দশ দিন পরে আরব ও পারস্যের কয়েকজন দরবেশ নিয়ে সিংহল থেকে একখানা জাহাজ এসে পৌঁছল। তারা আমাকে চিনতে পারলেন এবং উজিরের পরিচালকদের। কাছে আমার পরিচয় দিলেন। তাতে উজির আমাকে সেখানে রাখবার জন্য আরও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। রমজানের শুরুতে তিনি উজির ও আমীরদের এক ভোজসভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। পরে আমিও দরবেশদের সম্মানে একটি ভোজ দিতে ইচ্ছুক হয়ে উজিরের অনুমতি চাইলাম। কারণ দরবেশরা সিংহলে আদমের কদম জেয়ারত করে এসেছেন। তিনি অনুমতি দিয়ে আমাকে পাঁচটি ভেড়া, চাউল, মুরগী, ঘি ও মসলা পাঠিয়ে দিলেন।
ভেড়া সেখানে মা’বার, মালাবার ও মামা থেকে আমদানী হয় বলে খুবই দুষ্প্রাপ্য। আমি এসব সামগ্রী উজির সুলেমানের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিলাম। তিনি এর সঙ্গে আরও কিছু যোগ করে সুন্দরভাবে রান্না করিয়ে দিলেন। অধিকন্তু পিতলের থালাবাসন ও কাপের্ট সরবরাহ করলেন। আমার ভোজসভায় যাতে কয়েকজন মন্ত্রী (Ministers) যোগদান করতে পারেন সেজন্য উজিরের অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, এবং আমিও কিন্তু আসবো। তবে আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম। বাড়ী ফিরে দেখলাম, তিনি মন্ত্রী ও অন্যান্য গণ্যমান্য লোকদের নিয়ে আগেই সেখানে পৌঁছে গেছেন। উজির কাঠের একটি উঁচু বেদীর উপর আসন গ্রহণ করলেন। যে সব মন্ত্রী ও আমীররা সেখানে হাজির হয়েছেন তাঁদের সবাই কাপড় ছুঁড়ে দিয়ে উজিরকে সম্বর্ধনা জানাতে লাগলেন। এমনি করে সেখানে প্রায় একশ কাপড় জড়ো হলো এবং দরবেশরা সে সব নিয়ে গেলেন। অতঃপর খাদ্য পরিবেশন করা হলো। অতিথিদের খাওয়া শেষ হলে চমৎকার সুরে কোরাণ পাঠ হলো। দরবেশরা তখন তাদের শাস্ত্রানুসারে গান ও নৃত্য শুরু করলেন। আমি একটি আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে রেখেছিলাম। তারা সেই আগুনের উপর হাঁটতে লাগলেন। মিষ্টি খাওয়ার মতো তাদের ভেতর কেউ-কেউ আগুন মুখে দিয়ে খেতে লাগলেন। আগুন নিবে না-যাওয়া অবধি এমনি চললো। রাত্রি শেষ হয়ে এলে উজির চলে গেলেন, আমিও তার অনুসরণ করলাম। সরকারী একটি বাগানের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে উজির আমাকে বললেন, এ বাগানটি আপনার। আমি আপনার বাসের জন্য এর ভেতর একটি ঘর তৈরী করে দেবো। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম এবং তাঁর সুখ-শান্তির জন্য মোনাজাত করলাম। পরে তিনি আমাকে দু’জন ক্রীতদাসী, কয়েক টুকরো রেশমী কাপড় এবং এক কৌটা জহরত পাঠিয়েছিলেন।
কিছুকাল পরে নিম্নবর্ণিত কারণে আমার প্রতি উজিরের ব্যবহার শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠলো। উজির সুলেমান আমার সঙ্গে তার কন্যার বিবাহের প্রস্তাব করে পাঠালেন। এ ব্যাপারে আমি উজির জামালউদ্দিনের অনুমতি চাইলাম। অনুমতি চাইতে যাকে পাঠালাম সে এসে বললো, এ প্রস্তাবে তিনি নারাজ, কারণ তার নিজের কন্যার ইদ্দতের কাল ফুরালে তাকেই তিনি আপনার কাছে বিয়ে দিতে চান। কিন্তু তাঁর কন্যা ভাল নয় আশঙ্কায় আমি তাকে বিয়ে করতে সম্মত নই। কারণ, এর আগেই তার দু’বার বিয়ে হয়েছে এবং রোসমতের