মোদাচ্ছেরা সুন্দরী আকর্ষণীয়া যুবতী নারী। দেহসৌষ্ঠব, দীঘল কালো চুল, টানা টানা চোখ সর্বোপরি গোলাপ পাপড়ি সদৃশ তার প্রাণোচ্ছল হাসির প্রতি অগাধ আকর্ষণ ছিল আবদুর রহমানের। মোদাচ্ছেরা কেবল দৈহিক সুন্দরী নন, তিনি আত্মিক সৌন্দর্যেও আঃ রহমানকে মাত করেছিলেন।
তোমার ও সুলতানার মধ্যে একটা পার্থক্য অনুমান করছি আমি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছি না। সেই পার্থক্য তোমার অজানা নয়।-বললেন আবদুর রহমান।
কখনও জানার চেষ্টা করিনি। পূর্ববৎ হেসে বললেন মোদাচ্ছেরা, কখনও এ খেয়ালে ডুবে থাকিনি যে, আপনি শুধু আমার। সুলতানা আর আমার মাঝে পার্থক্য ফুলের মত। প্রতিটি ফুলের ঘ্রাণ আলাদা। কখনও ভাবিনি, আমি সেই ফুল, বাগানে যে একা।
***
এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তে দরজার হালকা করাঘাত হলো। এই করাঘাত কার হতে পারে তা যেমন আবদুর রহমান জানেন তেমনি জানেন মোদাচ্ছেরাও। তিনি বললেন, বলো! এখন আসার কোন সময় হলো?
আসতে দিন।
তারও তো এখানে অধিকার আছে। বলে মোদাচ্ছেরা দরজা খুলে দিলেন।
সুলতানা দরজার দাঁড়ানো। বলল, হুররাণী এসেছেন। সুলতানার পেছনে যিরাব ও হেকিম হুরাণী। হুররাণী কামরায় ঢুকেই আবদুর রহমানের নাড়ীতে হাত রাখেন। তার চেহারায় কালো রেখা ফুটে উঠল। সে ক্রমে ক্রমে তার সিনায় হাত রেখে চাপ দিতে লাগল। জিভ বের করাল এবং চোখ খুলে পাতার দিকে তাকিয়ে কুঁচকালো।
হুররাণী! আবদুর রহমান বললেন, তুমি হয়ত দেখতে এসেছ, আমি রোগাক্রান্ত হচ্ছি না কেন। খোদা তায়ালা আমার ভেতরে এমন একটা প্রাইভেট রগ রেখেছেন, যা আমার প্রতিটি রোগকে উপশম করে দেয়। আমার অসুস্থতা নিয়ে তোমার এই অতি উ ৎসাহের কারণ কি?
আমরা এটাই দেখতে এসেছিলাম যে, ব্যাপারটা কি? কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা আমাদের নেই। তবে এতটুকু আমাদের উদ্বেগ যে, খেলাফত ও স্পেনের জন্য সুস্থ আবদুর রহমানের দরকার বেশী বলল যিরাব।
আবদুর রহমান তো এদেশে অনেক–কিন্তু আপনার মত কজনা। অভিযান শেষ হয়েছে সেই কবে, কিন্তু চেহারা থেকে এখনও ক্লান্তির ছাপ মোছেনি। আমি মুহতারাম হুররাণীর সাথে কথা বললে তিনি বললেন, খুব সম্ভব স্পেনের কলিজা দুর্বল হতে চলেছে। তিনি অভিযানে যাওয়া বন্ধ না করলে ওই কলিজা নিস্তেজ হয়ে যাবে একেবারেই। বলল সুলতানা।
তোমার দৃষ্টিতে এতটা ফারাক কেন? অথচ মোদাচ্ছেরার দৃষ্টিতে আমি সুস্থ যুদ্ধ আমার সুস্থতা বাড়িয়ে তোলে-তার কথা এমনটা। কিন্তু তোমরা আমার সুস্থ কলিজায় ব্যামো আবিষ্কার করছো যে খুব। বললেন আবদুর রহমান। সুলতানা চোখ রাঙ্গা করে মোদাচ্ছেরার দিকে তাকাল।
স্পেন আমীরের দীর্ঘ বিশ্রামের দরকার। কলিজায় প্রেসার বাড়ছে। নাড়ির স্পন্দন বলছে, রম্ভে সঞ্চালন খুবই হালকা- দ্রত হওয়া চাই। হেকিম বললেন।
