কাজারা নিঃসন্দেহে খাজুরাহো, ছত্তরপুরের ২৭ মাইল পূর্বে এবং পান্নার ২৫ মাইল উত্তর– পশ্চিমে-এখানে পৌঁছাবার ঘুর পথ সত্ত্বেও। ইনে বতুতা স্থানটির অবস্থানের যে বিবরণ দিয়েছেন সেটা স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহামের রিপোর্টের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। (আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব্ ইণ্ডিয়া ১৮৬২-৫, দ্বিতীয় খণ্ড, ৪১২-৪৩৯ পৃঃ)।
৬। এটা যদি মালওয়ান ধার হয়, তাহলে এ উজ্জয়িনীর পরে আসবে।
৭। দেওগিরির দূর্গ সম্বন্ধে ইণ্ডিয়ান গেজেটিয়ারে নিম্নলিখিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, “একটি মোচাকৃতি শিলার উপরে দূর্গটি নির্মিত হয়েছে- ভিত্তি থেকে ১৫০ ফিট এর উঁচু-ঢাল। যে পাহাড়ের উপর এটা অবস্থিত সেটা সমতলভূমি থেকে খাড়াভাবে ৬০০ ফিট উঁচু। মুসলিমগণ এ স্থানটি ১২৯৪ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম দখল করেন এবং সুলতান মুহাম্মদ ইব্নে তুগলক দক্ষিণ ভারত আক্রমণ চালাবার ঘাটিরূপে স্থানটির গুরুত্ব বিবেচনা করে এটাকে দৌলতাবাদ নাম দেন এবং এখানে রাজধানী স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। তার মৃত্যুর পূর্বে একজন বিদ্রোহী শাসক এ স্থানটি অধিকার করেন এবং আকবরের রাজত্বকাল পর্যন্ত এটা দিল্লীর অধীনতামুক্ত ছিল।
৮। ক্যামূবে উপসাগরের মাথায় অবস্থিত ক্যাবে এ সময়ে ভারতের অন্যতম প্রধান সমুদ্র বন্দর ছিল। উপসাগরটি পানি পড়ে ভরে যাওয়ায় এবং বন্যার আক্রমণ প্রবল হওয়ায় বন্দরটির অবনতি ঘটে এবং বর্তমানে এটা কেবল ছোট জাহাজের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
৯। কাওয়া একটি ক্ষুদ্র স্থান। ক্যামবে থেকে উপসাগরের বিপরীত দিকে অবস্থিত।
১০। কান্দাহার নিশ্চয়ই গান্ধারের আরবী রূপান্তর। মধ্যযুগে জাহাজীদের নিকট গান্দার বলে পরিচিত ছিল। এটা অবস্থিত ছিল ছোটো নদী ধান্দারের মোহনার তীরে কাওয়া থেকে দক্ষিণে অল্প দূরে।
জালানসি নামটা সম্ভবতঃ রাজপুত ঝালাস উপজাতির প্রতিরূপ। কাথিয়াওয়ার অন্তর্গত ঝালাওয়ার কিম্বা গোহেলওয়ার নামে এটা এখনো রক্ষিত হয়ে আসছে।
১১। ক্যাবে উপসাগরের মুখের নিকট ক্ষুদ্র দ্বীপ-এ সময়ের কিছু পূর্বে পর্যন্ত এটা ছিল সমুদ্র-দস্যুদের ঘাঁটি যখন মুসলিমগণ এটা অধিকার করেন এবং ছেড়ে চলে যান।
১২। স্যাণ্ডাবুর কিম্বা সিণ্ডাবুর নামে দ্বীপটি এবং গোয়া উপসাগর প্রথম দিকে মুসলিম সওদাগরদের নিকট পরিচিত ছিল এবং ইউরোপীয় সওদাগরগণ এটা তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিল। মোল শতাব্দীর আগে পর্যন্ত পুরাতন নাম গোয়া প্রচলিত হয় নাই। প্রথম মুসলিমগণ এটা দখল করেন ১৩১২ খ্রীষ্টাব্দে এবং পরবর্তীকালে এটা একাধিকবার এবং পুনঃ অধিকার করেছেন।
১৩। এ সব মধ্যযুগীয় বন্দরের অনেকগুলি অস্তিত্বই এখন আর বর্তমান নেই। এ সম্বন্ধে ইউল তার ক্যাথে, ৪র্থ খণ্ড, ৭২-৭৯ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন।
১৪। এই ইলি বা এলি রাজত্ব মাউন্ট ডেলীতে তার চিহ্ন রেখে গিয়েছে। মধ্যযুগীয় বন্দরটি সম্ভবতঃ এখন নিলেশ্বর গ্রামের দ্বারা প্রদর্শিত হচ্ছে। শৈলাস্তরীণ থেকে এটা কিছু মাইল উত্তর।
