আমি তাদের প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়ে বললাম, আমরা এখানে অপেক্ষা করতে পারি না। যেখানেই আমরা যাই না কেন, সুলতানের জবাব সেখানেই পাব।
তারপর আমরা পুনরায় যাত্রা করে তাবু ফেললাম বার্জবুরা বা বার্জপুর নামক স্থানে গিয়ে। এখানে একজন শেখের একটি দরগাহ আছে। সুশ্রী ও ধর্মপ্রাণ এই শেখ নাভি থেকে পা অবধি শুধু একখণ্ড বস্ত্র ব্যবহার করেন। এ জন্য সবাই তাকে নাঙ্গা মোহাম্মদ বলে থাকে। বার্জপুর থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা প্রথমে পৌঁছলাম আব-ই-সিয়া (কালিন্দী) নদী অবধি এবং সেখান থেকে কনৌজ। কনৌজ একটি সুগঠিত ও সুরক্ষিত বড় শহর। শহরটি প্রকাণ্ড একটি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। এ শহরে জিনিষপত্রের দাম বেশ সস্তা। আমরা এখানে তিনদিন কাটালাম। আমার সম্বন্ধে সুলতানকে যে পত্র দেওয়া হয়েছিল তার জবাব এখানে থাকতেই পেলাম। তিনি লিখেছেন, যদি ইব্নে বতুতার কোন খোঁজই না পাওয়া যায়, তবে তার জায়গায় তোমরা দৌলতাবাদের কাজী ওয়াজি উল-মুলককে নিয়ে যাত্রা শুরু করবো।
কনৌজ থেকে আমরা মাওরী নামক ছোট একটি শহর ছাড়িয়ে বড় শহর মার-এ গিয়ে পৌঁছলাম।৩ এ শহরের অধিকাংশ অধিবাসী বিধর্মী; কিন্তু শাসনকর্তা মুসলমান।
মালয়া নামক একটি হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম থেকে এ-শহরটির নামকরণ হয়েছে। এরা সুশ্রী ও শক্তিশালী এবং মহিলারা খুবই সুন্দরী। মার ছাড়িয়ে আমরা গেলাম আলাবার বা আলাপুর। এ-ছোট শহরটির অধিবাসীরাও অধিকাংশ হিন্দু এবং শাসনকর্তা আবিসিনিয়ার একজন মুসলমান। এক সময়ে ইনি সুলতানের একজন ক্রীতদাস ছিলেন। অসীম সাহসিকতার জন্য ইনি সর্বত্র পরিচিত ছিলেন। বিধর্মীরা বরাবর একে ভয় করে চলত। কারণ ইনি অনবরত তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে এবং তাদের বন্দী বা হত্যা করে ত্রাসের সঞ্চার করেছিলেন। ইনি যেমন শক্তিশালী তেমনি দীর্ঘকায় ছিলেন। শুনেছি একবার আহার করতে বসে ইনি একটি ভেড়ার গোত একাই খেয়ে ফেলতেন এবং খাওয়ার পরে প্রায় দেড় পাউণ্ড ঘি খেতেন। তাদের নিজের দেশের নিয়মও ছিল তাই। এই শাসনকর্তার একটি পুত্রও ঠিক তারই মত সাহসী ছিল। অবশেষে একটি গ্রাম আক্রমণ করতে গিয়ে ইনি হিন্দুদের হাতে নিহত হন।
অত:পর আমরা গোয়ালিয়রে এসে হাজির হলাম। এখানে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি দূর্গ আছে। এই দূর্গের প্রবেশদ্বারে মাহুতসহ পাথরের খোদাই একটি হাতী দেখলাম। এখানকার শাসনকর্তা একজন ধার্মিক ও সদ্ব্যক্তি। ইনি পূর্বে একবার আমাকে বিশেষ সম্মান করেছিলেন। একদিন আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি একজন বিধর্মীকে তার কোন অপরাধের জন্য দু’টুকরা করে কাটতে উদ্যত হয়েছেন। দেখেই আমি তাকে বললাম, আল্লার নামে আমি অনুরোধ করছি, এ-কাজটি করবেন না। কারণ, আমি জীবনে কখনো চোখের সামনে নরহত্যা দেখিনি। তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করে লোকটিকে কারাগারে রাখবার হুকুম করলেন। কাজেই আমার হস্তক্ষেপে একটি লোকের জীবন রক্ষা হল।