মুসলমানের রক্ত ঘরে বসে থাকলে দ্রুত হয় না। ময়দানে জেহাদে নামলেই কেবল রক্ত গরম হয় বললেন আবদুর রহমান।
আপনার সুস্থতার প্রতি নজর দিতে হবে মুহতারাম আমীর! বলল সুলতানা।
যদি কোনো চাটুকার আপনাকে সুস্থ বলে থাকে সে আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী নয়। মুহতারাম হেকিম! আপনি দাওয়া প্রস্তুত করুন– আমি তাকে সুস্থ করে তুলব। আরাম দেব।
যতটুকু আরামে তিনি এ মুহূর্তে আছেন খুব সম্ভব সেটুকুও তার থাকছে না। কোনো দরবারী যদি তার অসুস্থতার দোহাই পাড়েন তাহলে এতেও এক ধরনের চাটুকারিতার গন্ধ পাওয়া যায়! বললেন মোদাচ্ছেরা।
হুররাণী উঠে দাঁড়ালেন। মনে হলো, তার মন-মেধা অন্য কোথাও। তিনি বললেন, আমি দুটি দাওয়া দেব। আমীর মুহতারামের সুস্থতা অপরিহার্য। বলে বেরিয়ে গেলেন।
যিরাব ও সুলতানা অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। আঃ রহমানের কলিজায় ঘুণ ধরছে এ মর্মেই তারা কথা বলল। স্রেফ আরামই নয় যুদ্ধ ও নারী তাকে ত্যাগ করতে হবে। সুলতানার এ কথার উদ্দেশ্য, সে ছাড়া আর কেউ যেন তাঁর সংশ্রবে না আসে।
***
তিনদিন পর।
হেকিম হুররাণী দেখা করতে চান বলে মোদাচ্ছেরার কাছে সংবাদ এলো। কিন্তু তিনি মহলে আসতে ভয় পেতেন। মোদাচ্ছেরা পেটের পীড়ার অজুহাতে তাকে মহলে আসার পথ সুগম করে দেন।
পরদিন মোদাচ্ছেরা কৃত্রিম পেটের পীড়ায় উহ্ আহ করতে লাগলেন। হুররানী এসে গেলেন। মোদাচ্ছেরা খাস কামরায় শায়িত। তিনি চোখের ইশরায় চাকরানীকে বেরিয়ে যেতে বলেন।
আপনার সাথে বোধ হয় এক্ষণে কথা বলতে পারব। আমার মন একটি দুঃসহ বেদনার বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছে। আপনার সামনে কেবল ওটা পেশ করতে পারি। হুররাণী বললেন।
সেই বোঝা আমার অজানা নয়। স্পেন আমীরের কলিজায় কোন ঘুণ ধরেনি, অথচ দিব্যি আপনি তাকে রোগী বানিয়ে ফেলেছেন।
হুররাণী ভূত দেখার মত চমকে ওঠে মোদাচ্ছেরার দিকে তাকালেন।
আপনি তাকে এ কথা বলে দেবেন বুঝি? প্রশ্ন হেকিমের।
আমি তার সন্দেহ লাঘব করতে চেষ্টা করব। তবে একথা বলব না যে, সুলতানা বা যিরাব তার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে এবং শল্য বানাতে চাচ্ছে। ওরা দুশমনের সাথে সওদা পাকাপাকি করে ফেলেছে। আমি ব্যাপারটা তার কাছে গোপন রাখতে চাই। কেননা ওদের বিরুদ্ধে তিনি ক্ষেপে গেলে ওরা আরেক দিকে আমাকে ঘায়েল করতে চাইবে। আমি পরিণত হব ওদের টার্গেটে। এতে আত্মরক্ষাকল্পে আমাকে নানান ষড়যন্ত্র করতে হতে পারে। আমার চিন্তা-চেতনা এ মুহূর্তে দেশ ও জাতিকে নিয়ে। আপনি আপনার বোৰা অপসারণ করে ফেলেছেন। খুব ভাল করছেন। আরো ভালো করেছেন সুলতানার কথামত কাজ করে। ওর কথামত কাজ না করলে না জানি আপনার ওপর কি ভীষণ মুসিবত নেমে আসত! বললেন মোদাচ্ছেরা।
