মাঞ্জারে তিন দিন কাটিয়ে আমরা আবার পাল তুলে দিলাম হিলি১৪ যাবার উদ্দেশ্যে। দু’দিন লাগলো হিলি পৌঁছতে। বড় বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী একটি প্রশস্ত খাড়ির পাড়ে এ শহরটি। চীন থেকে যে সব বন্দরে জাহাজ আসে তার ভেতর এ শহরটিই সবচেয়ে বেশী দূরে। চীনের জাহাজ শুধু এ বন্দরে, কাওলামে এবং কালিকটে আসে। এখানকার প্রধান মসজিদটির জন্য মুসলিম ও বিধর্মী সবাই এ শহরটিকে একটু শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং সমুদ্রগামীরা মসজিদের নামে বহু মানত করে। এ মসজিদে কিছু সংখ্যক ছাত্র বাস করে। তারা মসজিদের আয় থেকে বৃত্তি পেয়ে থাকে। এ ছাড়া মসজিদের একটি লঙ্গরখানা থেকে মুসাফের এবং গরীব মুসলমানদের আহার্য দেওয়া হয়। সেখান থেকে জারফাটান (Cannanore) দাহফাট্টান এবং বাদফাট্টান যাই। এ শহর ক’টির সুলতানকে কুওয়াল (Kuwal) বলা হয়। তিনি মালাবারের শক্তিশালী সুলতানদের অন্যতম। দাহ্ফাটানে কুওয়ালের পিতামহ কর্তৃক নির্মিত একটি bain ও একটি প্রসিদ্ধ মসজিদ আছে। কুয়ালের পিতামহ ইসলামে দীক্ষাগ্রহণ করে মুসলমান। হন। বাদফাটানের অধিবাসীদের অধিকাংশই ব্রাহ্মণ। বিধর্মীরা তাদের শ্রদ্ধা করে। ব্রাহ্মণরা মুসলমানদের ঘৃণা করে। সে কারণে এদের মধ্যে কোনো মুসলমান বসবাস করে না। বাদফাঠান থেকে জাহাজ ছেড়ে আমরা ফান্দারায়না (পারোনি) পৌঁছি। পারোনি বাজার ও ফলের বাগান সমৃদ্ধ একটি বড় শহর। এ শহরে তিন-চতুর্থাংশ মুসলমানরা দখল করেছে। প্রত্যেক অংশেই একটি করে মসজিদ আছে। এ বন্দরে এসেই চীন দেশী জাহাজ শীতকাল কাটায়। এখান থেকে আমরা মালাবারের অন্যতম। প্রসিদ্ধ বন্দর কালিকটে পৌঁছলাম। এখানকার পোতাশ্রয়টি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পোতাশ্রয়। সূদুর চীন, সুমাত্রা, সিংহল, মালদ্বীপ, ইয়েমেন ও ফার্স থেকে লোকজন এখানে যাতায়াত করে এবং নানা দিক থেকে সওদাগরেরা এখানে১৫ আসে।
কালিকটের সুলতান একজন বিধর্মী। তাকে বলা হয় “সামারী”। কোনো কোনো গ্রীকদের মতোই তিনি মুণ্ডিত একজন বৃদ্ধ। এ শহরেও মিদকাল নামক প্রসিদ্ধ একজন জাহাজের মালিক বাস করে। তার অনেক ধনরত্ন ও ভারত, চীন, ইয়েমেন ও ফার্সের সঙ্গে বাণিজ্য করবার জন্য অনেক জাহাজ রয়েছে। আমরা শহরে গিয়ে পৌঁছলে প্রধান প্রধান অধিবাসীরা ও সওদাগরেরা এবং সুলতানের প্রতিনিধিরা আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এলেন। তাদের সঙ্গে ছিল জয়ঢাক, শিঙ্গা, বিউগল এবং জাহাজের মাথায় পতাকা। অপূর্ব জাকজমক সহকারে আমরা পোতাশ্রয়ে প্রবেশ করি। এ রকম জাঁকজমক এসব দেশের কোথাও দেখিনি। দুঃখ কষ্টের আগে এ জাঁকজমক আমাদের জন্য আনন্দদায়ক হয়েছে। আমরা কালিকট বন্দরে নোঙ্গর করে তীরে গেলাম। বন্দরে তখন তেরো খানা চীন দেশীয় জাহাজ নোঙ্গর করে আছে। আমাদের প্রত্যেককে একটি করে ঘর দেওয়া হলো থাকবার জন্য। চীন যাত্রার অনুকুল আবহাওয়ার অপেক্ষায়। আমরা সেখানে তিন মাস কাটালাম বিধর্মী সুলতানের মেহমান হিসাবে। চীন সমুদ্রে শুধু চীন দেশীয় জাহাজেই যাতায়াত সম্ভব। সে জন্য এখানে তাদের বর্ণনা দিচ্ছি।
