শ্রদ্ধেয়া মালেকায়ে আলীয়াহ! আপনি সত্যিই অনন্যা, প্রিয়ংবদা। আপনি আমার হৃদপীড়ন বন্ধ করেছেন। আমাকে আরেকটি কথা বলতে হয়। বলে তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, আরেকটি অপরাধ আপনার চরণে বিসর্জন দিতে চাই। আগামীকাল রাতে আপনার কোনো চাকরাণী আপনার কাছে দুধের গ্লাস নিয়ে আসবে। বলবে, এতে মিশরের মধু মিশ্রিত। ভাগ্যবানদের কপালেই এটা জুটে থাকে। এই দাওয়াই যৌবনকে চির অটুট রাখে। আগের যুগের রাজা-বাদশাহরা এটা সেবন করত। এতে রূপলাবণ্য বৃদ্ধি পায়। সে এই মধু আহরনের স্থানেরও উল্লেখ করবে। বলবে, এটা আমীরকে সেবন করাতে। আপনি ওই শরবত না খেয়ে তার মাধ্যমে কোনো পশুকে খাওয়াবেন।
এই বিষ সুলতানার পক্ষ থেকে আমার কাছে আসছে!
তবে কি বলছি। তিনি আমাকে বলেছেন, এই বিষ প্রয়োগের ব্যবস্থা না করলে এর চেয়ে মারাত্মক বিষ নিজ হাতেই আপনাকে খেতে হতে পারে। এটাও কি আপনি আবদুর রহমানের কাছে গোপন করতে চান?
না! এটা গোপন করব না। করলে স্পেনের কালসাপ সবাইকেই দংশন করবে। আপনি ওই নারীকে ভালোমত চিনতে পারেননি। তার সৌন্দর্যের চেয়ে ভেতরের রূপটা আরো ভয়াবহ। তা যাকগে। আপনি তাকে বিষ দিয়েছেন কি?
হ্যা! মোদাচ্ছেরার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হুররাণী তার হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললেন, এরপরে কি বলবেন, হেকিম হুররাণী দুধে বিষ মিশিয়ে পাঠিয়েছেন? তার চেয়ে এক কাজ করুন! আমাকে জল্লাদের হাতে সোপর্দ করুন। আমি জীবিত থাকতে চাই না। আল্লাহ আমাকে রোগীর উপশমের দায়িত্বে রেখেছিলেন এতদিন, এক্ষণে আমার হাতে মানুষ মারার কায়দা-কাজেই জীবনের চেয়ে মরাই শ্রেয়। হুররাণী কেঁদে ফেলেন। বলেন, আমি এখান থেকে চলে যাব। এখানে থাকার পরিবেশ নাই।
আপনি এখানেই থাকবেন। মোদাচ্ছেরা বললেন, আপনাকে আমার বড় প্রয়োজন। সময় আসছে, যখন আপনার হাতে এই বিষ আমীরের মুখে তুলতে বাধ্য করা হবে। আপনি আমাকে যেভাবে আগেভাগে স্মরণ করালেন সেভাবে আবদুর রহমানের বেলায়ও তাকে স্মরণ করাবেন।
মাঝে মধ্যে মনে হয় সুলতানার মুখেই এই বিষ তুলে দেই। কিন্তু আমি হেকিম-যমদূত নই।
আপনি শান্ত হোন। আপনার প্রতি সুলতানার বিশ্বস্ত নষ্ট করে বসেন না যেন।
আমি ভেবে হয়রান সে খ্রীস্টানদের চর।
না! কালনাগিনী কারো প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ নয়। সে যা কিছু করছে স্বার্থান্ধ হয়েই করছে। আপনি দেখবেন এক বুক আশা নিয়ে তার বেঁচে থাকা। ভাবী খলিফার গর্ভধারিণী সে। খ্রীস্টানদের ক্রীড়নক হয়ে তাদের থেকে একটি প্রদেশের মালিক হতে চাচ্ছে। এদিকে স্পেন আমীরের শয্যাশায়িনী হয়ে স্পেনের ভাবী সম্রাটের গর্বিত মা হবার স্বপ্ন দেখছে। ওদিকে আবদুর রহমান নারীর ছলনা ও কুমতলবে খোঁড়াই উপলব্ধি করতে পারছে। আমি তাকে কতভাবে বুঝতে চেষ্টা করলাম। আপনি আজ যে অকল্পনীয় সহমর্মিতা প্রদর্শন করলেন তার প্রতিদান একমাত্র আল্লাহই দিতে সক্ষম। নিশূপ নির্বিকার থেকে যান।
