রমজান শেষ হবার পরেই আমি উজির সোলেমানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলাম তার কন্যাকে বিয়ে করবো বলে। উজির জামালউদ্দিনকে অনুরোধ জানালাম যাতে বিয়েটা তার সাক্ষাতে প্রাসাদেই সমাধা হয়। তিনি তাতে সম্মত হলেন এবং রীতি অনুযায়ী পান। ও চন্দনকাঠ পাঠিয়ে দিলেন। সব মেহমানরা এলেন কিন্তু উজির সোলমান বিলম্ব করতে লাগলেন। তাঁকে আনতে লোক পাঠানো হলো কিন্তু তবু তিনি এলেন না। দ্বিতীয়বার ডেকে পাঠাবার পরে তিনি তার কন্যা অসুস্থ বলে অজুহাত দেখালেন। পরে উজির আমাকে গোপনে বলেছিলেন। তার কন্যা এ বিয়েতে নারাজ, সে নিজেই নিজের কত্রী। লোকজন এসে গেছে, কাজেই সুলতানার শাশুড়ীকে বিয়ে করার বিষয়ে আপনার মতামত কি? (তার মেয়ের সঙ্গেই উজিরের ছেলের বিয়ে হয়েছে। আমি বললাম, বেশ ভালই। তখন কাজী ও সাক্ষী সাবুদ ডাকা হলো। বিয়ে পড়ানো হলো। উজির তাকে। মোহরানা দিলেন। কয়েকদিন পরে তাকে আমার কাছে পাঠানো হলো। তিনি একজন উত্তম নারী ছিলেন।
এই বিয়ের পরে উজির আমাকে জোর করেই কাজী পদে বহাল করলেন। তার কারণ, ওয়ারিশানের ভেতর কোনো সম্পত্তি ভাগ করে দেবার সময় কাজী সে সম্পত্তির দশ ভাগের এক ভাগ নিজের পারিশ্রমিক বলে গ্রহণ করতেন। তার এ প্রথার জন্য আমি তাকে তিরস্কার করেছিলাম। বলেছিলাম ওয়ারিশানের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে আপনি শুধু। ফি ছাড়া আর কিছুই পেতে পারেন না। এ ছাড়া কোনো কাজই তিনি ঠিকভাবে সমাধা। করতেন না। আমাকে যখন নিযুক্ত করা হলো তখন থেকে আমি সব-কিছুই পবিত্র শরিয়ত অনুসারে করতে চেষ্টিত হলাম। সেখানে আমাদের দেশের মতো মামলা। মোকদ্দমা নেই। তাদের মধ্যে প্রচলিত যে দুষনীয় রীতিটি প্রথম আমি সংশোধন করি তা ছিলো তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর পূর্ব-স্বামীর গৃহে অবস্থান। পুনরায় অন্যত্র বিবাহ না-হওয়া অবধি তারা পূর্ব-স্বামীর গৃহেই বাস করতো। অচিরেই আমি এ প্রথা রদ করি। এ অপরাধে অপরাধী প্রায় পঁচিশজন লোককে আমার কাছে হাজির করা হয়। আমি তাদের প্রহার করে বাজারের ভিতর হাঁটিয়ে নিয়ে যাই এবং তাদের কবল থেকে মেয়েদের মুক্ত করে দেই। অতঃপর নামাজ পড়ার জন্যও আমি কঠোর আদেশ দেই। লোকদের উপর হুকুম ছিলো শুক্রবার নামাজের পরেই তারা রাস্তায় ও বাজারে দ্রুত বেরিয়ে যাবে এবং কারা নামাজে যোগদান করেনি তা দেখবে। আমি তাদের এসে অনুরূপভাবে প্রহার করে রাস্তায় মিছিল করাতাম। বেতনভুক এমাম ও মোয়াজ্জিনদের প্রতিও আমি তাদের। কর্তব্যে তৎপর হতে বাধ্য করি। সে মতে সকল দ্বীপে চিঠি পাঠানো হয়। আমি মেয়েদের কাপড় পরাতেও চেষ্টা করেছি কিন্তু সে চেষ্টায় কৃতকার্য হতে পারিনি।
