আমার মায়ের সংবাদ কি? ফ্লোরা প্রশ্ন করে।
তোমার ভাই বদর মা ও বোনকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। দিন তিনেক তারা আমার এখানে ছিল। তাদেরকে বহুদূরে পাঠিয়েছি। কর্ডোভা ছাড়লে কোথাও না কোথাও তাদের দেখা যাবে। আমাদের দিক নির্দেশেক এলোগেইছ চারদিনের মধ্যেই এসে যাবেন। তিনি এখানেই ওঠবেন। তার সাথে তোমার পরিচয় হওয়া দরকার।
এলোগেইছ! ওহহ……………এলোগেইছ! আমার মা তার অনেক কথাই বলেছেন। বলেছেন, এলোগেইছ তার জীবন-যৌবন ও চাওয়া-পাওয়া ইসলামকে মূলো ৎপাটন ও খ্রীস্টবাদ পুনরুদ্ধারে ওয়াকফ করেছেন।
এলোগেইছ নজরকাড়া সৌন্দর্যের অধিকারী যুবক। তিনি অদ্যাবধি বিয়ে করেননি তিনি ঈসামসীহের জন্য দেওয়ানা। আবদুর রহমানের মহলের সুলতানা ও সংগীতজ্ঞ যিরাব ও তার ক্রীড়নক।
সত্যিই দুজন কাজ করে যেতে পারলে আমাদের কাজ ত্বরান্বিত হবে।
না! আমরা ওদের ওপর আস্থাবান হতে পারি না। কেননা ওরা মুসলমান এছাড়া যিরাব সংগীতজ্ঞ আর সুলতানা সামান্য দাসী মাত্র। এরা দরবারী চাটুকার। আমরা ওদের সাথে সতর্ক হয়েই কথা বলে থাকি। তোমাকে আগেই বলেছি, সুলতানা ভুবন মোহনী ও অতুলনীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী। এলোগেইছ নিঃসঙ্গতায় তার সাথে কাটিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও সুলতানার চোখ ঝলসানো রূপ তাকে মাত করতে পারেনি।
ফ্লোরার রূপ যৌবনও নজড়কাড়া বেনজীর। এ সেই রূপ যা নীতিবান আলেমকে নীতিচ্যুত করেছে। শুধু কি তাই তাকে গোলামে পরিণত করেছে। ফ্লোরা কখনও ভেবে দেখেনি তার রূপ যৌবনের একজন সাথী দরকার। দরকার একজন মনের মানুষ। ফ্লোরা নিজকে কখনো নারীই মনে করেনি। ধর্মোদ্দীপনাই তার নারীত্বকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হত, অদৃশ্য কোনো শক্তিবলে সে বলীয়ান।
হায়! মুসলিম জাতির মাঝে যদি এই উদ্দীপনা থাকত তাহলে সাহারা পেরিয়ে আটলান্টিকের অথৈ পানিরাশিতে ইসলাম আছড়ে পড়ত, কিন্তু তলোয়ারের স্থলে যখন এ জাতির হাতে শরাবের পেগ উঠে এলো তখন থেকে শুরু হলো এদের পতন। রণাঙ্গনের স্থলে মহলের নারীসঙ্গ বিভোর হওয়ায় তাদের ধর্মোদ্দীপনায় অনেকখানি ভাটা পড়ল। এক সময় তারা ওই সমুদ্রেই ডুবে গেল যেখানে একদিন জানবার্য জাতি তাদের রণতরীগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।
***
পরদিন।
