লঘুপায়ে কামরায় প্রবেশ করলেন মোদাচ্ছেরা। আয়নায় তাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে সুলতানা চমকে ওঠেন। মোদাচ্ছেরার ঠোঁটে প্রশস্ত মুচকি হাসি।
আপনি এখানে? প্রশ্ন ও বিস্ময় দুটিই সুলতানার চোখে-মুখে, আর এই পেয়ালা?
তোমার জন্য এমন এক মধু এনেছি যা স্রেফ মিশরেই পাওয়া যায়। ফারাওদের হেরেমে এর ব্যবহার ছিল যথেচ্ছা– বলেই মোদাচ্ছেরা কারুকার্য খচিত টিপয়ে পেয়ালাটি রাখলেন, এই মধু সামান্য দুধে মিলিয়ে সেবন করলে নারীদের রূপলাবণ্য বেড়ে যায়, দেহের ভাঁজে ভাঁজে যৌবনের উন্মাদনা খেলে যায়। হেরেমের জনৈক চাকরাণীর ভাই মিশর থেকে এনেছেন। চাকরাণী এই দুধ আমার জন্য এনেছিলেন, কিন্তু আমি পান করিনি, এনেছি তোমার জন্য। তোমার দেহ ও যৌবনের প্রতি আমীরে স্পেনের যে টান সেটা চিরন্তন হোক-প্রত্যাশা আমার এই। আমার স্বামীকে খোশ দেখতে চাই। নাও পান করা। আমার নিজ দেহের প্রতি কোনোই আকর্ষণ নেই।
বুদ্ধিমতী সুলতানার বুঝতে বাকী রইল না যে, তার ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে গেছে। তার বলার ছিল অনেক কিছু, কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বেরোল না। তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যে কালো রেখা ফুটে উঠল। এ অপরাধ যেনতেন নয়।
সুলতানা! মোদাচ্ছেরা বললেন, নৈকট্য, লোভ ও হিংসা মানুষকে একদিন এ ধরনের নীচু কাজে নামায়, যেখানে নেমেছো তুমি। তোমার চেহারা যা তাতে এ শরবত তোমার মুখেই যাওয়া দরকার। তোমার অবস্থান বোধকরি অজানা নয়। আমি স্পেন আমীরের স্ত্রী। তুমি তার দাসী মাত্র। তোমার এই সর্বশেষ ষড়যন্ত্র কেবল তোমারই নয় বরং আগত সন্তানের মুখেও চুনকালি দিয়েছে।
সুলতানার মাথা চক্কর খেল। নির্বাক তার যবান। দড়াম করে সে পালংকে বসে গেল। ফ্যালফ্যাল করে মোদাচ্ছেরার প্রতি তাকাল।
বলো এ বিষ তুমি পাঠাওনি? মোদাচ্ছেরা প্রশ্ন করেন, যার হাতে এ দাওয়াই তুমি দিয়েছ, সে আমার চাকরাণী। তাঁকে জীবিত থাকতে হবে। কমপক্ষে তার সন্তানের জন্য হলেও। তোমার পদমর্যাদা ও অর্থলোভই তাকে এ পথে এনেছে। তার সাথে আমি মাত্র দুটি কথা বলেছি এতেই সে জাহান্নামের ভয় পেয়েছে। জীবনের মমতায় সে বেচাইন হয়ে গেছে। বিষের পেয়ালা রেখে সে আমার পায়ে পতিত হয়েছে। সে আমাকে পুরো কাহিনী শুনিয়েছে। আমাকে নয়, নিজকেই জিজ্ঞেস করো। হেরেমে তোমার অবস্থান কি? এখানকার চাকর-চাকরাণী কোনো দাসীর জন্য হেরেমের নারীকে ধোঁকা দিতে পারে না। তোমার যেমন সত্যকথা বলার সাহস নাই তেমনি নাই মিথ্যা বলারও। বলো না, আজ তোমার এই রাতটাকে জীবনের শেষরাত বানিয়ে দেই। ইচ্ছে করলে মাফও করে দিতে পারি। রূপ-লাবণ্যই তোমার জন্য কাল হল। বলল এ রূপ আজ কোন কাজে লাগছে?