ইত্যবসরে আমি আরও তিনটি বিয়ে করেছি। তাদের একজন এক উজিরের কন্যা। তাকে এরা যথেষ্ট সম্মান করতো, কারণ এর পিতামহ একজন সুলতান ছিলেন। শাহাবউদ্দিনের পূর্ব-স্ত্রী ছিলেন আমার অন্যতমা স্ত্রী। এসব বিয়ের কারণে দুর্বল দ্বীপবাসীরা আমাকে ভয় করতে লাগলো এবং উজিরের কাছে আমার কুৎসা রটিয়ে আমাদের সম্পর্ক তিক্ত করে তুললো। একবার সুলতান শাহাবউদ্দিনের একজন ক্রীতদাসকে আমার নিকট হাজির করা হলো ব্যভিচারের অভিযোগে। প্রহারের পর আমি তাকে কারাগারে বন্দী করি। তাকে মুক্তি দেবার অনুরোধ করে উজির তার প্রধান সভাসদদের কয়েকজনকে আমার কাছে পাঠান। আমি তাদের বললাম, আপনারা কি এমন একজন নিগ্রো গোলামের পক্ষ সমর্থন করতে চান যে তার মনিবের ইজ্জতের হানি। করেছে। অথচ শাহাবউদ্দিন তার একজন ক্রীতদাসের গৃহে প্রবেশ করেছিলেন বলে তাকে সিংহাসনচ্যুত করেন এবং পরে তাকে হত্যা করেন। তৎপর আমি সেই গোলামকে ডাকিয়ে এনে বাঁশের লাঠি দিয়ে পিটালাম এবং তার গলায় দড়ি বেঁধে দ্বীপে টহল দেওয়ালাম। চাবুকের চেয়ে বাঁশের লাঠির প্রহার অপেক্ষাকৃত শক্ত। এ খবর। শুনতে পেয়ে উজির ভয়ানক রেগে গেলেন। তিনি তার উজিরদের এবং সেনাপতিদের একত্র করে আমাকেও ডাকলেন। আমি তার কাছে গিয়ে হাজির হলাম। যদিও সাধারণতঃ আমি তাকে কুর্নিশ করে থাকি, সেদিন কুর্নিশ না-করে সেদিন শুধু আচ্ছালাম আলাইকম বললাম। তারপর উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করে বললাম আপনারা সাক্ষী। থাকুন, আমি আমার কর্তব্য পালনে অক্ষম বলে পদত্যাগ করছি। উজির আমাকে লক্ষ্য করে কথা বলতে লাগলেন। আমি মঞ্চের উপর উঠে তার সামনে গিয়ে বসলাম এবং অনমনীয় মনোভাব নিয়ে তাঁর কথার উত্তর দিতে লাগলাম। ঠিক এমনি সময়ে মোয়াজ্জিন মাগরিবের নামাজের আজান দিয়ে উঠলেন আর উজিরও উঠে প্রাসাদের ভেতর চলে গেলেন। যেতে যেতে বললেন, সবাই বলে আমি সুলতান। এ লোকটিকে ডেকে আনলাম আমার রাগ দেখাতে অথচ সেই আমাকে তার রাগ দেখাচ্ছে। আমি সেখানে যে সম্মান পেয়েছি তা শুধু ভারতের সুলতানের জন্য। কারণ তিনি আমাকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন তা তারা জানতো। তারা যদিও অনেক দূরে বাস করতো তবু তাদের মনে সুলতানের ভয় কম ছিলো না।
উজির প্রাসাদে প্রবেশ করেই পদচ্যুত আগের কাজীকে ডেকে পাঠালেন। এ লোকটি ছিলেন দুর্মুখ। এসেই তিনি আমাকে বললেন আমাদের মনিব জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনি তাকে কুর্নিশ না করে এতো লোকের সামনে তার মর্যাদাহানি করলেন কেনো। আমি জবাবে বললাম, তার সঙ্গে আমার সদ্ভাব ছিলো বলেই আমি তাকে কুর্নিশ করতাম কিন্তু তার মনোভাবের পরিবর্তন দেখে আমি সে অভ্যাস ত্যাগ করেছি। মুসলমানের অভিবাদন হলো