গোয়ালিয়র থেকে আমরা গেলাম পারওয়ান।পারওয়ান মুসলমানদের শহর কিন্তু এ-শহরের অবস্থান বিধর্মীদের অধিকৃত জায়গায়। এ-জায়গাটির আশে-পাশে অনেক ব্যাঘ্রের বাস। স্থানীয় একজন লোকের মুখে শুনলাম, শহরের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকা সত্ত্বেও রাত্রে একটি বাঘ প্রায়ই শহরে প্রবেশ করে এবং মানুষ ধরে নিয়ে যায়। এভাবে। এ-শহরের বেশ কিছু লোককে হত্যা করেছে বলে শোনা যায়। অথচ বাঘটি কি ভাবে যে শহরে প্রবেশ করে তা কেউ বলতে পারে না।
অবশেষে একটা আশ্চর্যজনক গল্প শুনলাম। একজন লোক আমার কাছে গল্প করল, এ-বাঘটি আসলে একটি মানুষ। যাদুর বলে এ বাঘের আকৃতি ধারণ করতে পারে। এসব যাদুকরেরা যোগী নামে পরিচিত। আমি এ-গল্প বিশ্বাস করতে রাজী হলাম না; কিন্তু একাধিক লোকের কাছে এ-বিষয়ে আমি একই গল্প শুনেছি।
এই শ্রেণী যোগী বা যাদুগীররা অনেক অসম্ভব কাজ করতে পারে। তাদের কেউ মাসের পর মাস কাটাতে পারে পানাহার না করে। কেউ-কেউ মাটীর নীচে গর্ত করে তাতেই বাস করে। এ রকম একটি লোকের কথা শুনেছি, সে নাকি এক বছর ছিল এমনি একটি গর্তে। এখানকার লোকেরা বলে, যোগীরা এমন পিল তৈরী করতে পারে-যার একটি খেয়ে কয়েক দিন বা মাস কাটিয়ে দেওয়া যায়। এ সময়ের মধ্যে কোন রকম তাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকে না। এ ছাড়া বহুদূরে কি ঘটছে তাও তারা অনায়াসে বলে দিতে পারে। সুলতান যোগীদের সম্মান করেন এবং তাদের সঙ্গ দান করে থাকেন। শুনলাম, যোগীদের মধ্যে অনেকে আছে শুধু শাক-সজী খেয়ে জীবন ধারণ করে এবং বেশীর ভাগ যোগীরাই মাছ-মাংস স্পর্শ করে না। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে নিজেদের তারা এভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে যে বাহ্যিক প্রয়োজন তাদের অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
যোগীদের মধ্যে এমনও কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা একটি লোকের দিকে চোখ তুলে চাইলেই সেই লোকটি সেখানেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। সাধারণ লোকরা বলে, এ ভাবে মৃত্যু ঘটেছে এমন কোন লোকের বক্ষ বিদারণ করে দেখা গেছে তার হৃদপিণ্ড নেই। অর্থাৎ হৃদপিণ্ড খেয়ে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের যাদুগীর বা যোগীদের মধ্যে নারীই বেশী। সে সব নারী যাদুগীর মানুষের হৃদপিণ্ড ভক্ষণ করে তাদের বলা হয় কাফতার। দিল্লীতে যখন দুর্ভিক্ষ চলছে তখন এমনি একজন স্ত্রীলোককে আমার নিকট এনে বলা হয়েছিল, সে নাকি একটি শিশুর হৃদপিণ্ড ভক্ষণ করেছে। আমি তাকে সুলতানের লেফটেন্যান্টের কাছে পাঠাতে বললাম। লেফটেন্যান্ট বললেন, স্ত্রীলোকটি সত্যই কাফতার কি না তিনি তা পরীক্ষা করে দেখবেন।