চীনের জাহাজ তিন প্রকার। বড় জাহাজগুলোকে বলা হয় চঞ্চ, মাঝারী আকারের গুলো জাও (Dhows) আর ছোট গুলো কাকাম। বড় জাহাজে তিন থেকে বারোখানা অবধি পাল খাটান হয়। পাল তৈরী করা হয় বাঁশের চাটাই দিয়ে। সেগুলো কখনো নামিয়ে রাখা হয় না, বাতাসের গতি দেখে শুধু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজ যখন নোঙ্গর করা থাকে তখনও পালগুলো খাটানো থাকে। একটি জাহাজে লোকলস্করের সংখ্যা থাকে হাজার। তাদের ছ’শ নাবিক আর বাকি সবাই সৈনিক। সৈনিকদের মধ্যে আছে তীরন্দাজ, ঢালধারী এবং তরল ধাতু নিক্ষেপকারী। প্রতিটি বড় জাহাজের সঙ্গে তিনটি ছোট জাহাজও থাকতো। তাদের একটি ‘অর্ধেকআরেকটি ‘এক-তৃতীয়াংশ অন্যটি এক-চতুর্থাংশ’১৬। এ সব জাহাজ তৈরী করা হতো শুধু জইতুন ও সিংকালান (ক্যান্টন) শহরে। জাহাজগুলো চারতলা বিশিষ্ট। তাতে রয়েছে কামরা, কেবিন, সওদাগরদের জন্য সেলুন। কেবিনেও খাস-কামরা, ও স্নানাগার রয়েছে। কেবিনের অধিকারী নিজের কেবিন তালাবদ্ধ করে রাখতে পারে। অনেক সময়। তারা ক্রীতদাসী অথবা নিজের স্ত্রী সঙ্গে রাখে। অনেক সময় এক-এক কেবিনের অধিবাসী হয়তো কোনো বন্দরে না পৌঁছা পর্যন্ত জাহাজের অপর যাত্রীদের কাছে অপরিচিতই থেকে যায়। নাবিকদের ছেলেমেয়েরা চৌবাচ্চায় তরি-তরকারী শাকশজী ফলায়। জাহাজে মালীকের প্রতিনিধির মর্যাদা একজন বড় আমীরের মতো। তিনি যখন তীরে যান, তার আগে-আগে যায় তীরন্দাজরা আর বর্শা, তলোয়ার, ঢাক, শিঙ্গা প্রভৃতিসহ আবিসিনিয়ার ভৃত্যেরা। তার গন্তব্য স্থানে যাবার পর সঙ্গীরা দরজার দু’পাশে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। যতক্ষণ তিনি সেখানে অবস্থান করেন ততক্ষণ এরাও একই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে। চীনের কোনো-কোনো লোক একাই অনেকগুলো জাহাজের। মালীক। সে সব জাহাজ প্রতিনিধিদের দ্বারা বিদেশে পাঠানো হয়। চীনদের মতো ধনীলোক দুনিয়ার আর কোথাও নেই।
চীন যাত্রার অনুকুল মৌসুম যখন শুরু হলো, সুলতান সামারী কালিকট বন্দরের তেরখানা জাহাজের একটিকে আমাদের যাত্রার উপযোগী করে তুললেন। সে জাহাজ বা জাঙ্কে যিনি মালীকের প্রতিনিধি তার নাম সুলেমান। তিনি সিরিয়ার (প্যালেষ্টাইন) অন্তর্গত সাফাঁদের অধিবাসী। আমি আগে থেকেই তাকে চিনতাম। তাই তাকে বললাম আমি আমার ক্রীতদাসী বালিকাদের জন্য নিজে একটি কেবিন চাই, কারণ তাদের সঙ্গে না-নিয়ে আমি কখনো সফরে বের হই না।
