তারও কম বেতনে কোনো গৃহে ভূত্যের কাজ করা। সে ক্ষেত্রে তাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মনিবের। তারা এ কাজকে অবমাননাকর মনে করে না। তাদের অধিকাংশ বালিকাই এ কাজ করে। কোনো ধনীলোকের গৃহে দশ থেকে বিশ জন অবধি এ রকম বালিকা দেখতে পাওয়া যায়। কোনো বালিকা একটি পাত্র ভাঙলে তার দাম তাকেই দিতে হয়। এর বাড়ির কাজ ছেড়ে সে যদি অন্য বাড়িতে যেতে চায় তবে তার নতুন মনিব পুরানো মনিবের পাওনা শোধ করে দেয়। পুরানো মনিবের দেনা শোধ করে সে। তখন নতুন মনিবের কাছে ঋণী হয়।
এ সব মেয়েদের আসল কাজ হলো নারকেলের ছোবড়ার দড়ি পাকানো। এখানকার যৌতুক খুব কম বলে এবং নারীসঙ্গ আনন্দদায়ক বলে এখানে বিয়ে করা খুবই সহজ। এখানে জাহাজ এসে পৌঁছলে খালাসীরা বিয়ে করে এবং অন্যত্র যাওয়ার প্রাক্কালে তাদের তালাক দেয়। বস্তুতঃ এ এক ধরনের সামরিক বিবাহ। এখানকার নারীরা কখনো নিজের দেশ ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজী হয় না।
এ দ্বীপপুঞ্জ সম্বন্ধে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপারে এই যে, এখানকার শাসনকর্তা খাদিজা নাম্নী একজন মহিলা। এক সময় তার পিতামহ ছিলেন শাসনকর্তা, তারপরে। ছিলেন তার পিতা। তার মৃত্যুর পরে শাসনভার ন্যস্ত হয় মহিলার ভাই শাহাবউদ্দিনের উপর। কিন্তু শাহাবউদ্দিন ছিলেন তখন নাবালক। পরে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে হত্যা করা হলে খাদিজা এবং তার কনিষ্ঠ দুটি সহোদরা ছাড়া বংশের আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না। কাজেই খাদিজাই তখন সিংহাসনের অধিকারিনী হন। খাদিজার বিয়ে হয় তাদের ইমাম জামালউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি উজিরের পদে উন্নীত হন এবং প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার অধিকারীও তিনিই হন। কিন্তু হুকুমজারী হয় খাদিজার নামে। ছুরির মত বাঁকা একটি লোহার যন্ত্রদ্বারা তালপাতার উপরে এখানে হুকুম লেখা হয়। একমাত্র কোরাণ ও ধর্মসম্বন্ধীয় পুস্তকাদি ছাড়া আর কিছুই এখানে কাগজে লেখা হয় না! যখন কোনো বিদেশী এ দ্বীপপুঞ্জে আসে এবং দরবারে যায় তখন রীতি অনুসারে তাকে দু’খানা কাপড় সঙ্গে নিতে হয়। সুলতানাকে অভিবাদন করে একখানা কাপড় সে ছুঁড়ে দেয় পরে তার স্বামী উজির জামালউদ্দিনের প্রতিও দ্রুপ করে। তার সৈন্যসংখ্যা প্রায় এক হাজার। বিদেশ থেকে তাদের বহাল করা হয়। কিছু সংখ্যক দেশী সৈনিকও অবশ্য তার আছে। প্রত্যেক দিন প্রাসাদে এসে তারা সুলতানাকে অভিবাদন করে যায়। চাউল দিয়ে তাদের মাসিক বেতন পরিশোধ করা হয়। প্রত্যেক মাসের শেষে তারা দরবারে আসে, অভিবাদন করে এবং উজিরকে বলে, “আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন ও বলবেন যে আমরা বেতনের জন্য এসেছি।” তখন তাদের বেতন দেবার হুকুম হয়। কাজী এবং অন্যান্য পদস্থ কর্মচারীরাও যাদের উজিরই বলা হয়, প্রাসাদে এসে শ্রদ্ধা জানায় এবং খোঁজারা তাদের আগমনের সংবাদ পৌঁছে