১৫। কালিকুটনে ইব্নে বতুতা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সমুদ্র বন্দরের পর্যায়ভূক্ত করেছেন। ষোলো শতাব্দীতে পর্তুগীজ বাণিজ্য ঘাঁটি স্থাপিত হওয়ার পর বন্দরটির দ্রুত অবনতি ঘটে। এখানকার শাসকের পদবিকে ইব্নে বতুতা সামারি বলেছেন (এটা মুসলিম কর্ণে বিদেশী নামে যোগ্য রূপান্তর। সামারিটানদের কাল্পনিক পূর্ব পুরুষরূপে ধর্মতান্ত্রিকদের কাছে সামারি নামটি পরিচিত)। সামারি হচ্ছে মালয়ালাম শব্দ সাটিরি বা সামারি মানে “সমুদ্র রাজা”। ইউরোপীয় পাঠকদের কাছে এর পর্তুগীজ রূপান্তর জ্যামূরিণ অধিক পরিচিত।
১৬। এ সবের উদ্দেশ্য ছিল শান্ত আবহাওয়ায় গুন টেনে নৌকা চালানো। এ কথা ইনে বতুতা নিম্নে বর্ণনা করেছেন।
১৭। কালিকুট এবং কুইলনের মাঝখানের দুরত্বের যদিও কিছুটা অংশ আভ্যন্তরিক জলপথে ভেদ করা যায় তথাপি সমস্ত পথ জলপথে যাওয়া যায় বলে মনে হয় না। এখানে ইব্নে। বতুতা তার চীন ভ্রমণ বৃত্তান্তের ন্যায় স্থলপথের বিবরণ অবহেলা করেছেন।
১৮। কুইলনকে ইব্নে বতুতা কালিকুটের পর্যায়ভুক্ত করেছেন। এটা অনেক আগে থেকে চীন বাণিজ্যের মাল প্রেরণের বন্দর ছিল। নবম শতাব্দীর আরব এবং পার্শিয়ান জাহাজীগণ এটা কালাম-মালয় বলতো। এর প্রতিযোগী কালিকুটের ন্যায় এ বন্দরটিরও অবনতি ঘটে যোব শতাব্দীতে। ইউল বলছেন ইব্নে বতুতা বর্ণিত এর শাসকদের তিরাওয়ারী পদবী তামিল সংস্কৃতের মিশ্রন তিৰু-পাতি “পবিত্র দেবতা” হয়ে থাকবে। (ক্যাথে, চতুর্থ খণ্ড, ৪০)।
১৯। “ইব্নে বতুতা সব সময় বিড়ম্বিত হয়েছে-এটা তারই লক্ষণ।” (ইউল)।
২০। শালিয়াত হচ্ছে পর্তুগীজ চিলিয়েত বা চেলি, এখন ভেপুর কালিকুটের সাড়ে ছ’মাইল দক্ষিণে। এখানে সে সব বস্ত্র তৈরী হতো সেগুলি ছিল বিভিন্ন রকমের- এখনো নরম সৃতিবস্ত্রকে পালী বলা হয়। সেটা সম্ভব যে এই শহরের নাম এসেছে ফ্রেঞ্চ চেলী থেকে-এবং এর থেকে উদ্ভব হয়েছে আমাদের শাল শব্দটি।
০৮. চলে এলাম কালিকট
আট
সান্দাবুরের যে বিধর্মী সুলতানকে পরাজিত করে আমরা শহরটি দখল করেছিলাম তিনি সে শহর পুনর্দখলের জন্য অগ্রসর হলেন। বিধর্মীরা সবাই পালিয়ে গিয়ে তাঁর দলে যোগ দিলো। আমাদের সৈন্যদের থাকতে দেওয়া হয়েছিলো আশেপাশের গ্রামগুলোতে। তারাও আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। বিধর্মীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে আমরা মহাবিপদে পড়লাম। দুরবস্থা যখন চরমে পৌচেছে তখন আমি অবরুদ্ধ শহর ছেড়ে চলে এলাম কালিকট। কালিকটে এসে দিবাত-আল-মহল (মালদ্বীপ) সফরে যাবো স্থির করলাম। মালদ্বীপ থেকে জাহাজে উঠে দশ দিনের পরে আমরা মালদ্বীপ নামক দ্বীপপুঞ্জে এসে পৌঁছলাম। পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য এই দ্বীপপুঞ্জে দ্বীপের সংখ্যা হবে প্রায় দু’হাজার। একশ’ বা তার কম সংখ্যক দ্বীপ নিয়ে একটি বৃত্ত তৈরী হয়েছে। এ বৃত্তে প্রবেশের একটি করে পথ বা প্রবেশ দ্বার এবং শুধু দ্বার দিয়ে জাহাজ দ্বীপে গিয়ে পৌঁছলে সেখান থেকে একজনকে তুলে নিতে হয় অন্য দ্বীপে যাবার পথ দেখাবার জন্য। দ্বীপগুলো এতো কাছাকাছি অবস্থিত যে একটি দ্বীপ ছাড়লেই অন্য দ্বীপের তাল গাছের ডগার নজরে পড়ে। যদি কোনো জাহাজ পথ হারায় তবে আর দ্বীপে পৌঁছতে পারে না। বায়ু স্রোত সে জাহাজকে করমণ্ডল উপকুলে বা সিংহলে নিয়ে ঠেকায়।
