এ শহর থেকে আমরা শাখার (সগড়) এলাম। এ নামেরই (তাপ্তী) বড় একটি নদীর তীরে এ শহর। এখানকার বাসিন্দারা সৎ, ধার্মিক এবং বিশ্বস্ত।
তারপরে আমরা কিনবায়া (Cambay) শহরে এসে পৌঁছলাম। সমুদ্রের একটি অংশ নদীর মতো হয়ে এগিয়ে এসেছে। তার পরেই এ শহর। এখানে জাহাজ চলাচল করতে পারে এবং পানিতে জোয়ার ভাটা হয়। আমি নিজে দেখেছি, এখানে ভাটার সময় জাহাজ কাঁদায় ঠেকে থাকে এবং জোয়ারের সময় ভেসে যায়। এ শহরের গঠন প্রকৃতি এ মসজিদের ভাস্কর্যের জন্য এটি অন্যতম সুদৃশ্য শহর। এর কারণ, এখানকার অধিবাসীদের বেশীর ভাগই বিদেশী সওদাগর। তারা সর্বদাই চমৎকার এমারত ও সুন্দর মসজিদ তৈয়ার করে। এ কাজে তারা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এ শহর ত্যাগ করে আমরা কাওয়া এলাম। এ শহরটিও জোয়ার-ভাটা হয় এমন একটি উপসাগরের তীরে অবস্থিত। এটি জালানসি নামক বিধর্মী এক রাজার অধীনে। তার বিষয়ে পরে বলা হবে। তারপর আমরা উপসাগরের কুলে কান্দাহার নামক একটি বড় শহরে পৌঁছি। এ শহরের মালীক একজন বিধর্মী। কান্দাহারের বিধর্মী সুলতানের নামই জালানসি। তার রাজ্য মুসলিম রাজ্যেরই অন্তর্ভূক্ত বলে তিনি ভারতের বাদশাহকে প্রতি বছর উপঢৌকন১০ পাঠিয়ে থাকেন। আমরা কান্দাহার পৌঁছলে তিনি আমাদের প্রতি। সম্মান প্রদর্শন করেন এবং নিজে প্রাসাদ ছেড়ে দিয়ে আমাদের জায়গা করে দেন। খাজা বোহরার বংশধরেরা এবং তার দরবারের অন্যান্য গণমান্য মুসলমানরা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন জাহাজের মালীক ইব্রাহিম। তার দু’খানা জাহাজ ছিল।
আমরা কান্দাহারে ইব্রাহিমের আল-জাগির নামক একটি জাহাজে আরোহণ করি। সুলতানের উপহারের সত্তরটি ঘোড়াও আমরা এ জাহাজে তুলি। আমাদের সঙ্গীদের ঘোড়ার সঙ্গে বাকি ঘোড়াগুলো তোলা হয় মানুর্ত’ নামে ইব্রাহিমের এক ভাইয়ের জাহাজে। জালানসি আমাদের একখানা জাহাজ দেন। সে জাহাজে জহিরউদ্দিন সানবুল ও তাদের দলের অন্যান্যের ঘোড় তোলা হয়। তিনি এ জাহাজে আমাদের জন্য পানি ও খাদ্য এবং পশুর জন্য খাদ্য দিয়ে যান। তিনি আল-উকারি নামক আরেকটি জাহাজে তার ছেলেকেও আমাদের সঙ্গে পাঠান। এ জাহাজখানা গ্যানি নামক ছোট পোতবিশেষ। শুধু সামান্য একটু বেশী চওড়া। এ জাহাজে দাঁড়ের সংখ্যা ষাটটি। যুদ্ধের সময় তীর বা পাথর যাতে না পড়তে পারে সেজন্য দাড়ীদের উপরে ছাদ বা ছৈ লাগানো আছে। আমি উঠেছিলাম আল-জাগির নামক জাহাজে। তাতে রয়েছে পঞ্চাশ জন দাড়ী এবং পঞ্চাশ জন অস্ত্রধারী হাসী। ভারত মহাসাগরের বুকে নিরাপত্তার জন্য হাবৃসীদের ব্যবস্থা। প্রতি জাহাজে এদের একজন থাকলেই ভারতীয় বোম্বেটে বা পৌত্তলিকদের কেউ ভয়ে কাছ ঘেসবে না। দুদিন পরে আমরা বইরাম১১ দ্বীপে পৌঁছলাম। তার পরের দিন গেলাম কুকা (কার্থিওয়ারের গগা) শহরে। এ শহরে কয়েকটি প্রসিদ্ধ বাজার আছে। তখন ভাটার সময় বলে আমাদের জাহাজ তীর থেকে চার মাইল দূরে নোঙ্গর করল। কিন্তু আমি কয়েকজন সঙ্গীসহ ছোট একটি নৌকায় তীরে। গিয়ে উঠলাম। কুকার সুলতান একজন পৌত্তলিক। তার নাম- ডানকুল। তিনি ভারতের বাদশার আনুগত্য বাহ্যত স্বীকার করলেও আসলে তিনি একজন বিদ্রোহী।