মালদ্বীপের অধিবাসীরা সবাই ধার্মিক ও সম্মুসলমান। দ্বীপগুলো বারোটি জেলায় বিভক্ত। তার প্রত্যেকটি একজন শাসনকর্তার অধীনে। শাসনকর্তার উপাধি ‘কারদুই’। মহল নামক যে জেলার নামানুসারে এ দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ হয়েছে সেখানে সুলতানদের বাসস্থান। কোনো দ্বীপেই কোনো রকম ফসলের আবাদ নেই। একটী মাত্র জেলায় যবের মতো এক প্রকার শষ্য জন্মে। তাই আমদানী করা হয় মহলে। কবলমাস নামক এক রকম মাছ, এখানকার অধিবাসীদের খাদ্য। ছাগমাংসের গন্ধযুক্ত এ মাছ চর্বিহীন এবং দেখতে লাল। ধরার পরে মাছগুলো চার টুকরো করে কাটা হয় এবং হাল্কাভাবে রান্না করার পরে তালপাতার ঝুড়িতে করে শুকানো (Smoked) হয়। ভালভাবে শুকিয়ে নিয়ে তারা সেগুলো আহার করে। এ মাছের কিছু কিছু রপ্তানী হয় ভারত, চীন ও ইয়েমেনে। এসব দ্বীপে গাছ বলতে অধিকাংশই নারকেল গাছ। উপরোক্ত মাছের সঙ্গে নারকেল এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান খাদ্য। নারকেল গাছ এক বিচিত্র বস্তু। প্রতিমাসে একটি হিসেবে বছরে বারোটি ফলের ছড়ি এ সব গাছে বের হয়। তার ফল কতক বড়, কতক ছোট, কতক সবুজ, কতক আবার শুষ্ক। এখানকার লোকে নারকেল দিয়ে দুধ, তেল ও মধু তৈরী করে- সে কথা আগেই বলেছি। মালদ্বীপের অধিবাসীরা ইমানদার, ধার্মিক এবং সরলপ্রাণ। কিন্তু তারা শারীরিক দুর্বল এবং যুদ্ধে অপটু। প্রার্থনাই তাদের ধর্ম। একবার আমি যখন একটি চোরের হাত কেটে ফেলতে হুকুম দিয়েছিলাম, তখন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। ভারতীয় জলদস্যুরা সে দ্বীপে কখনো চড়াও করে না বা দ্বীপবাসীদের উপর অত্যাচার করে না। কারণ, তারা অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছে, কেউ সে দ্বীপের কিছুতে হস্তক্ষেপ করলে অচিরেই তার দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। এদের প্রত্যেক দ্বীপেই সুন্দর মসজিদ আছে। এখানকার লোকের অধিকাংশ বাসগৃহই কাটের তৈরী। এরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে এবং ময়লা আবর্জনা এড়িয়ে চলে। নিজেদের গাত্র পরিষ্কার রাখবার জন্য এদের অধিকাংশই দিনে দু’বার করে গোসল করে। তাছাড়া এখানে অত্যাধিক গরম এবং শরীরে ঘাম ঝরে। তারা চন্দনতৈল বা ঐ জাতীয় প্রচুর গন্ধ তৈল ব্যবহার করে। পোশাক বলতে ব্যবহার করে শুধু চাদর Aেpron)। পাজামার পরিবর্তে একখানা চাদর তারা কোমরে জড়ায়, আরেকখানা পিঠের উপর দেয় হাজীদের মতো। কেউ-কেউ পাগড়ী ব্যবহার করে। অনেকে তার পরিবর্তে শুধু একখানা রুমাল মাথায় জড়িয়ে রাখে। কোনো কাজী বা এমামের সঙ্গে দেখা হলে তারা পিঠের কাপড় সরিয়ে অনাবৃত পিঠে তাকে অনুসরণ করে তার বাড়ি অবধি গমণ করে। এখানকার উচ্চ-নীচ সবাই নগ্নপদে চলাফেরা করে। গাছের ছায়াবৃত পথঘাটগুলো তারা সর্বদাই ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার। রাখে। সে সব পথে হাঁটতে বাগানের ভেতরে হাঁটার মতোই মনে হয়। তা সত্ত্বেও প্রত্যেকেই ঘরে ঢুকবার সময় তারা পা ধুয়ে ঢোকে। ধোয়ার পানি বারান্দায় রাখাই থাকে। পা ধোয়ার পরে তা মুছবার জন্য থাকে নারিকেল পাতায় তৈরী মোট এক রকম গামছা। মসজিদে ঢুকতে হলেও একই রীতি অনুসরণ করা হয়।