কর্ডোভার আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, বন্দিনী তরুণী ফেরারী হয়েছে। তার কক্ষে মৃত পড়ে আছে প্রহরী নারীর লাশ। কক্ষের পেছনে ঝুলে আছে রশি। অন্যান্য নারীদের পুলিশ গ্রেফতার করে। তারা জবানবন্দীতে জানায়, রশির যোগান দিয়েছেন দীক্ষাগুরু তথাকথিত গৃহশিক্ষক। ওই শিক্ষককেও গ্রেফতার করা হোল। তিনি অনুভব করলেন, মেয়েটা যেমনটা নজর কাড়া সুন্দরী এর চেয়েও অধিক ছলনাময়ী। সে তার সাথে প্রেমাভিনয় করে পালানোর পথ সুগম করেছে। কৃতকর্মের অনুতাপানলে অহর্নিশ জ্বলে মরেন তিনি। কখনও উন্মাদনা বশে চুল ছেড়েন; কখনও কাড়েন জামা। তাকে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি বদ্ধপাগল করে তোলে। সরকারী রিপোর্ট প্রকাশ করা হলো, ওই তরুণীকে দীক্ষাগুরুই পালাতে সহায়তা করেছে যদ্দরুন একজন অবলা নারীকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।
ফ্লোরা যে বাড়ীতে আশ্রয় নেয় সে বাড়ীটি তার অপরিচিত নয়। তখন পর্যন্ত কেউ জানতে পারে নিয়ে এই তরুণীই কর্ডোভায় রক্তসাগরের পয়গাম নিয়ে আসবে এবং মোয়াল্লেদীনের ইতিহাসে নূতন ইতিহাসের জন্ম দেবে। ওদিকে কেউ ধারণাও করতে পারল না যে, যে নয়া উন্মাদ শহরের অলি গলিতে অদ্ভুত কথার গুঞ্জন তুলছে। কখনও অট্টহাসি দিচ্ছে, কখনও আকাশের দিকে তাকাচ্ছে- এক সাধারণ তরুণীই তাকে এ পথে নামিয়েছে। এ পাগল দিনকে দিন বদ্ধ উম্মাদে রূপ নিচ্ছিল। আত্মীয়-স্বজন তার ওপর বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের করে দিল।
একদিন শহরে তার মতই আরেক পাগলের আবির্ভাব ঘটল। সে কখনও মাঝপথে থেমে পড়ত। বেশ কিছু লোকের সাথে কথা বলত, মানুষের জটলায় সে খাবি খেয়ে ফেলত। এক সময় সে একটি চোরাগলির মোড়ে এসে থেমে গেলো। পরিচিত দরজার ছিটকিনিতে তার হাত উঠে এলো।
বাড়ীর মালিক দৌড়ে এলো এবং পরক্ষণ আগন্তুকের বুকে মিশে লাফিয়ে পড়ল।
এলোগেইছ! বেশ ভাবনায় ফেলেছেন আমাকে। অন্তর্ধানের একটা সীমা থাকা তো দরকার।
খানিকপর।
এলোগেইছের ছদ্মবেশ বদলে গেল। মুখের গালপাট্টা খুলে ফেলল। এলোগেইছ একটু বিশ্রাম নিতেই বাড়ীর ফ্লোরার পুরো কাহিনীও তাকে শুনিয়ে গেল। তার শাস্তি ও ফেরারী বাহিনীও বাদ থাকল না। বলল কাজীর দরবারে বলা ইসলাম বিদ্বেষী কথাগুলোও। এলোগেইছ নিতম্ব চাপড়ে বলল,
আমাকে এখনই তার কাছে নিয়ে চলো। ওকে তো কুমারী মরিয়মের পবিত্ৰাত্মার প্রতিবিম্ব বলে মনে হচ্ছে।
ফ্লোরা ও এলোগেইছের চার চোখের মিলন হতেই একে অপরের রূপসুধা পানে ডুবে গেল। কারো নজর যেন পড়তেই চায় না। ফ্লোরা আস্তে আগে বাড়ল। ইতিপূর্বে সে এলোগেইছের কথা শুনেছে। কদমবুচির জন্য হাঁটু গেড়ে সে বসে পড়লে এলোগেইছ তাকে বুকে তুলে নিল। বলল,
চরণে নয় তোমার স্থান এই বুকে। তুমি নিষ্পাপ তরুণী। বলে তরুণীর নিটোল গালে হস্তপরশ বুলিয়ে নিল। পবক্ষণে বলল, মেরীও এমন নিষ্পপ ছিলেন। হযরত ঈসাও ছিল আমার মত সহজ সরল। এতদসত্ত্বেও তিনি শুলে চড়েছেন তুমিও শূলে চড়বে।