হুররাণী খামোশ বেরিয়ে যান, কিন্তু তার চলার গতি বলছিল, বড় বেচাইন তার মানসিকতা এই মুহূর্তে।
***
পরদিন।
হেরেমের বিশেষ এক চাকরাণী যে মোদাচ্ছেরার পরিচিত দেখা করল, সে বলল, তার এক ভাই মিশর থেকে এসেছে। নিয়ে এসেছে যৌন উত্তেজক মধু। এই মধু আগের যুগের ফেরাউনরা সেবন করত। এটা কেবল যুবতী রাজমহিষীরাই ব্যবহার করে থাকেন। এতে সৌন্দর্য-বৃদ্ধির পাশাপাশি শরীরে যৌবনের বান ডাকে। এখন ওই মধু মিশরের নির্জন এলাকায় পাওয়া যায়।
আপনি চাইলে দুধে মিশিয়ে আনব। মধু খুব কম : এক ঢোকেই সবটুকু পান করবেন- তাহলেই কেবল প্রতিক্রিয়া হবে।
নিয়ে এসো! এখনই। মোদাচ্ছেরা বললেন, চাকরাণীর চোখে আনন্দ দ্যুতি। চাকরাণী এক পেয়ালা দুধ নিয়ে এল। মোদাচ্ছেরা পেয়ালা দুধ হাতে নিয়ে বললেন, সুলতানা তোমাকে এই দুধ দিয়ে একথা কি বলেনি যে দেখ; দুধ খেয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি, না মাথা ঘুরে পড়ি? মনের চাপা পেরেশানি সংযত চাকরাণী বলল, আপনি একি বলছেন? সুলতানার সাথে এই দুধের সম্পর্ক কি?
ওহহো! দুধের প্রতিক্রিয়া দেখার পর বুঝি তাহলে তুমি পুরস্কার পাবে?
যতই চৌকস হোক না কেন চাকরাণী বুঝতে পারল, ইনি আবদুর রহমানের স্ত্রী। তার সন্দিহান মনোব দেখে সে কাঁপতে লাগল। মুদাচ্ছেরা হেসে পড়লেন।
ভয় নেই। বলো, এই বিষ তোমাকে কি সুলতানা দেয়নি?
হা! তিনিই দিয়েছেন। চাকরাণী কম্পিত কণ্ঠে বললো, এটা আমাকে দিয়ে দিন। আমিই পান করে নিচ্ছি। আসন্ন শাস্তির চেয়ে ওটা পান করে নেয়াই শ্রেয়। সে কেঁদে বলল, এ কাজ না করলেও তার শাস্তিও আমাকে পেতে হত।
চাকরাণী মোদাচ্ছেরার পায়ে আছড়ে পড়ল। বলল, আমার সন্তানদের প্রতি দয়া করুন। এখান থেকে পলায়ন করার সুযোগ দিন। হেরেম ছেড়ে চিরদিনের তরে চলে যাব। কর্ডোভার মুখ দেখব না কোন দিনও।
মোদাচ্ছেরা বললেন, তুমি হেরেমেই থাকবে। কেউ তোমাকে কোনো শাস্তি দিতে পারবে না।
বাইরে দাঁড়াও। আমি না আসা পর্যন্ত এখানেই থাকবে। কারো সাথে কোনো কথা বলবে না।
দুধের পেয়ালা হাতেও ওঠালেন তিনি। চাকরাণী কাঁপছে বেতসপাত্র মাফিক।
***
সুলতানা ড্রেসিং টেবিলের সামনে রূপচর্চায় লিপ্ত। হেরেমের নারীরা সূর্যাস্তের পর এভাবে রূপচর্চায় লিপ্ত হতেন। সুলতানা ছিল রাতের স্বপ্ন। তার কামরায় আতরের ঘ্রাণ মৌ মৌ, জনগণ যার কল্পনাও করতে পারে না। রকমারী রঙিন আলোতে অন্দর ঝলমল।