আগেই দু’স্বামীই মারা গেছে। ইত্যবসরে আমিও ভয়ানক জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এ দ্বীপে যে আসবে তার জ্বর হবেই হবে। কাজেই এ দ্বীপে ছেড়ে চলে যাবার সংকল্প করে কিছু জহরত কড়ির পরিবর্তে বিক্রি করে ফেললাম। বাংলা দেশে যাবার জন্য একখানা জাহাজও ভাড়া করা হলো। তারপরে যখন আমি উজিরের কাছে বিদায় নিতে গেলাম তখন কাজী বেরিয়ে এসে বললেন, উজির বলছেন যদি আপনি যেতে চান তবে যা-কিছু আপনাকে দেওয়া হয়েছে তা ফেরত দিতে হবে। আমি জবাবে বললাম, আমি তা দিয়ে কড়ি কিনে ফেলেছি। কাজেই সে সব নিয়ে যা-খুশী আপনারা। করুন। তিনি আবার এসে বললেন, আপনাকে উজির সোনা দিয়েছেন, কড়ি তো দেননি। আমি বললাম, আমি সে সব বিক্রি করে সোনাই দেবো। কাজেই আমি সওদাগরদের কাছে কড়ি ফেরৎ দেবার জন্য গেলাম। কিন্তু উজির তাদের সে কড়ি ফেরত নিতে বারণ করে দিলেন। তার উদ্দেশ্য, যে কোনো রকমে আমার যাত্রা বন্ধ রাখা। অবশেষে তাঁর পাঠানো একজন সভাসদ এসে বললেন, উজির বলছেন, আপনি আমাদের কাছেই থেকে যান। তাতে আপনি যা চাইবেন তাই পাবেন। আমি বুঝতে পারলাম আমি এখন তাদের ক্ষমতার ভেতরে রয়েছি। আমি স্বেচ্ছায় না-থাকলে আমাকে রাখবার জন্য এরা বলপ্রয়োগ করবে। কাজেই, নিজের ইচ্ছায় থেকে যাওয়াই ভাল। আমি তখন তার লোককে বললাম, বেশ, আমি তার এখানেই থাকবো। লোকটি ফিরে গেলে উজির অত্যন্ত খুশী হলেন এবং আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তার ঘরে। ঢুকতেই তিনি আমাকে আলিঙ্গন করে বললেন, আমরা চাই আপনাকে আমাদের ভেতর রাখতে আর আপনি কিনা আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চান। আমি তাকে অজুহাত দেখালাম, তিনি তা মেনে নিলেন। পরে বললাম, যদি আমাকে থাকতেই বলেন তবে আমার কিছু শর্ত আছে। তিনি বলে উঠলেন শর্ত মঞ্জুর হলো। কি সে শর্ত বলুন। আমি তখন বললাম, আমি পায়ে হেঁটে চলতে পারি না। (সেখানে রীতি হলো, উজির ছাড়া কেউ ঘোড়ায় চড়তে পারবে না। আমাকে একটা ঘোড়া দেবার পরে আমি যখন কোথাও ঘোড়ায় চড়ে যেতাম তখন কৌতূহলী লোকজন ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে আমার পিছু ধাওয়া করতো। অবশেষে আমাকে উজিরের কাছে নালিশ করতে হলো। ফলে তিনি ‘ডান্ধুরা’ পিটিয়ে জানিয়ে দিলেন যাতে কেউ আমার পিছু ধাওয়া না করে। ডান্ধুরা’ পিতলের তৈরী বাটীর মতো। লোহার ডাণ্ডা দিয়ে তা বাজানো হয়। অনেক দূর থেকে সে বাজনা শুনা যায়। সর্বসাধারণের মধ্যে কোনো প্রকার ঘোষণা করতে হলে তা। ‘ডান্ধুরা’ বাজিয়ে করতে হয়। উজির বললেন, আপনি যদি পাকী চড়তে চান তবে তাই করুন। তা না হলে আমাদের একটা ঘোড়া আছে, ঘটকীও আছে একটা। আপনি যেটা খুশী নিতে পারেন। আমি ঘটকী পছন্দ করলাম। তখনই সেটা আমার কাছে আনা হলো। সেই সঙ্গে এলো পোষাক। তখন আমি বললাম, যে কড়িগুলো কিনেছিলাম তা দিয়ে কি করবো? তিনি বললেন, আপনার কোনো সঙ্গীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেন সেগুলো বিক্রি করে দেবার জন্য। আমি বললাম, পাঠাতে পারি যদি আপনিও আপনার একজন লোক দেন তাকে সাহায্য করতে। তিনি তাতে রাজী হলেন। তখন আমি পাঠালাম আমার সঙ্গী আবু মোহাম্মদকে এবং তারা পাঠালো আল-হাজ্ব আলী নামক। একজন লোককে।
