কিন্তু মোদাচ্ছেরা! যিরাব আমার প্রেম দিওয়ানা যে!
ভূমি তার প্রেমে তাহলে মজে যাও। তার প্রেম মাথা পেতে নিয়ে তার মাঝে নিজকে লীন করে দাও, তবুও আমীরে স্পেনকে মহলে বন্দী করতে যেও না। সুলতানা। তোমার দৃষ্টি আজ কেবল নিজকে লক্ষ্য করেই। জগতে আসার অর্থই হচ্ছে, দুনিয়ার স্বাদ লুটা, কিন্তু আমার দৃষ্টি ভবিষ্যৎ নিয়ে। সেটা নিজের নয় স্পেনের। আমার দৃষ্টি ওই ইতিহাসের দিকে, যা মরার পরে লেখা হবে। ইতিহাসের ওই ধূসর পাতাগুলো আমি রওশন করতে চাই, যাতে দিক নির্দেশনা খুঁজে পাবে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর। আমার কথা তোমার বোধগম্যের বাইরে হয়ত বা। খুব ভেবে দেখো– বুঝতে অসুবিধা হবে না।
বুঝি মোদাচ্ছেরা! আমি তোমার প্রতিটি শর্ত কবুল করে নিলাম।
আমার স্বামীর ও আমার মাঝে তোমাকে আসতে নিষেধ করছি না। আমি শ্রদ্ধা করি পতপত করে ওড়া ওই পতাকাকে যা মহলে উড়ছে এক্ষণে। হৃদয় মিনারে ভাসমান সেই পতাকাকে আমি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করি যা মুজাহেদীনে ইসলাম জেহাদের ময়দানে উড়িয়ে থাকেন। যাও সখি! তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
মোদাচ্ছেরা পেয়ালা ওঠালেন এবং সুলতানার কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন। রাতের আঁধারে ওই পেয়ালা ভেঙ্গে দেয়া হলো। মাটি শুষে নিল এর মধ্যকার বস্তু।
সুলতানার অবস্থা ওই নাগিনীর মত এক্ষণে, যার বিষদাঁতগুলো একে একে ভেঙ্গে নিয়েছে সুচতুর কোনো সাপুড়ে।
***
নজরবন্দী ফ্লোরা।
কেটে গেছে ইতোমধ্যে বেশ কিছুদিন।
আলেম সাহেব তাকে দীক্ষা দিতে আসতে থাকেন সকাল-সন্ধ্যা।
ফ্লোরার সান্নিধ্যে থাকার সময়সীমা রোজানাই বেড়ে চলছিল তার। ফ্লোরাও নিজকে তার সামনে মেলে ধরেছিল। সে তার গৃহশিক্ষককে বারদুয়েক বলেছেও, আপনার অপেক্ষায় আমার চক্ষু থিতু হয়ে গেছে। মাথা গেছে বিগড়ে। আপনার স্থলে কেউ হলে এই দীক্ষায় আমার আকর্ষণ এতটা হতো কিনা সন্দেহ।
দীক্ষার স্থলে আলেমের ধ্যান-খেয়াল এক্ষণে ফ্লোরার কাঁচা অঙ্গের দিকেই বেশী। অন্তরঙ্গ বান্ধবীর মতই সে ফ্লোরার সাথে রসালাপে লিপ্ত থাকত। পরে দিত ধর্মদীক্ষা। ফ্লোরা তার সম্মুখে বসত, পরে তার গা ঘেঁষে বসা শুরু করে। পাঠ নিতে সে এভাবে কাছাকাছি হত যাতে তার দীঘল কালো চুল আলেমের গালে আছড়ে পড়ত। গৃহশিক্ষকের হাত ফ্লোরার অজান্তেই তার কোমরের নীচে নেমে যেত। ফ্লোরা তার দিকে মুচকি হেসে এভাবে তাকাত যেন এই আবেদনে তার আপত্তি নেই। লাজুক মুখে সে বলে যায়, আপনি আমার হৃদয়ে খোদার মহব্বত সৃষ্টি করতে এসেছেন, কিন্তু আমার হৃদয়ে এক্ষণে আপনার মহব্বত। মনটা যেন আনচান করে বুক করে দুরুদুরু। এটা গোনাহ না, তো?
