অষ্টম দিনে পিপাসায় আমি মৃতপ্রায় হলে গেলাম। একটি গ্রামে গেলাম, কিন্তু সেখানেও পানি পেলাম না।
রাস্তা দিয়ে চলতে-চলতে অবশেষে আমি একটি ভোলা কুপের কাছে গিয়ে হাজির হলাম। কুপের কাছে একটি দড়ি আছে কিন্তু পানি তুলবার কোন পাত্র সেখানে দেখতে পেলাম না। আমার মাথায় এক টুকরো কাপড় ছিল। দড়ির মাথায় কাপড়ের টুকরোটি বেঁধে তাই ভিজিয়ে পানি তুলে মুখে দিলাম। কিন্তু তাতে তৃষ্ণা নিবারণ হল না। অবশেষে আমি আমার এক পাটী জুতো দড়িতে বেঁধে তারই সাহায্যে পানি তুলে পান করলাম। কিন্তু তাতে পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত হতে পারলাম না। কাজেই দড়ি বাঁধা জুতোখানা দ্বিতীয়বার কুপে ফেললাম। দুর্ভাগ্যের বিষয় এবার দড়ি ছিঁড়ে জুতোখানা কুপের তলায় পড়ে গেল। অগত্যা দ্বিতীয় পাটী জুতোর সাহায্যে একই উপায়ে পানি তুলে আমাকে পান করতে হল।
তারপর সেই জুতোখানা কেটে তার উপরের অংশ আমার দুপায়ে বাধলাম দড়ি এবং ছেঁড়া কাপড়ের সাহায্যে।
আমি যখন পায়ে জুতোর চামড়া বাঁধছিলাম এবং এরপর কি করা যাবে তাই ভাবছিলাম তখন একটি লোক এসে আমার সামনে দাঁড়াল। আমি তার দিকে চোখ তুলে চেয়ে দেখলাম, লোকটি কৃষ্ণবর্ণ। তার হাতে একটি জগ ও একখানা লাঠী, কাঁধে একটি ঝোলা। সে মুসলমানী কায়দায় আমাকে অভিবাদন জানাল, ‘আচ্ছালামু আলাইকুম’ বলে। আমি অনুরূপভাবে তাকে প্রত্যাভিবাদন জানালাম। তখন লোকটি আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করতে আমি বললাম, আমি একজন পথহারা ব্যক্তি। সে বলল, আমিও তাই।
তার সঙ্গে দড়ি ছিল। তার জগ ও দড়ির সাহায্যে পানি তুলে পান করতে উদ্যত হয়েছি এমন সময় সে বলে উঠল, সবুর কর। এই বলে সে তার ঝোলার ভেতর থেকে এক মুঠো কাল মটর ও চাউল ভাজা বের করে আমাকে খেতে দিল।
খাওয়ার পরে ওজু করে সে দু’রাকাত নামাজ পড়ল। আমিও তাই করলাম। অত:পর সে আমার নাম জিজ্ঞেস করায় আমি বললাম আমার নাম মোহাম্মদ। সে তার নিজের নাম বলল, ‘আনন্দিতআত্মা’। তার নাম একটা ভাল লক্ষণ বলে মনে হল এবং আমার মনে স্বস্তি ফিরে এল।
সে একটু পরে বলল, আল্লার ওয়াস্তে তুমি আমার সঙ্গে চল। আমি রাজী হলাম; কিন্তু এত দুর্বলতা বোধ করতে লাগলাম যে বেশীক্ষণ তার সঙ্গে চলতে পারলাম না। এক জায়গায় গিয়ে আমি বসে পড়লাম। তাকে বললাম যতদিন তোমার দেখা পাইনি ততদিন বেশ চলেছি কিন্তু তোমাকে পেয়ে যেনো আর চলতে পারছি না।
আমি হাঁটতে অক্ষম বলাতে আগন্তুক আমাকে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন এবং স্মরণ করতে বললেন, “খোদা আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষাকর্তা।” আমি বার বার এ-কথা স্মরণ করতে লাগলাম। কিন্তু আমার চোখ যেন আপনা হতেই বন্ধ হয়ে আসছিল। তারপর হঠাৎ যেন মাটীতে পড়ে যাচ্ছি মনে হওয়ায় আমার জ্ঞান ফিরে এল, আমি চোখ মেলে চাইলাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে লোকটিকে ধারে কাছে আর কোথাও দেখতে পেলাম না। তাছাড়া আমি তখন একটি লোকালয়ে অবস্থান করছি।
