এই বলে হাতে পায়ে চারটি পানিভর্তি কলসী বেঁধে স্ত্রীলোকটিকে যমুনা নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। স্ত্রীলোকটি কিন্তু ডুবে না গিয়ে পানির উপর ভেসে রইল। এর ফলে তাকে কাফতার বলে গণ্য করা হল। বলা বাহুল্য, যথারীতি স্ত্রীলোকটি ডুবে গেলে তাকে কাক্তার বলে ধরা হত না। পরে হুকুম হল তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে। স্ত্রীলোকটির ভাবশেষ শহরের নারী-পুরুষ সবাই মিলে কুড়িয়ে নিয়ে গেল। তাদের ধারণা এ ভস্ম গায়ে মাখলে এ-বছরের জন্যে অপর কোন কাতার তাদের কোন রকম অনিষ্ট করতে পারবে না।
আমি যখন দিল্লীতে তখন একদিন সুলতান আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গিয়ে তাকে একটি গোপন কক্ষে কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু ও দু’জন, যোগীর সঙ্গে দেখতে পেলাম। দু’জন যোগীর একজন বসা অবস্থায় শূন্যে আমাদের মাথার উপর উঠে গেল। তখনও সে সেখানে শূন্যের উপর বসে আছে। এ অদ্ভুত দৃশ্য আমাকে এতটা ভীত ও বিস্মিত করেছিল যে, আমি তৎক্ষণাৎ জ্ঞান হারালাম। পরে ঔষধ খাওয়ানোর ফলে প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠে বসলাম। তখনও পর্যন্ত যোগী শুন্যেই বসে আছে। অবশেষে তার সঙ্গী যোগী ঝোলার ভেতর থেকে একখানা খড়ম বের করে মাটীতে ছুঁড়ে মারল। খড়মখানা শূন্যে অবস্থিত যোগীর ঘাড়ে বারবার আঘাত করতে লাগল এবং যোগী ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এসে আমাদের পাশে পূর্ববৎ বসে পড়ল। তখন সুলতান আমাকে বললেন, তুমি ভয় পাবে আমি জানতাম। তা না হলে আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার তোমাকে দেখাতে পারতাম। আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম; কিন্তু আমার হৃদকম্প তখনও রয়েই গেল এবং আমি অসুখে পড়লাম। পরে ঔষধ খেয়ে আমাকে সুস্থ হতে হয়েছে।
আমাদের আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসা যাক। পারওয়ান থেকে আমরা গিয়ে কাজাররা পৌঁছি। এখানে এক মাইল লম্বা একটি দিঘী আছে। দিঘীর পাড়ে দেবমূর্তিসহ দেবমন্দির। মূর্তিগুলো মুসলিমদের দ্বারা (অস্পষ্ট) করা হয়েছে। সেখান থেকে চান্দিরি হয়ে আমরা ধিহার ৬ (ধর) শহরে এলাম। এ জেলার সবচেয়ে বড় প্রদেশ মালওয়াল এটি প্রধান শহর। দিল্লী থেকে এখানে আসতে চব্বিশ দিন লাগে। পথের পাশে স্তম্ভের গায়ে মাইলের সংখ্যা খোদিত আছে। পথিকরা সেই সংখ্যা দেখেই বুঝতে পারে, কত মাইল তারা একদিনে এসেছে এবং আর কত মাইল এগিয়ে গেলে থাকবার জায়গা বা গন্তব্যস্থানে পৌঁছা যাবে। ধিহার থেকে গেলাম উজ্জয়ন (উজ্জয়ন)। চমৎকার একটি জনবহুল শহর উজ্জয়ন। উজ্জয়ন থেকে এলাম দৌলত আবাদ। এ বিস্তৃত শহরটির প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে রাজধানী দিল্লীর সঙ্গে তুলনা চলে। তিনটি বিভিন্ন অংশে এ শহর বিভক্ত। প্রথমাংশ খাস দৌলতআবাদ সুলতান ও তার সেনাদের জন্য নির্দিষ্ট। দ্বিতীয় অংশ কাটাক নামে পরিচিত। তৃতীয়াংশে দুয়াইগির (দেওগিরি) নামে প্রসিদ্ধ দূর্গ।