সুলতানার চেহারায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল। পটলচেরা চোখ রক্তজবার মত লাল। এতে এক সময় দেখা দেয় অশু। আচমকা উঠে সে বিষের পেয়ালা ধরল। ফোপানো কাদার সুরে বলল, আমি আর জীবিত থাকতে চাই না। মোদাচ্ছেরা সহসা উঠে তার ঠোঁট চেপে ধরেন একহাতে, আরেক হাতে পেয়ালা ছিনিয়ে নিয়ে বলেন,
এর মানে এই যে, বিষের পেয়ালা তাহলে তোমার মুখে আমিই তুলে দিয়েছি। অসহায় সুলতানা মোদাচ্ছেরার দুহাত ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। বলে, তুমি যদি শাহী খান্দানের মেয়ে হয়ে থাকো তাহলে এর প্রমাণ দাও এবং মাফ করে দাও। হ্যাঁ, আমিই তোমাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিলাম। স্পেন ম্রাটের কানে এ খবর গেলে তিনি আমায় আস্ত রাখবেন কি?
হ্যা! তিনি তোমায় জীবিত রাখবেন– তবে কারার নিশ্চিদ্র কুঠরিতে। এমন কুঠরী যেখানে রাত-দিনের পার্থক্য বোঝায় উপায় নেই।
সুলতানা মোদাচ্ছেরার আরো শক্ত করে হু হু করে কাঁদতে থাকে।
কিন্তু আমি তোমাকে ওই মাহফিলেই জীবিত রাখতে চাই। স্পেন সম্রাটের জীবনে তোমার উপস্থিতি জরুরী। জানি, আমি যা বলছি একে আমার ধর্ম গোনাহ সাব্যস্ত করে, কিন্তু স্বার্থচিন্তা আমার জীবনে সবসময়ই কম। আমার মন উদার, চিন্তাধারাও তথৈবচ। নিজের নয় ভাবছি স্পেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ওঠো, পালংকে উঠে বসো। সুলতানা অবোধ প্রাণীর মত উঠে পালংকে বসল। মোদাচ্ছেরা বলল, ভাল করে শোন সুলতানা! এই পেয়ালা ভেঙ্গে যাবে। এই দুধ যমীন শুষে নেবে। সময় বয়ে যাবে আপন গতিতে। মাসের পর মাস বছরের পর বছর। কিন্তু তোমার অপরাধ মাটি শুষে নেবে না। সময়ের ইথারও এটা মুছতে দেবে না। বিষের এই পেয়ালা সর্বদা ঠোঁটে ছোঁয়ানো থাকতে দেখবে। সিংহশাবক
তোমার অপরাধ আমি ক্ষমা করতে পারি, তবে তা কিছু শর্তে আগামীতে সেই শর্তের একটারও বিরোধিতা করলে পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। (১) খ্রীস্টানদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করো। গোয়েন্দা আমারও আছে, যারা প্রতিনিয়ত আমার কাছে খবর পৌঁছিয়ে থাকে। যদি স্বপ্ন দেখে থাকো, খ্রীস্টানরা তোমাকে কোনো একটা প্রদেশের রাণী বানাবে তাহলে মন থেকে সেই স্বপ্ন মুছে ফেল। ওই কাফেরদের কারো সাথে যেন তোমার সম্পর্ক না থাকে। এলোগেইছ ও ইলিয়রের সাথে সম্পর্ক ছাড়। অবশ্য প্রতারণা করে ওদেরকে ধরিয়ে দিতে পারলে সেটা হবে এক মহান কাজ।
আমি তোমার প্রতিটি শর্ত মেনে নিলাম। আমায় ক্ষমা করে দাও। স্পেন সম্রাটকে কিছু বললো না।
বলব না। হুররাণীর সাথেও কোনো কথা বলো না। সে যেন আমীর সাহেবকে খামোকা রোগী সাব্যস্ত না করে। তাকে নয়া শরবত পান করাতে যেও না। রাজা ও রাজ্যের কোনো ব্যাপারে নাক গলাতে যেও না। আমীর সাহেবের সামনে নিজকে একজন দাসী হিসেবেই পেশ করা। যিরাবকে ব্যবহার করা ছেড়ে দাও।