এ শহর থেকে জাহাজে পাল খাঁটিয়ে তৃতীয় দিনে আমরা সান্দাবুর (গোয়া)১২ পৌঁছি। এখানে ত্রিশটি গ্রাম আছে। শহরটি একটি উপসাগর দ্বারা বেষ্টিত। ভাটার সময় এ উপসাগরের পানি মিষ্টি বলে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু জোয়ারের সময় লবনাক্ত ও তিক্ত। দ্বীপের মধ্যস্থলে দুটি শহর। তার একটির নির্মাতা বিধর্মীরা। মুসলিমরা এদেশ জয় করার পরে তারাই অপরটি নির্মাণ করে। আমরা এ দ্বীপের পাশ কাটিয়ে গিয়ে অপর একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে নোঙ্গর করি। পরের দিন আমরা হিনাওর (হোনাভার, অনেরৈ) শহরে পৌঁছি। শহরটি বড় বড় জাহাজ চলাচলের যোগ্য একটি ক্ষুদ্র উপসাগরের তীরে অবস্থিত। পুষকাল’ বা বর্ষার সময় এ উপসাগরটি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে চার মাস অবধি একমাত্র মৎস্য শিকারী ছাড়া অন্য কোন পোত যাতায়াত করতে পারে না। এ শহরের এবং উপকূলের সর্বত্র নারীরা শেলাই বিহীন কাপড় ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার করে না। কাপড়ের এক প্রান্ত তারা কোমরে জড়ায় এবং অপর অংশ কাঁধের উপর দিয়ে মাথায় দেয়। তারা সুন্দরী এবং সতী। প্রত্যেকেই নিজ নিজ নাকে একটি আংটি ব্যবহার করে। তাদের একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রত্যেকেই তারা কোরাণ কণ্ঠস্থ করে রেখেছে। শহরে আমি তেরটি বালিকা বিদ্যালয় ও তেইশটি বালকদের বিদ্যালয় দেখেছি। জিনিষ আর কোথাও দেখতে পাইনি। এখানকার অধিবাসীরা বিদেশের সঙ্গে জাহাজের সাহায্যে বাণিজ্য করে। চাষোপযোগী কোনো ভূমি এদের নেই। হিনাওরের শাসনকর্তা সুলতান জালালউদ্দিন একজন পরাক্রমশালী অতি উত্তম ব্যক্তি। তাঁর রাজ্য হারিয়াব নামক একজন বিধর্মী রাজার অধীনে। হারিয়ারের কথা আমরা পরে বলবো।
সুলতান জালালউদ্দিনের নৌ-শক্তির জন্য ভীত হয়ে মালাবারের অধিবাসীরা তাকে নির্দিষ্ট হারে বার্ষিক চাঁদা দেয়। ঘোড়সওয়ার ও পদাতিকসহ তার সৈন্যসংখ্যা প্রায় ছ’হাজার। আরেকবার আমি প্রায় এগার মাসকাল তার দরবারে কাটিয়েছিলাম আদৌ রুটী না-খেয়ে। কারণ, তাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাত ছাড়া আর কিছুই না খেয়ে আমি আরও তিন বছর কাটিয়েছি মালদ্বীপে, সিংহলে, এবং করমণ্ডল ও মালাবার। উপকূলে। শেষ অবধি আমি পানির সঙ্গে ছাড়া ভাত গলাধকরণ করতে পারিনি। এবার আমরা সুলতানের সঙ্গে তিন দিন কাটালাম। তিনিই আমাদের আহার্য সরবরাহ করেছিলেন। তারপর আমরা তার কাছে বিদায় নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম।