সালাম। আমি তাকে যথারীতি সালাম করেছি। উজির তাকে দিয়ে দ্বিতীয়বার আমাকে বলে পাঠালেন, আপনি শুধু চলে যেতে চাইছেন। কাজেই যাওয়ার আগে আপনার বিবিদের এবং যা যৌতুক পেয়েছেন সব ফিরিয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া দেনাও শোধ করতে হবে। আমি তাঁকে কুর্নিশ করে গৃহে ফিরে এলাম এবং সমস্ত দেনা পরিশোধ করে দিলাম। উজির এসব জানতে পেরে এবং আমি তখনও চলে যেতে চাইছি বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলেন এবং আমাকে চলে যাওয়ার যে অনুমতি দিয়েছিলেন তাও প্রত্যাখ্যান করলেন। আমি তখন প্রতিজ্ঞা করলাম যে, চলে যাওয়া ছাড়া আমার অন্য পথ নেই। আমার সবকিছু জিনিষপত্র সমুদ্রতীরে এক মসজিদে নিয়ে রাখলাম। তারপর উজিরের মন্ত্রীদের দু’জনের সঙ্গে একটা চুক্তি করা হলো। আমার এক বিবির ভগ্নীর স্বামী হলেন মা’বারের (করমল) রাজা। এ দ্বীপপুঞ্জ তার অধিকারে নিবার জন্য আমি সেখান থেকে সৈন্য নিয়ে আসবো এবং আমি এখানে তার প্রতিনিধি হয়ে থাকবো। স্থির করা হলো, আমাদের সঙ্কেত হবে সাদা নিশান। যখন তারা সাদা নিশান। দেখবেন তখন তীরে বিদ্রোহ ঘোষণা করবেন উজিরের বিরুদ্ধে। উজির আমার সম্বন্ধে যতদিন না বিরূপভাব পোষণ করেছেন ততদিন আমি নিজে কখনো এরকম প্রস্তাব করিনি। তিনি ভীত হয়ে আমার সম্বন্ধে বলতে লাগলেন, আমার জীবিত কালেই হোক বা মৃত্যুর পরেই হোক এ লোকটি একদিন ওজারত দখল করবেই করবে। তিনি সব সময়েই আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন এবং বলতেন, আমি শুনেছি আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার জন্য ভারতের সুলতান তাকে অর্থ পাঠিয়েছেন। আমি সৈন্য নিয়ে ফিরে আসবো মনে করে আমার যাওয়ার নামেই তিনি ভয় পেতেন। তাই একখানা জাহাজ ঠিকঠাক করে না দেওয়া অবধি তিনি আমাকে থেকে যেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম। তার মন্ত্রীরা এবং গণ্যমান্য লোকেরা মসজিদে এসে আমাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করলেন। আমি তাদের বললাম প্রতিজ্ঞা না করে ফেললে আমি আপনাদের সঙ্গে ফিরেই যেতাম। তারা তখন প্রস্তাব করলেন, আবার প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে আমি অন্য কোন দ্বীপে গিয়ে ফিরে আসতে পারি। তখন তাঁদের সন্তুষ্ট করতে আমি বললাম, বেশ তাই হবে। রাত্রে যখন আমার যাত্রার সময় ঘনিয়ে এলো তখন উজিরের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তিনি আমাকে আলিঙ্গন করে এভাবে কাঁদতে লাগলেন যে তার চোখের পানি আমার পায়ের উপর পড়লো। আমার বৈবাহিক আত্মীয়েরা এবং বন্ধুরা বিদ্রোহ করবে আশঙ্কায় উজীর পরের রাত্রি নিজে দ্বীপ পাহারা দিয়ে কাটালেন।
