আমি এ জন্যই পয়দা হয়েছি। ফ্লোরা বলল, আমার আমি শুলে মরতে চাই।
তুমি কি আমাকে এই গ্যারান্টি দিতে পারবে যে, আত্মোৎসর্গ আমার আকীদা মাফিক হবে? আমার শিরার খুন আরব থেকে আসলেও তাদেরই দেহে এটা কিরূপে বিষ হিসেবে প্রয়োগ করতে পারি- তাও বলতে হবে তোমাকে।
ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, অজেয় মনোবল ও অশ্রুতপূর্ব আত্মত্যাগ থাকলে কিই না হতে পারে? ফ্লোরাকে আরো কাছে টেনে বলল এলোগেইছ, কাজীর দরবারে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগার তুলে তুমি আমাকে এক নয়া পথের সন্ধ্যান দিয়েছ। আমার আন্দোলন এক্ষণে তোমার আবেগের সাথে একাকার। এমন কর্মী তৈরী করব যারা জনাকীর্ণ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে মুসলিম জাতি ও তাদের রাসূলকে গাল দেবে। ওরা হয়ত ধরা পড়বে, শাস্তিও একটু আধটু পাবে না-তাও কিন্তু নয়। একদলের শাস্তি শুরু হলে আরেকদল পূর্বের ন্যায় গালাগালির মহড়া চালিয়ে যাবে।
কিন্তু এতে লাভ? বাড়ী ওয়ালা প্রশ্ন করে।
এরা ধরা পড়লে শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাবে না। এতে অন্যান্য কর্মীরা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে। ওদিকে আমরা গীর্জা থেকে আওয়াজ ওঠাবো, মুসলিম কারাগারে সংখ্যালঘু খ্রীস্টানদের এমন নৃশংস অত্যাচার চলছে যা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। গোটা বিশ্ব এতে চমকে উঠবে। স্পেনের আনাচে কানাচের খ্রীস্টজাতি বিদ্রোহে মাঠে নামবে। পড়ে যাবে গোটা দেশে হুলুস্থুল কাণ্ড কারখানা।
কিন্তু প্রশাসনের সাথে টক্কর দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ফ্লোরা বলল, মাদ্রিদে কি কিয়ামতে ছোগরা কায়েম হয়েছিল, তা তোমার অজানা নয়। খ্রীস্টানদের ঘর বাড়ী জ্বলেছে কি কম! আমরা সেনা ট্রেনিং দিয়ে তারপর কি মাঠে নামতে পারি না?
এ মুহূর্তে নয়। আমাদের অনেক জীবনহানি হয়েছে, তথাপিও বিদ্রোহাগ্নি নেভানোর এতটুকু ইচ্ছা নেই। আমাদের নিশূপ নির্বিকার বসে থাকতে দেখলে ওরা ফ্রান্সে হামলা করে লুই সাম্রাজ্যের ভিতে কাঁপন ধরাবে। পরে ইসলাম গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে। কোনো শক্তিবলেই ওই ঢেউকে রুখতে পারব না আমরা। স্পেনের ইতিহাস পড়ে দেখো, বেশ কিছুদিন আগে ফ্রান্সে হামলা হয়েছিল। এর কমান্ডার ছিলেন এই আবদুর রহমানই। তিনি ফ্রান্স বিজয় করেছিলেন। এবার আমরা তা হতে দেব না কিছুতেই।
আপনি কি ফ্রান্স থেকে সাহায্য পাচ্ছেন? প্রশ্ন ফ্লোরার।
বিদ্রোহ সেতো ফ্রান্সেরই মদদের ফসল। বর্তমান গভর্নর যিনি নিজকে স্পেন সম্রাট ঠাওরাচ্ছেন– অচিরেই ফ্রান্সে হামলা করতে যাচ্ছেন। মাদ্রিদে অত্যুত্থান ঘটিয়ে আমরা তাকে ও তার সালারদের ফ্রান্সের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে সফল হয়েছিলাম। তারা প্যারিস ছেড়ে মাদ্রিদের পথ ধরেছিল। এভাবেই ফ্রান্স বেঁচে যায়। ফ্রান্স আমাদের চেতনা বিকাশকেন্দ্র, শক্তির প্রাণকেন্দ্র এবং ধর্মের সুতিকাগার।