দিলে তারা প্রস্থান করে। অন্য যে কোনো রাজকর্মচারীর চেয়ে সাধারণের ভেতর কাজীর সমান সবচেয়ে বেশী। কাজীর আদেশ পালন করা হয় শাসনকর্তার বা তার চেয়েও গুরুত্ব সহকারে। তিনি প্রাসাদে কাপের্ট আসন গ্রহণ করেন। প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত রীতি অনুসারে কাজী তিনটি দ্বীপের উপস্বত্ব ভোগ করবার অধিকারী। এ দ্বীপপুঞ্জে কোন কারাগার নেই। কাঠের তৈরী মাল গুদামে অপরাধীদের বন্দী করে রাখা হয়। আমাদের মরক্কো দেশে যেমন খ্রীষ্টান কয়েদীদের রাখা হয় তেমনি এখানেও প্রত্যেক কয়েদীকে এক টুকরো কাঠের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
এ দ্বীপপুঞ্জে এসে প্রথমে যে দ্বীপে আমি অবতরণ করি তার নাম কান্নালুস। সুন্দর এ দ্বীপে অনেকগুলো মসজিদ। সেখানকার একজন ধর্মপ্রাণ লোকের বাড়ীতে আমি আশ্রয় গ্রহণ করলাম। মোহাম্মদ নামক দাফারের একজন লোকের সাক্ষাৎ পেলাম এ দ্বীপে। সে বলল, মহল দ্বীপে কাজী নেই। সেখানে গিয়ে উজিরের সঙ্গে দেখা হলে তিনি আমাকে আর আসতে দেবেন না। আমার ইচ্ছা ছিল, এখান থেকে মা’বার (করমণ্ডল), সিংহল, বাংলা এবং সেখান থেকেই চীনে রওয়ানা হব। কান্নালুসে পনেরো দিন কাটাবার পর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আবার যাত্রা করলাম। পথে অপর যে কয়টি দ্বীপে যাবার সুযোগ হলো, সব জায়গায়ই আমরা যথেষ্ট সমাদর ও আতিথেয়তা পেলাম। এমনি করে দশ দিন পরে আমরা সুলতানা ও তার স্বামীর বাসস্থান মহালে পৌঁছে নোঙ্গর করলাম। এ দেশের নিয়মানুসারে বিদেশী কেউ এসে বিনা অনুমতিতে তীরে যেতে পারে না। তীরে যাবার অনুমতি পেয়ে আমি একটি মসজিদে ঢুকতে চাইলাম কিন্তু মসজিদের পরিচারক আমাকে উজিরের সঙ্গে প্রথম দেখা করা উচিৎ বলে জানালো। জাহাজের কাপ্তেনকে আগেই আমি বলে রেখেছিলাম, আমার কথা জিজ্ঞেস করলে, চিনি না’ বলতে। কারণ আমার ভয় ছিল, উজির আমার পরিচয় পেলেই আমাকে কাজীর পদে বহাল করে আটক রাখবেন। কিন্তু আমি জানতাম না যে, কে একজন যেনো আগেই আমার কথা লিখে
জানিয়েছে এবং আমি যে দিল্লীতে কাজী ছিলাম তাও বলেছে। প্রাসাদে পৌঁছে তৃতীয়। প্রবেশ পথের ধারে এক খোলা বারান্দায় এসে আমরা দাঁড়ালাম। ইয়েমেনের কাজী ঈসা এগিয়ে এসে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। আমি উজিরকে অভিবাদন জানালাম। কাপ্তেন দশ টুকরো কাপড় এনেছিলেন। এক টুকরো কাপড় ছুঁড়ে দিয়ে তিনি সুলতানকে অভিবাদন করলেন। তারপর আরেক টুকরো একই ভাবে ছুঁড়ে দিয়ে উজিরকে অভিবাদন করলেন। এভাবে সব কটি টুকরো শেষ হবার পর তাকে আমার কথা জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন আমি একে চিনি না। অতঃপর তারা আমাদের কাছে পান ও গোলাব জল নিয়ে এলো। তাদের দেশে এসব সম্মানের চিহ্ন। একটি বাড়িতে আমরা থাকবার জায়গা পেলাম। একটি খোঞ্চ ভরতি ভাতের চারপাশে থালায় মাংস, মুরগী, ঘি এবং মাছ সহ আমাদের খাবার এসে পৌঁছল। দু’দিন পরে উজির আমাকে একটি পোষাক এবং আমার ব্যয় নির্বাহের জন্য এক লাখ কড়ি পাঠালেন।