না! গৃহশিক্ষক বলেন।
ফ্লোরার দুঠোঁট গৃহশিক্ষকের গণ্ডে নেমে আসে। গৃহশিক্ষক তার শিক্ষাদীক্ষা ভুলে যান। সুচতুর ফ্লোরা তার দেহে আগুন ধরিয়ে সটকে পড়ে। পরবর্তী তিন দিন সে তার সনে প্রেমোন্মাতাল অভিনয় করে যায়। পুরোদস্তুর চেপে বসে তার দিলদেমাগে।
একদিন সে গৃহশিক্ষককে বলে বসে, নিঃসঙ্গতায় থাকতে থাকতে তার মাঝে একটা একঘেয়েমি ভাব জন্ম গেছে। মন চায় ঘরের সম্মুখস্থ দুবৃক্ষে ফুলনি করার, দোলনায় দোলার। কাজটি নেহাৎ মন্দ না। এক ঘেয়েমি কাটার যুৎসই হাতিয়ার। আপনাকে রশি আনতে হবে। গৃহশিক্ষক রাজী হয়ে যান।
কিন্তু প্রহরী নারীরা বেঁকে বসেন। তারা বলেন, এ মেয়ে নজরবন্দী। এই রশির দ্বারা সে পলায়নের সুযোগ পেতে পারে। গৃহশিক্ষক বলেন, কাল তোমরা নিজ হাতে ওই বৃক্ষদ্বয়ে দোলনা বানিয়ে দিও। এটা স্রেফ ফ্লোরার নয়, তোমাদেরও একঘেঁয়েমি কাটতে সহায়ক হবে। মহিলারা একে মেনে নিল। তারা দেখেছিল ফ্লোরা সাদাসিধে এক যুবতী। সে এ অবধি এমন এনো আচরণ করেনি যাতে সন্দেহ জন্মে।
সন্ধ্যার দিকে আলেম সাহেব চলে গেলেন। সন্ধ্যার জমকালো আঁধার পরিবেশকে থমথম করে তুলেছিল। প্রহরী দুনারী ঘুমিয়ে গেল, একজনই কেবল শুইল ফ্লোরার কামরায়। ফ্লোরা ঘুমযায়নি। দরজায় তালা। চাবি ওপাশের কামড়ায় ঘুমন্ত দুপ্রহরীর কাছে।
মধ্যরাতে ফ্লোরা উঠল। দেখল তার পাশে ঘুমন্ত নারী মরণ ঘুমে বিভোর। বিছানায় এগিয়ে এলো সে। চোখে মুখে হত্যার নেশা। তার শক্ত দুহাত এক সময় ঘুমন্ত প্রহরীর গলায় নেমে এলো। মহিলাটি গোঁ গোঁ করতে এক সময় নিথর হয়ে গেল।
ফ্লোরা রশি হাতে তুলে নিল। মৃদুপায়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। উঠানে ছিল সিঁড়িপাতা। উঠানের কোণে কেল্লার প্রাচীর। ফ্লোরা সিঁড়ি সে দিকে নিয়ে গেল। প্রাচীরে রশি নিক্ষেপ করে শরীরটা বাতাসে ভাসিয়ে সে বাড়ী থেকে বেরিয়ে এলো। এখন সে যাবে কোথায়? অত ভাবার সময় নেই। অন্ধকার গলিপথে সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ফ্লোরা যার দরজার কড়া নাড়ল ইতিহাস তার নামোল্লেখ করেনি। তবে সে একজন মোয়াল্লেদ খ্রীস্টান অতি অবশ্যই। মায়ের সাথে অসংখ্যবার এর কাছে এসেছে ফ্লোরা। লোকটা শেয়ালের মত ধূর্ত। লোকেরা একে দেখল সাদাসিধা ও নিরীহ। ইতিহাস বলছে, এলোগেইছ কর্ডোভা এলে এর বাড়ীতেই আশ্রয় নিত।
খ্রীস্টান লোকটা ফ্লোরাকে দেখে হতবাক হয়ে গেল। ফ্লোরাকে হাত ধরে সে ভেতরে নিয়ে গেল ও দরজা বন্ধ করে দিল। ফ্লোরা বলে গেল তার পলায়নের কাহিনী।
জানিনা কতদিন তোমাকে আমার ঘরে বন্দীর মত থাকতে হবে; মেজবান বলল, সকালে খবর পাঠাব। কেউ এসে তোমাকে কর্ডোভা থেকে নিয়ে যাবে।
