তিনদিন পর আমরা মরিচের দেশ মালাবারে পৌঁছলাম। এ দেশটি সানদাবুর (Goa) থেকে কাউলাম (ত্রিভাঙ্কুরের কুইলন) অবধি উপকুলে বিস্তৃত দু’মাসের পথ। সারাটা পথই গাছের ছায়ায় ঢাকা। প্রত্যেক আধ-মাইল অন্তর একটি করে কাঠের নির্মিত ঘরে মুসলমান বা অমুসলমান নির্বিশেষে বসবার জন্য বেঞ্চ পাতা আছে। প্রত্যেক ঘরেই একটি করে পানির কুপ এবং একজন অমুসলমান পরিচারক রয়েছে। পথিক যদি অমুসলমান হয় তবে সে তাকে পাত্রে ঢেলে পানি দেয় কিন্তু মুসলমান পথিক। হলে তার অঞ্জলি ভরে পানি দেয়। যে পর্যন্ত তাকে থামতে না বলা হয় সে পর্যন্ত সে অঞ্জলিতে পানি ঢালতে থাকে। মালাবারের বিধর্মী বা অমুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত। রীতি এই যে, কোনো মুসলমান তাদের গৃহে প্রবেশ করতে পারবে না অথবা তাদের পাত্র হতে আহার করতে পারবে না। যদি কোনো মুসলমান তা করে তবে সে পাত্র তারা। ভেঙ্গে ফেলে অথবা সেই মুসলমানকে দিয়ে দেয়। যেখানে অন্য কোনো মুসলমান। অধিবাসী নেই সেখানে মুসলমানকে খেতে দেওয়া হয় কলার পাতায়। এ পথের প্রত্যেক বিরতি স্থানেই মুসলমানদের ঘরবাড়ী আছে। মুসলমান পথিক সেখানে নেমে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কিনতে পারে। তাদের ঘরবাড়ী না থাকলে মুসলমানরা এ পথে সফর করতে পারতো না।
পদব্রজে যে পথ অতিক্রম করতে দু’মাস লাগে তার কোথাও এক ফুট জায়গা এখানে অনাবাদী পড়ে নেই। প্রত্যেক অধিবাসীরই নিজ-নিজ ফলের বাগান আছে। বাগানের মধ্যস্থলে কাঠের বেড়ায় ঘেরাও করা বাড়ী। বাগানের ভেতর দিয়ে পথ চলে গেছে। সে পথ বেড়ার কাছে এলেই একটি সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে হয়, আরেকটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে পরবর্তী বাগানে যেতে হয়। এখানে কেউই কোনো জানোয়ারের পিঠে আরোহণ করে না। শুধু সুলতানের নিজের ঘোড়া রয়েছে। এখানকার অধিবাসীদের প্রধান বাহন পাল্কী। ক্রীতদাস বা ভাড়া করা বাহকেরা পান্ধী কাঁধে বহন করে নিয়ে যায়। যারা পাল্কীতে উঠতে নারাজ তাদের জন্য পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোনো প্রকার বাহন নেই। মালপত্র ও পণ্যদ্রব্য ভাড়া করা লোকেরা বহন করে। একজন সওদাগর হয়তো তার মালপত্র অন্যত্র নিয়ে যেতে একশ’ বা ঐ রকম সংখ্যক লোককে ভাড়া করে। এ পথটির চেয়ে নিরাপদ পথ আমি আর কোথাও দেখিনি। কারণ, সামান্য একটি বাদাম চুরি করলেও এখানে চোরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গাছের একটি ফল পড়লে মালিক ব্যতীত তা অপর কেউ স্পর্শও করে না। বাস্তবিক পক্ষে আমরা সময়-সময় এ পথে চলতে অনেক বিধর্মীর দেখা পেয়েছি। তারা আমাদের পথ ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে মুসলমানরা অত্যন্ত সম্মানের পাত্র। শুধুমাত্র, আগেই যা। বলেছি, তারা মুসলমানদের গৃহে ঢুকতে দেয় না অথবা নিজেদের পাত্রে তাদের খেতে দেয় না। মালাবার ভূমিতে বারজন বিধর্মী সুলতান আছেন। তাদের মধ্যে কারো কারো সৈন্যবল পঞ্চাশ হাজার। আবার অনেকের মাত্র তিন হাজার সৈন্যও আছে। কিন্তু তবু তাদের ভেতরে কোন রকম গরমিল নেই এবং সবল কখনো দুর্বলের রাজ্য গ্রাস করে না। প্রত্যেক শাসনকর্তার