আগেই উল্লেখ করেছি, এখান থেকে মাছ রপ্তানী হয়। তা ছাড়া রপ্তানী হয় নারকেল, কাপড়, সূতী পাগড়ী, বহু প্রকার পিতল নির্মিত তৈজসপত্র, কড়ি এবং নারকেলের ছোবড়া। নারকেলের উপরের অংশ এরা গর্তে জড়ো করে রাখে এবং পরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ছোবড়া বের করে। মেয়েরা পরে এগুলো দিয়ে দড়ি তৈরী করে। সে সব দড়ির সাহায্যে জাহাজের তক্তা বেঁধে জোড়া লাগানো হয়। সে সব দড়ি ভারত, চীন ও ইয়েমেনে রপ্তানী হয়। এগুলো শনের দড়ি থেকে উত্তম। ভারতীয় ও ইয়েমেনের জাহাজ নারকেলের দড়ি দিয়েই বাধা হয়। কারণ ভারত মহাসাগরে পর্বতের বহু চড়া আছে। তারকাঁটা দিয়ে তৈরী জাহাজ পবর্ত চুড়ার সঙ্গে সংঘর্ষে ভেঙ্গে যায়। নারকেলের এ দড়ি দিয়ে বাঁধা জাহাজ কখনো ভেঙ্গে টুকরো-টুকরো হয় না। এ দ্বীপের বাসিন্দারা টাকা পয়সা হিসাবে কড়ি ব্যবহার করে। কড়ি সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা এক প্রকার জীব। এ গুলোকে গর্তে রেখে দিলে ভিতরের মাংস পচে যায় এবং শাদা খোলস অবশিষ্ট থাকে। কেনা-বেচায় এ সব ব্যবহৃত হয় চার লক্ষ কড়ির পরিবর্তে এক স্বর্ণ দীনার হারে। অনেক সময় এর মূল্য কমে বারো অবধি বিনিময় হার হয়। তারা বাংলার অধিবাসীদের কাছে চাউলের পরিবর্তে কড়ি বিক্রি করে। বাংলায়ও এ জিনিস অর্থ হিসাবে ব্যবহার হয়। ইয়েমেনের লোকদের পণ্যের সঙ্গেও কড়ি বিনিময় হয়। তারা খালি জাহাজ সমুদ্রে স্থির রাখবার জন্য বালি বোঝাই না-করে কড়ি বোঝাই করে নেয়। কাফ্রীদের দেশেও মুদ্রা হিসাবে কড়ি ব্যবহৃত হয়। মালি ও গওগও-তে আমি ১,১৫০ কড়ি এক স্বর্ণ-দীনারের সঙ্গে বিনিময় হতে দেখেছি।
এখানকার নারীরা, এমন কি তাদের রাণীও, হাত আবৃত রাখে না। তারা চিরুণীর সাহায্যে মাথায় চুল আঁছড়ে এক পাশে রাখে। তাদের অধিকাংশই কোমর থেকে পা অবধি একখণ্ড কাপড় ব্যবহার করে। ফলে শরীরের অন্যান্য অংশ অনাবৃত থাকে। আমি যখন এখানে কাজীর পদে কাজ করেছিলাম তখন এ রীতি তুলে দিতে চেয়েছিলাম এবং কাপড় পরতে তাদের আদেশ করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি এ ব্যাপারে কৃতকার্য হতে পারিনি। মামলার সময় কোনো মেয়ে লোকেরই অনাবৃত অবস্থায় আমার সম্মুখে হাজির হবার হুকুম ছিলো না। এ ছাড়া আমি আর কিছু করতে পারিনি। আমার কয়েকজন ক্রীতদাসী ছিলো। তারা দিল্লীর অনুকরণে কাপড় পরতো এবং মাথায় ঘোমটা দিতো। কিন্তু কাপড় পরতে তারা অভ্যস্ত ছিলো না বলে তাদের সৌন্দর্য না বাড়িয়ে বরং কিভূতকিমাকার করে তুলতো। খাস করে তাদের একটি রীতি হলো পাঁচ দীনার বা
