প্রথমে আমি মনে করেছিলাম, কালাম থেকে সুলতানের কাছে ফিরে গিয়ে উপহার-সম্ভারের দুর্দশার কথা তাকে বলবো। কিন্তু পরে ভয় হলো, আমি যা করেছি তারজন্য তিনি আমাকেই দোষী করবেন বলে। তিনি হয়তো জিজ্ঞেস করবেন, আমি নিজে তার উপহার দ্রব্যের সঙ্গে রইনি কেননা। অবশেষে আমি স্থির করলাম, হিনাওরের সুলতান জামালউদ্দিনের কাছে যাবো এবং কাকামের খবর না পাওয়া অবধি সেখানেই কাটাবো। কাজেই আমি কালিকটে ফিরে এলাম এবং সেখানে এসে ভারত সুলতানের। একখানা জাহাজ পেয়ে তাতে চড়ে বসলাম। তখন সমুদ্রযাত্রার উপযোগী সময় শেষ হয়ে এসেছে। আমরা তখন দিনের প্রথমভাগ জাহাজ চালিয়ে পরের দিন অবধি নোঙ্গর করে কাটাতাম। পথে একে-একে চারটি যুদ্ধ জাহাজের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের কোনো অনিষ্ট করেনি। আমি হিনাওরে পৌঁছে সুলতানকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে বাসস্থান দিলেন কিন্তু কোনো ভৃত্য সেখানে ছিলো না। তিনি আমাকে তার সঙ্গে নামাজ পড়তে বললেন। আমি অধিকাংশ সময় মসজিদে১৯ কাটাতাম প্রত্যহ কোরাণ শরিফ পাঠ করে। পরে দিনে দুবারও কোরাণ পাঠ করেছি।
সুলতান জামালউদ্দিন তখন সান্দাবুর গোয়া) অভিযানের জন্য বাহান্নখানা জাহাজ সজ্জিত করেছিলেন। সেখানকার সুলতান ও তাঁর পুত্রের মধ্যে বিবাদ আরম্ভ হয়। পুত্র সুলতান জামালউদ্দিনের পত্র লিখেন সান্দাবুর অভিযানের জন্য। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, সান্দাবুর অভিযান করলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন এবং জামালউদ্দিনের কন্যার পাণিগ্রহণ করবেন। জাহাজগুলো যখন যাত্রার জন্য তৈরী হয়েছে তখন আমারও এ জেহাদে যোগদানের ইচ্ছা হলো। কাজেই, কোনো দৈববাণী পাবার জন্য আমি কোরাণ খুলে প্রথমেই একটি পৃষ্ঠার মাথায় পেলাম, খোদার পথে যারা থাকে খোদা তাদের। সহায়তা করেন। এটি একটি উত্তম ভবিষ্যৎবাণী বলে আমার বিশ্বাস হলো। বিকালে সুলতান নামাজ পড়তে এলে বললাম, আমিও অভিযানে যোগ দিতে ইচ্ছা করি। তিনি বললেন, তাহলে তোমাকে তাদের অধিনায়ক করা হবে। আমি তখন আমার কোরাণের দৈববাণীর কথা তাঁকে খুলে বললাম। তিনি তাতে এতো খুশী হলেন যে, নিজেও অভিযানের সঙ্গে যেতে তৈরী হলেন, যদিও এর আগে তিনি যেতে নারাজ ছিলেন। এক শনিবার তিনি একটি জাহাজে গিয়ে উঠলেন। আমি তার সঙ্গেই রইলাম। সোমবার বিকালে আমরা সান্দাবুর পৌঁছি। সেখানকার অধিবাসীরা যুদ্ধের জন্য তৈরীই ছিলো। কাজেই, ভোরের দিকে আমাদের জাহাজ তাদের দিকে অগ্রসর হতেই তারা জাহাজ। লক্ষ্য করে কামানের সাহায্যে পাথর ছুঁড়তে লাগলো। জাহাজে যারা ছিলো তারা তখন। ঢাল ও তলোয়ার হাতে নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমিও তাদের সঙ্গেই ঝাঁপ দিলাম। খোদা মুসলমানদের বিজয়ী করলেন। আমরা