায় হাত রাখতেই তা ফাঁক হয়ে যায়। আস্তে আস্তে সে এলোগেইছের খাটের কাছে এসে দাঁড়ায়। আরেকটু এগুতেই খাটে হোঁচট খায়। তার হাত গিয়ে পড়ে এলোগেইছের শরীরে। ধড়ফড়িয়ে ওঠে এলোগেইছ। ফ্লোরা শতদল সুকোমল দুহাত দ্বারা তার গালে পরম প্রশান্তি বুলায় এবং গণ্ডে গও ঘষে।
কে? অস্ফুট কন্ঠে বলে এলোগেইছ, ফ্লোরা?
হা! আমি ফ্লোরা।
এত রাতে এখানে কেন?
তোমার আত্মোৎসর্গের কিছুটা প্রতিদান দিতে। ফ্লোরার কঠে রাজ্যের কাকুতি, তোমাকে সাহারাম সম পিয়াসা নিয়ে মরতে দেব না এলোগেইছ। প্রেমের জন্য ছটফটিও না প্রিয়। আমি তোমার পায়ের জিঞ্জির হবো না। আপনার গোলাম বানাব না। সাময়িক তৃষ্ণা নিবারক মনে করে গ্রহণ করো।