গ্রামের ভেতর প্রবেশ করে দেখলাম, অধিকাংশ বাসিন্দা হিন্দু কিন্তু তাদের শাসনকর্তা একজন মুসলমান। প্রজাদের কাছে খবর পেয়ে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমি তাকে সেই গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, গ্রামটির নাম তাজবুরা। আমার দলের লোকেরা যেখানে আছে সেই কোয়েল এখান থেকে খুব দূরে নয়। গ্রামের শাসনকর্তা আমাকে তার বাড়ী নিয়ে যাবার জন্যে একটি ঘোড়া আনালেন। বাড়ীতে গেলে তিনি আমাকে গোসল করালেন এবং গরম খাদ্য খেতে। দিলেন। আমার আহারের পরে বললেন, আমার কাছে একটি জামা ও পাগড়ী আছে। একজন মিসরবাসী আরবের লোক এগুলো আমার জিম্মায় রেখে গেছে। কোয়েলে যে সেনাদল আছে, সে তারই একজন সৈনিক। আমি তখন সেগুলো আমাকে দিতে অনুরোধ জানালাম। সেগুলো আমার কাছে হাজির করা হলে দেখলাম, এগুলো আমার নিজেরই সম্পত্তি এবং আমিই কোয়েল থাকাকালে সেই আরবী লোকটিকে এগুলো দিয়েছিলাম। এব্যাপারে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। সে লোকটি আমাকে কাঁধে। তুলে এখানে এনেছিলেন তখন তার কথাই আমি ভাবতে লাগলাম।
ভাবতে ভাবতে আমার মনে পড়ল, আবু আবদুল্লাহ্ আল-মুর্শিদী নামক একজন দরবেশের কথা। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, তুমি হিন্দুস্থানে পৌঁছে আমার ভাই দিলশাদের দেখা পাবে। তুমি সেখানে একটি বিপদে পড়বে এবং আমার ভাই তোমাকে সেই বিপদ থেকে রক্ষা করবে।
আমি এখন বুঝতে পারলাম, ইনিই দরবেশ আবু আবদুল্লাহ আল-মুর্শিদীর ভাই। দুঃখের বিষয়, উল্লিখিত ঘটনার সময় ছাড়া আর কখনও এ লোকটির সঙ্গলাভের সৌভাগ্য আমার হয় নাই।
সে রাত্রেই কোয়েলায় পত্র লিখে আমার নিরাপত্তার কথা বন্ধুদের জানালাম। খবর পেয়ে তারা আমার জন্যে ঘোড়া ও পোষাক নিয়ে হাজির হলেন এবং আমাকে ফিরে পেয়ে বিশেষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন।
তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম, কাফুরের মৃত্যুর পরে আমরা সুলতানকে যে চিঠি লিখেছিলাম তার জবাব এসে পৌঁচেছে। তিনি সমবুল নামক একজন খোঁজাকে কাফুরের স্থলাভিষিক্ত করে পাঠিয়েছেন এবং পুনরায় আমাদের যাত্রা শুরু করতে বলেছেন।
আমার বিপন্ন অবস্থার কথা লিখে সঙ্গীরা সুলতানকে আরও একখানা চিঠি লিখেছিল। সেই চিঠিতে তারা এ যাত্রাকে অশুভ যাত্রা মনে করে আর অধিক অগ্রসর হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সুলতানের মনোভাব জানতে পেরে আমি তাদের মতে মত দিতে পারিনি। তারা তখন বলল, যাত্রার শুরুতেই কি রকম বিপদ-আপদ ক হয়েছে আপনি কি তা দেখতে পাচ্ছেন না। আপনার অনুরোধ অবশ্যই সুলতান রক্ষা করবেন। সুলতানের জবাবের জন্যে আমাদের এখানেই অপেক্ষা করা উচিত অথবা সুলতানের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত।