তরবারী হস্তে শহরে প্রবেশ করলাম। অধিবাসীদের বেশীর ভাগ তখন তাদের সুলতানের প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলো। কিন্তু আমরা যখন প্রাসাদ লক্ষ্য করে অগ্নি নিক্ষেপ করলাম তখন তারা বেরিয়ে আসতে লাগলো। এসে আমাদের হাতে ধরা দিলো। অতঃপর সুলতান তাদের মুক্তি। দিলেন এবং তাদের স্ত্রীপুত্রদের তাদের সঙ্গে মিলতে দিলেন। তারা সংখ্যায় ছিলো প্রায় দশ হাজার। সুলতান শহরের একটি উপকণ্ঠে তাদের বাসস্থান করে দিলেন এবং নিজে গিয়ে প্রাসাদ দখল করলেন। তার সভাসদরা রইলেন প্রাসাদের চারদিক ঘিরে।
শহর অধিকারের পর তিন মাস সান্দাবুরে কাটিয়ে আমি পুনরায় আমার যাত্রা শুরু করবার অনুমতি চাইলাম সুলতানের কাছে। তিনি তখন পুনরায় তার কাছে যাবার জন্য। আমাকে ওয়াদা করালেন। কাজেই আমি প্রথমে হিনাওর এলাম। সেখানে থেকে মাঞ্জারুর ও আগের মতোই অন্যান্য শহর হয়ে কালিকটে পৌঁছলাম। কালিকট থেকে গেলাম সুদৃশ্য শহর আস-সালিয়াটে। এখানে আস-সালিয়াট নামে পরিচিত একরকম কাপড় তৈরী২০ হয়। বহুদিন এ শহরে কাটিয়ে আবার আমি কালিকটে ফিরে এলাম। তখন আমার দু’জন ক্রীতদাস ফিরে আসে। তারাও আমার কাকামে ছিলো। তাদের কাছে জানতে পারলাম, সুমাত্রার শাসনকর্তা আমার ক্রীতদাসী বালিকাদের নিয়ে গেছেন। জিনিষপত্রও নানাজনে আত্মসাৎ করেছে এবং সঙ্গীরা চীন, সুমাত্রা ও বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কথা শুনে আমি হিনাওর ও সান্দাবুরে ফিরে এলাম পাঁচ মাস বাইরে থেকে। সেখানে তিন মাস কাটালাম।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ৭
১। ইউল বলেছেন এটা রোহিলাখণ্ডের সামবাল-দিল্লী আশী মাইল খানিক পূর্বে অবস্থিত (ক্যাথে, ৪র্থ খণ্ড, ১৮)।
২। জালালী একটি ক্ষুদ্র স্থান-আলিগড়ের ১১ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। দিল্লীর একশত মাইলের মধ্যে দেশের অবস্থা এতখানি অরাজক ছিল যাতে করে সুলতান মুহাম্মদের সাম্রাজ্যের চেহারাটা বেশ বোঝা যায়।
৩। মাওরি সম্ভবতঃ ভিরে নিকটবর্তী উমরী। মার জায়গাটা অজ্ঞাত। কিন্তু গোয়ালিয়রের পূর্বে অবস্থিত।
৪।গোয়ালিয়রের দক্ষিণ-পূর্বে কিছু মাইল দূরে আলাপুরের একটি গ্রাম রয়েছে। জাবিল সম্ভবতঃ ঢোলপুরের রাজা বিধর্মী সুলতান এবং চাষাল নদীর মতো একই নাম।
৫। পারওয়ান নিশ্চিতরূপেই গোয়ালিয়র রাজ্যের নারওয়ার (ইব্নে বতুতা অন্য জায়গার। ন্যায় এখানেও একটি অজানা নামকে অধিক পরিচিত নামে অভিহিত করছেন, যথা আফগানিস্তানের পারওয়ান)-ইণ্ডিয়ান গেজেট অনুসারে এটা এক কালে দিল্পী এবং দাক্ষিণ্যাতের মাঝখানে পথের উপর একটি বর্ধিষ্ণু শহর ছিল।” আধুনিক মানচিত্রে পারওয়াই নামে একটি স্থান দেখা যায়। স্থানটি নারওয়ার ২৫ মাইল উত্তর-পূর্বে, এবং গোয়ালিয়রের ৩০ মাইল দক্ষিণে।
