তিনি বললেন, চীনের সওদাগররা সবগুলো কেবিন তাদের আসা ও যাবার জন্য ভাড়া করে রেখেছে। আমার জামাইয়ের একটি কেবিন আছে। সেটা আমি আপনাকে দিতে পারি কিন্তু সে কেবিনটির স্নানাগার নাই। সম্ভবত আপনি সেটা অন্য কোনো। কেবিনের সঙ্গে বদলী করে নিতে পারবেন।
আমি তখন আমার সঙ্গীদের মালপত্র জাহাজে উঠাতে বললাম। নারী পুরুষ। নির্বিশেষে ক্রীতদাসরাও জাহাজে গিয়ে উঠলো। সেটা ছিল বৃহস্পতিবার। কাজেই, আমি একদিন তীরেই রয়ে গেলাম পরের দিন জুমার নামাজে যোগ দেবে বলে। রাজা সাবুল ও জহিরউদ্দিন তাদের উপহার-সামগ্রীসহ জাহাজে উঠে বললো, যে কেবিন আমরা পেয়েছি সেটি ছোট এবং অনুপযোগী। আমি ক্যাপ্টেনের কাছে সে কথা বলায়, তিনি বললেন, এর কোনো প্রতিকারে, উপায় নেই। কিন্তু আপনি যদি কাকামে যেতে রাজী থাকেন তবে সেখানে আপনার পছন্দ মতো কেবিন পাওয়া যাবে। আমি তাতেই। রাজী হয়ে সঙ্গীদের মাল-পত্র ও ক্রীতদাস দাসীদের সহ কাকামে উঠতে বললাম। জুমার নামাজের আগেই আমাদের ওঠার কাজ শেষ হলো। এ সমুদ্রে একটা বিশেষ লক্ষণ হলো, প্রতিদিন বিকালেই ঝড় উঠবে। তখন কেউ জাহাজে উঠতে পারে না। জাঙ্কগুলো আগেই পাল তুলে রওয়ানা হয়েছে। শুধু দু’খানা জাঙ্ক তখনও রওয়ানা হয়নি। তার একখানায় ছিলো উপহার সামগ্রী আরেক বানার মালীক শীতকালটা ফান্দারায়নায় কাটাবে স্থির করেছে। এ ছাড়া ছিল কাকাম, যার কথা আগেই বলেছি। শুক্রবারের রাত। আমরা তীরেই কাটালাম। ঝড়ের জন্য আমরাও জাহাজে উঠতে পারিনি, জাহাজে যারা ছিলো তারাও নেমে এসে আমাদের সঙ্গে মিলতে পারেনি। একটি কার্পেট ছাড়া শুয়ে ঘুমাবার উপযোগী আর কিছুই আমার সঙ্গে ছিলো না। শনিবার ভোরে জাঙ্ক ও কাকাম। দু’টোই তীর থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। যে জাঙ্ক খানার ফান্দারায়না যাবার কথা। সেখানাও ডাঙ্গায় উঠে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। যারা জাঙ্কে ছিলো তাদের। অনেকে ডুবে মরেছে অনেকে অবশ্যি জীবন রক্ষা করেছে। সেই রাত্রেই সুলতানের উপহার দ্রব্যবাহী জাহাজ বানারও একই দুদর্শা ঘটলো এবং যারা আরোহী ছিলো তারা ডুবে মারা গেলো। পরের দিন ভোরে আমরা সানুবল ও জহিরউদ্দিনের লাশ পেলাম। যথারীতি জানাজা পড়ে আমরা তাদের সমাহিত করলাম। আমি কালিকটের বিধর্মী সুলতানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তখন প্রকাণ্ড একটা সাদা কাপড় কোমরে জড়িয়ে ছোট পাগড়ী মাথায় দিয়ে খালি পায়ে সমুদ্রের পাড়ে ছিলেন। একজন ক্রীতদাস তার। মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার সামনে আগুন জ্বেলে রাখা হয়েছে। সমুদ্র থেকে ঝড়ে যেসব জিনিষপত্র ডাঙ্গায় উঠেছে বহু লোকজন তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। সুলতানের পুলিশ তাদের মেরে তাড়াবার চেষ্টা করছিল। শুধু এখানে ছাড়া মালাবারের সর্বত্র ঝড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের মালামাল সরকারী খাজাঞ্চীতে জমা হয়। কিন্তু কালিকটে মালীকেরাই