এক্ষণে পরিকল্পনা কি? বাড়ীওয়ালা প্রশ্ন করে।
এতদুদ্দেশেই আমার কর্ডোভা আগমন। কিছুলোকের সাথে সাক্ষাৎ অভিপ্রায়। এক্ষণে টলেডোয় বিদ্রোহের পাঁয়তারা চলছে। শুধু পাঁয়তারা নয় বরং সাজ সাজ রব। আমাদের গেরিলা বাহিনীর সম্মুখে টলেডো বাহিনী পড়তেই তাদের ওপর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করতে বলেছি। বলেছি, পরক্ষণে নিবিড় জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে। ওখানকার গভর্নর মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম। তিনি এই অগ্নিবাণকে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেননা তিনি এদেরকে ডাকাত ও ছিনতাইকারী মনে করছেন। তবে আমাদের দুর্বলতা যা তা হচ্ছে এই যে, টলেডোবাসী বিদ্রোহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এর কারণ মাদ্রিদবাসীকে মুসলিম ফৌজ ঘর থেকে টেনে এনে প্রকাশ্য ময়দানে হত্যা করেছিল। এখানকারই কিছু লোক পলায়ন করে টলেডোয় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা বড় ভয়ানক সংবাদ পবিবেশন করেছে। বলেছে, যে কোন পাপ করতে মনে চায় করো– তবে বিদ্রোহ নয়।
মানুষের এই দ্বিধা-ভীতি আমাদের বড় মুশকিলে ফেলে দিয়েছে। আমরা সংখ্যায় তেমন একটা আহামরি নই। এরা টহলদার সাঁজোয়া যান ও সেনাক্যাম্পে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করছে মাত্র। এক্ষণে দরকার মাদ্রিদের মত গোটা শহরবাসীর একসাথে গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠা। ট্যাক্স-কর দিতে অস্বীকার করা। মোহাম্মদ ইবনে ওয়াসিমকে গ্রেফতার করে কোনো খ্রীস্টানকে গভর্নর বানানো। সম্রাট লুই বলেছেন, শহুরেদের ছদ্মাবরণে তিনি বাহিনী পাঠাবেন, কিন্তু এর আগে তাকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, মাদ্রিদের মত বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। টলেডোবাসীর এই বিদ্রোহে ঢিমেতাল ভাবই এ মুহূর্তে আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। হায় হায়! আমি যদি শহরবাসীকে এই মহতী কাজে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারতাম। আহা! টলেডোবাসী যদি মাদ্রিদের ভূমিকা নিতে পারত।
হাশেম কর্মকার ওখানে চলে গেছে আগেভাগেই। লোকদেরকে সেও কি বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজী করতে পারবে না? বাড়ীওয়ালা বলল।
তার বড় কৃতিত্ব এখানেই যে, সে একদল তার মতাদর্শের বানিয়ে ফেলেছে। আমি তাকে নামবদল করতে দেইনি। বলেছি, মুসলমানরা যেন তাকে মুসলিমই মনে করে। আমি অবশ্য ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। ফ্লোরা আমাকে এক নয়া পথের সন্ধান দিয়েছে। আমি ওর থেকে ফায়দা লুটতে চাই। আর তা এভাবে যে, কর্ডোভার আঃ রহমান সুলতানার মাধ্যমে যে পরিস্থিতির শিকার সে পরিবেশ সৃষ্টি করব টলেডোর আমীরের বেলায়। এলোগেইছ বলে দম নিল।