রাজ্যের সীমান্তে একটি করে কাষ্ঠ-নির্মিত প্রবেশদ্বার আছে। সেখান থেকে কার রাজত্ব আরম্ভ সে কথা খোদাই করে প্রবেশদ্বারে লেখা আছে। একে বলা হয় অমুক রাজার নিরাপত্তার দ্বার। যদি কোনো মুসলমান বা বিধর্মী অপরাধী এক। রাজার রাজ্য থেকে অপর কোনো রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে তবে তার জীবন তখন নিরাপদ। যে রাজ্য থেকে সে পালিয়ে এসেছে সে রাজ্যের রাজা যদি পরাক্রমশালীও হন তবু তিনি আর আসামীকে ধরে নিতে পারেন না। এখানকার শাসনকর্তাগণ নিজেদের রাজ্যতার সন্তানদের না দিয়ে ভগ্নীর সন্তানদের উপর দিয়ে থাকেন। এ রীতি আমি একমাত্র আচ্ছাদিত মস্তক (veiled) মাসুকাদের ব্যতীত আর কোথাও প্রচলিত দেখিনি,তাদের বিষয়ে পরে উল্লেখ আছে।
মালাবারের যে শহরে আমরা প্রথম প্রবেশ করি তার নাম আবুসারার (বার্সেলোর)-বড় একটি জলাশয়ের পাড়ে বহু নারিকেল গাছ পরিবেষ্টিত ক্ষুদ্র একটি জায়গা। সেখান থেকে দু’দিন চলে আমরা এলাম ফাঁকানুর (বাকানর, বর্তমানে বারকার)১৩ নামে জলাশয়ের পাড়ে আরেকটি বড় শহরে।এখানে অনেক ইক্ষু পাওয়া যায়। দেশের অপর কোথাও এ জিনিসের প্রাচুর্য নেই। ফাঁকানুরের মুসলমান সমাজের প্রধান ব্যক্তিকে বলা হয় বাসাডাও (Basadaw), তার প্রায় ত্রিশটি যুদ্ধ জাহাজ আছে। তার সবগুলোই লুলা নামক একজন মুসলমানের পরিচালনাধীনে। সে একজন বোম্বেটে, দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাত। আমরা সেখানে গিয়ে নোঙ্গর করতেই সুলতান তার পুত্রকে প্রতিভূ হিসেবে আমাদের জাহাজে থাকতে পাঠালেন। আমরা তীরে নেমে তার কাছে গেলে তিনি অত্যন্ত সমাদরের সঙ্গে তিন রাত্রি অবধি আমাদের মেহমানদারী করেন। ভারতের বাদশার প্রতি সম্মানার্থে। তা ছাড়া আমাদের জাহাজের লোক-লস্করের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করে কিছু লাভবান হবার ইচ্ছাও তাঁর ছিল। তাদের একটি রীতি এই যে, শহরের পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ গেলেই সেখানে নোঙ্গর করতে হবে এবং শাসনকর্তাকে কিছু উপঢৌকন দিতে হবে। তারা একে ‘বন্দরের অধিকার’ বলে। যদি কেউ এ প্রথা অমান্য করে চলে যায় তাকে এরা তার পশ্চাদ্ধাবন করে বল প্রয়োগে তাকে ফিরিয়ে আনে এবং দ্বিগুণ কর ধার্য করে যতদিন খুশী তাকে সেখানে আটক রাখে। ফাঁকানুর ছেড়ে তিনদিন পর আমরা মাঞ্জারুর (Mangalore) পৌঁছি। আদ-দাম্ব নামক দেশের বৃহত্তম ঋড়ির পারে এ শহরটি অবস্থিত। ফার্স এবং ইয়েমেনের অধিকাংশ সওদাগর এ শহরে এসে অবতরণ করে। এখানে প্রচুর মরিচ ও আদা পাওয়া যায়। মাঞ্জারুরের শাসনকর্তা দেশের প্রসিদ্ধ শাসনকর্তাদের অন্যতম। তার নাম রামাডৌ। এখানে প্রায় চার হাজার মুসলমানের একটি উপনিবেশ আছে। শহরের একটি উপকণ্ঠে তারা বসবাস করে। অনেক সময় তাদের সঙ্গে শহরবাসীদের বিরোধ বাধে কিন্তু সুলতান তখন তাদের মধ্যে শান্তি-স্থাপন করেন, কারণ সওদাগরদের প্রয়োজনীয়তা তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। পূর্ববর্তী সুলতানের মতো এ সুলতান তাঁর পুত্রকে জাহাজে না-পাঠালে আমরা তীরে অবতরণ করতে অস্বীকার করি। অতঃপর তার পুত্রকে তিনি জাহাজে পাঠালে আমরা তীরে যাই। তিনি আমাদের বিশেষ সমাদর করেন।