মালামালের অধিকারি হয়। এ জন্যই কালিকট একটি সমৃদ্ধিশালী শহরে পরিণত হয়েছে এবং অনেক ব্যবসায়ীকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। জাঙ্কের কি। দুরবস্থা হয়েছে তা দেখতে পেয়ে কাকামে যারা ছিলো তারা পাল তুলে কাকাম নিয়ে রওয়ানা হয়ে চলে গেল। তার ফলে আমার জিনিষ পত্রসহ ক্রীতদাস দাসীও সেই সঙ্গে নিয়ে গেলো। শুধু একলা আমি সমুদ্রোপূকলে পড়ে রইলাম আজাদীপ্রাপ্ত আমার একজন ক্রীতদাসকে সঙ্গে নিয়ে। অবশেষে আমার এ অবস্থা দেখে সেও আমাকে ত্যাগ করে। গেলো। তখন আমার কাছে সম্বল মাত্র দশটি দীনার আর যে কার্পেটে ঘুমিয়ে ছিলাম সেটি।
আমি শুনেছিলাম, কাউলামে গিয়ে কাকাম ভিড়বে। কাজেই সেখানে যাবো বলে স্থির করলাম। সেখানে যেতে হেঁটে বা নদীপথে দশদিন লাগে। আমি নদীপথেই রওয়ানা হয়ে একজন মুসলমানকে ভার দিলাম আমার কার্পেটটি বয়ে নিতে। সেখানে নিয়ম হলো, বিকালে জাহাজ থেকে নেমে তীরবর্তী গ্রামে রাত কাটাতে হয়, ভোরে এসে আবার উঠতে হয় জাহাজে। আমরাও তাই করেছি। কার্পেট বহনের জন্য যে লোকটিকে আমি নিয়োগ করেছিলাম, সে ছাড়া জাহাজে আর কোনো মুসলমান নেই। আমরা যখন তীরে যেতাম তখন সে লোকটি বিধর্মীদের সঙ্গে মিশে মদ্যপান করতো এবং চেঁচামেচি করে আমাকে বিরক্ত করতো। তার ফলে আমার দুর্দশা চরমে উঠলো। আমাদের যাত্রার পঞ্চম দিনে আমরা একটি পাহাড়ের উপর কুঞ্জকারী নামক স্থানে পৌঁছলাম। এখানে য়িহুদিরা বাস করে। তাদের শাসনকর্তা নিজেদের মধ্যকার একজন যিহুদী। শুধু কাওলামের সুলতানকে তাদের কর দিতে হয়। এ নদীর তীরের সব গাছই দারুচিনির আর ব্রেজিল নামক রং তৈরীর গাছ। তারা সে সব গাছ জ্বালানী কাঠরূপে ব্যবহার করে। আমরাও রান্নার কাজে এ কাঠই ব্যবহার করেছি। দশম দিনে আমরা। এসে কাওলামে পৌঁছলাম। কালাম মালাবার১৮ অঞ্চলের একটি সুন্দর শহর। চমৎকার বাজার আছে এখানে। ব্যবসায়ীদের এখানে বলা হয় সুলি। তারা অত্যন্ত ধনবান। একজন ব্যবসায়ীই একটা জাহাজ মালপত্রসহ কিনে নিজের ঘরের মৌজুদ মাল দিয়ে বোঝাই করতে পারে। এখানে মুসলমান ব্যবসায়ীদের একটি উপনিবেশ আছে। খাজা মুহাজ্জাব নামক একজন ব্যবসায়ীর দ্বারা তৈরী প্রধান মসজিদটি অতি সুন্দর। মালাবারের এ শহরটি চীন থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী। এখানেই চীনের অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা এসে হাজির হয়। এ শহরে মুসলমানদের যথেষ্ট সমাদর ও সম্মান আছে। কাওলামের সুলতান তিরাওয়ারী নামক একজন বিধর্মী। তিনি মুসলমানদের সম্মান করেন। চোর ও বদমায়েসদের বিরুদ্ধে তাঁর আইন খুব কঠোর। আমি কিছুদিন কালামের এক মুসাফেরখানায় কাটালাম, কিন্তু আমার কাকমের কোনো সন্ধান পেলাম না। আমি সেখানে থাকাকালেই চীনের রাজদূতেরাও আসেন। যে সব জাহাজ ধ্বংস হয়েছে তার একটিতে তারাও ছিলেন। চীনের ব্যবসায়ীরা তাদের জামা কাপড় দান করেন এবং তারা চীনে ফিরে যান। পরে চীনে এদের সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়।