দৌলতআবাদে সুলতানের শিক্ষক প্রসিদ্ধ খান কুলু খান বাস করেন। তিনি এ শহরের শাসনকর্তা এবং সাগার, তিলিং (তেলিঙানা) প্রভৃতি অঞ্চলের রাজপ্রতিনিধি। এ জনবহুল প্রদেশটি তিন মাসের পথ অবধি বিস্তৃত এবং এর সবটাই খান ও তাঁর সহকারীদের কর্তৃত্বাধীনে পরিচালিত। উপরোল্লিখিত দুয়াইগির দূর্গ সমতলভূমি বেষ্টিত একটি টিলা। টিলার খননকার্য চালিয়ে চূড়ান্ত এ দূর্গ নির্মান করা হয়েছে। চামড়া দিয়ে তৈরী মইয়ের সাহায্যে সেখানে পৌঁছতে হয়। রাত্রে এ মইটি সরিয়ে উপরে তুলে রাখা হয়। সাঘাতিক অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের এখানকার কারাগারে বন্দী করা হয়। এ কারাগারে বিড়ালের চেয়েও বড় আকারের অনেক ইঁদুর আছে। বাস্তবিক পক্ষে সে ইঁদুর দেখে বিড়াল আত্মরক্ষার চেষ্টা না করে ভয়ে পালায়। শুধু ফাঁদ পেতে সে সব ইঁদুর ধরা যায়। আমি সে ইঁদুর দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। দৌলত আবাদের অধিবাসীরা মারহাট্টাদের বংশধর। খোদা তাদের নারীদের বিশেষ করে নাসিকা ও ভুরুযুগল অত্যন্ত সুন্দর করে গঠন করেছেন। এ শহরের বিধর্মী অধিবাসীরা সবাই ব্যবসায়ী। তারা অত্যন্ত ধনবান এবং মনিমুভার ব্যবসায় করে। দৌলত আবাদে গায়ক ও গায়িকাদের অতি সুন্দর ও বিশাল একটি বাজার আছে। সেখানে বহু সংখ্যক দোকান। প্রত্যেক দোকানেই এমন একটি দরজা আছে যেখান দিয়ে এগিয়ে দোকানের মালীকের বাড়ী অবধি যাওয়া যায়। কার্পেট দিয়ে দোকানগুলো সুন্দর করে সাজানো, দোকানের মধ্যস্থলে বড় একটি দোলনার মতো বস্তু। সেখানে গায়িকা বসে বা শুয়ে থাকে। সব রকম অলঙ্কার দিয়ে তাকে সাজানো হয় এবং পরিচারকরা তার দোলনায় দোল দেয়। বাজারের মধ্যস্থলে কার্পেট মোড়া প্রকাণ্ড একটি সজ্জিত মঞ্চ। প্রতি বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পরে প্রধান বাদ্যকর এসে মঞ্চে বসেন। তার ভৃত্য ও ক্রীতদাসেরা বসে তার সামনে। তখন গায়িকারা একের পর আরেকজন এসে নাচ গান করতে থাকে। মগরেবের নামাজের সময় অবধি এমনি নাচ-গান চলে। তারপর তারা চলে যায়। সেই বাজারেই নামাজ পড়ার জন্য মসজিদও রয়েছে। ভারতের কোনো বিধর্মী শাসক এ বাজারের ভেতর দিয়ে গেলেই মঞ্চের কাছে নামতেন এবং গায়িকা বালিকারা এসে তার। সামনে নাচগান করতো। একজন মুসলমান সুলতানও তাই করতেন।
আমরা মাধুরবার (নাধুরবার) শহর অবধি চলে গেলাম। এ ছোট শহরটিতে মারহাট্টাদের বাস। তাদের অধিকাংশই দক্ষ শিল্পী। অনেকে চিকিৎসক অথবা জ্যোতিষী। মারহাট্টাদের মধ্যে যারা উচ্চবংশীয় তারা ব্রাহ্মণ ও কাটরী (ক্ষত্রিয়)। তাদের খাদ্য হলো চাউল, শাকসজি ও তিলের তৈল। জীবকে কষ্ট দেওয়া বা জীবহত্যা করা তারা পছন্দ করে না। তারা খাওয়ার আগে পুরোপুরি স্নান করে নেয়। অন্ততঃ ছয়। পুরুষ দূরের কোনো ভগ্নী সম্পৰ্কীয় ছাড়া কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে এদের বিয়ে হতে পারে না। তারা কখনো মদ্যপান করে না। মদ্য পানকে সবচেয়ে বড় পাপ বলে মনে করে। ভারতের মুসলমানদেরও সেই মত। কোনো মুসলমান মদ্যপান করলে আশি চাবুক মেরে তাকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং তিন মাসকাল তাকে এমন এক কারাগারে (Matamore) বন্দী করে রাখা হয় যার দরজা শুধু খাবার সময় হলে ভোলা হয়।
