একবার তিনি বড় হতাশ ও পেরেশান অবস্থায় যিরাবের কাছে আসেন। বলেন, আমি শাহী হেকিম মুহতারাম যিরাব! রাসরি আলীজাহর কাছে যাওয়া দরকার, কিন্তু দরবারের ব্যাপার-স্যাপার আপনি ঠিক ততোটা ভালো জানেন, যতটা আমি জানি রোগ-ব্যামো বিষয়ে। আপনি আমায় সাহায্য করুন, আমি টেনশনে আছি; বললেন হেকিম হুররাণী।
হেকিম সাহেব টেনশনে থাকলে তো রোগীরা মরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। বলুন। আপনার টেনশনটা কি?
সুলতানা আমাকে বলছেন, আমি যেন স্পেন শাসককে তার স্বাস্থ্য ক্রমশ যে দুর্বল হতে চলেছে তা বলে সতর্ক করি। তার উদ্দেশ্য, আবদুর রহমান যেন নতুন কোন অভিযানে না যান। শুধু কি তাই! তাকে যেন এমন এক রোগী বলে সাব্যস্ত করি যেন তিনি তাতে ভড়কে যান।
আপনি তাকে কি জবাব দিলেন।
সুলতানাকে বলেছি, আমার পেশা খুবই নিরপেক্ষ নিখাদ সেবাধর্মী ও পবিত্র। প্রাণঘাতী দুশমনকেও আমি ধোকা দিতে পারিনি, দেইনি কোন দিনও। আমি ওই রোগীদেরও সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারি না, যারা আমার বন্ধু নয়। আর ইনি তো স্পেন শাসক। একেতো তার আনুগত্য আমার জিম্মায় ফরঅন্যদিকে আমি তার শাহী হেকিম। সুলতানাকে বলেছি, মাফ করবেন! আমার দ্বারা এ কাজ সম্ভব নয়। তিনি বললেন, যদি এটা গোনাহ হয়ে থাকে তাহলে এর মধ্যে ভালো দিকও আছে একটা। সেটা হচ্ছে, আমীরে স্পেন একজন অনন্য মানুষ। দুশমনের সামনে বুক উঁচিয়ে যুদ্ধ করে তিনি আহত হলে লাগাতার পরিশ্রম ও বিদ্রি রাত কাটাতে কাটাতে মারা যাবেন। স্পেনকে তার দরকার। তাঁর মত শাসক নেই আর। সুলতানকে বলেছি, যুদ্ধবিগ্রহ করতে হয়ত আমি তাকে সতর্ক করতে পারি। বলতে পারি, স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখবেন তথাপিও মিথ্যাচার আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।
আপনি কি আমীর সাহেবের কাছে সুলতানার বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠুকতে চান?
আমার জিজ্ঞাসাও তাই আপনার কাছে। কথা এখানেই শেষ নয়। আমার প্রস্তাবে সুলতানা রেগে যান। তিনি আমাকে বললেন, মুহতারাম হেকিম। স্পেন-শাসক হেকিম আর কাউকে বানাতে পারেন। কিন্তু দ্বিতীয় সুলতানা কাউকে বানাতে পারবেন না। তার ওপর আমার যে প্রভাব তা কিন্তু আপনার নেই। একটি মাত্র ইশারায় আপনাকে তার কাছে বিতর্কিত করে তুলতে পারি। আমার কথামত আপনি আমল না করলে লোকেরা জানবে, প্রাসাদে হুররাণী নামী এক হেকিম ছিল। কাজেই যা বলছি তা করুন! করলে বহু এনাম পাবেন।
মুহতারাম যিরাব? আমীরের কাছে আমার মূল্যায়ন তেমন একটা নাই জানি, যতটা সুলতানার। হেকিম বহু আছে কিন্তু সুলতানা একজন। কাজেই তাকে আমি ক্ষ্যাপাতে চাইনা।
জনাব হুররাণী! সুলতানা যা বলছে তা আপনাকে করতে হবে। না করলে আপনার পরিণতির কথা আমি বলতে পারব না। শুধু কি তাই? তার কাছে আপনাকে বিতর্কিত করে তোলা হবে, আপনার চরিত্রে কালিমা লেপন করা হবে। শেষ পর্যন্ত এমন জেলে যেতে হবে যেখানে জীবন-মৃত্যু সমান। আমিও সুলতানার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছি, যেভাবে আমীরে আঃ রহমান দ্বিতীয় কোনো সুলতানাকে পাবেন না সেভাবে স্পেনও কোন দ্বিতীয় আবদুর রহমানকে পাবে না। কাজেই স্পেনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় বৃহত্তম স্বার্থে আপনাকে মিথ্যাচার করতেই হয়।
হুররাণী খামোশ হয়ে যান। শেষতক বলেন, আমার আরো কিছু বলার ছিল– কিন্তু বলব না। আমাকে তা-ই করতে হচ্ছে যা করা উচিত নয় আমার জন্য।
***
তিনি মিথ্যাচারে রাজী হতে চাইছিলেন না। সুলতানাকে যিরাব বললেন, আমি তাকে রাজী করিয়েছি।
খুব সম্ভব সে আসছে। সুলতানা বলল, আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি। স্পেন সম্রাটকে বলেছি, আপনার চেহারা হলদে বর্ণ ধারণ করেছে, চোখের দ্যুতি নিষ্প্রভ হতে চলেছে। হেকিম আগমনের সংবাদটাও তাকে আগাম দিয়ে রেখেছি।
তোমার কতদিন বাকী? প্রশ্ন যিরাবের
এক মাসের কিছু কম। আমার আশা, ছেলে হবে এবং সে আবদুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবে। আমার পুত্রকে ভাবী সম্রাট বানাব। এক্ষণে খ্রীস্টানদের সাহায্য দরকার। সাহায্য দরকার তোমারও।
ইতোমধ্যে জানা গেল হেকিম হুররাণী এসে গেছেন। সুলতানা ও যিরাব হররাণীকে তাদের কামরায় ডেকে আনলেন এবং আবদুর রহমানের কাছে যা বলা লাগবে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিলেন। ওই সময় মোদাচ্ছেরা আবদুর রহমানের কাছে বসলেন। আবদুর রহমান তার প্রতিও বেশ দুর্বল। মোদাচ্ছেরা তাকে ফ্লোরার বাহিনী শোনাতে লাগলেন। আবদুর রহমান বললেন,
এ ধরনের মেয়ের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।
আপনি কাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চাচ্ছেন? ক্রুসেডাররা ষড়যন্ত্রজাল বিস্তার করে চলেছে। এই সমস্যা নিরসন আপনার নিজ হাতে করতে হবে। কমান্ডার মাঠে লড়বে, কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে হবে আপনাকেই। ফ্রান্সে অতি শীঘ্র হামলা করা দরকার। বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে এই দেশটি– বললেন মোদাচ্ছেরা।
আমার জঙ্গী প্রস্তুতি এতদুদ্দেশ্যেই।
আমি দেখেছি, যুদ্ধে নামলে আপনার সুস্থতা এসে যায়। এখানে পড়ে থাকা আপনার স্বাস্থ্যহীনতার কারণ বলে মনে করি। স্মিতহাস্যে বললেন মোদাচ্ছেরা।
সত্যিই একটা ভালো কথা বলেছে। আল্লাহর দুশমনরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব– তা হয় না। অভিযানে নেমে আমি প্রাণ দিতে চাই। দৌর্বল্যে আমার হাত কাঁপলেও তখন আমার হাতে তলোয়ার থাকবে। দেখবে ঘোড়ার পিঠে চাপতে।
