এভাবে পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে একবার পাঁচ জন সঙ্গীসহ আমি দল থেকে অনেক দূরে গিয়ে পড়লাম। এ সময়ে এক ঝোঁপের আড়াল থেকে বেরিয়ে একদল অশ্বারোহী ও পদাতিক সহসা আমাদের আক্রমণ করল। তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে আমরা পালাতে চেষ্টা করলাম। প্রথমে তাদের দশজন আমার পিছু ধাওয়া করেছিল, শেষ অবধি তিন জন আমার পিছনে-পিছনে লেগেই রইল। আমার সামনে তখন আর পালাবার পথ নেই। সেখানকার জমিও প্রস্তরময়। একবার আমার ঘোড়ার সামনের পা দু’খানা পাথরের ফাঁকে আটকা পড়ে গেল। অগত্যা আমি নেমে ঘোড়ার পা মুক্ত করতে বাধ্য হলাম। ভারতের রীতি-অনুযায়ী একজন লোক দু’খানা করে তরবারী সঙ্গে রাখে। ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা আমার একখানা তরবারী মাটিতে পড়ে গেল। তরবারীখানা ছিল সোনার কারুকার্য খচিত। কাজেই আবার ঘোড়া থেকে নেমে আমাকে তরবারীখানা। কুড়িয়ে নিতে হল। তখনও শত্রুপক্ষের তিনজন লোক আমার পশ্চাদ্ধাবন করছে। অবশেষে সামনেই গভীর একটি নালা দেখতে পেয়ে আমি নীচের দিকে নেমে গেলাম। তারপরে আর পশ্চাদ্ধাবনকারীদের সাক্ষাৎ পাইনি।
অত:পর আমি বনের পাশে একটি উপত্যকায় গিয়ে উঠলাম। সেখানে একটি রাস্তা পেয়ে আমি অনির্দিষ্ট ভাবে হাঁটতে লাগলাম। সে রাস্তা কোথায় গিয়ে পৌঁছে, তাও আমার জানা নেই। এমন সময় প্রায় চল্লিশ জন বিধর্মী তীর ধনুক নিয়ে আমাকে ঘেরাও করে ফেলল। আমার ভয় হল যে, পালাবার চেষ্টা করলেই তারা এক সঙ্গে আমাকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে আরম্ভ করবে। এদিকে আমি এখন একেবারে নিরস্ত্র বললেই চলে। কাজেই আমি নিরুপায় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে আত্মসমর্পন করলাম, কারণ আত্মসমর্পণকারী শত্রুকে তারা হত্যা করে না।
তারা আমাকে ধরে পরিধানের বস্ত্র ছাড়া আর সব কিছুই খুলে নিয়ে গেল। তারপরে আমাকে নিয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর তাদের আস্তানায়। বৃক্ষাবৃত একটি পুকুরের কাছে তাদের আস্তানা। তাদের দেওয়া মটরশুটির তৈরী এক রকম রুটি খেয়ে পানি খেলাম। এদের দলে দেখলাম দুজন মুসলমান রয়েছে। তারা ফারসী ভাষায় আমার সঙ্গে কথার্বাতা বলল, আমার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে চাইল। আমি যে। সুলতানের নিকট থেকেই এসেছি, এটুকু গোপন করে আংশিকভাবে তাদের কাছে নিজের কথা বললাম। তারপর তারা বলল, “এদের হাতে অথবা অন্য লোকদের হাতে নিশ্চয়ই তোমাকে প্রাণ দিতে হবে। ইনি এদের সরদার।” এই বলে তাদের মধ্যে
একজন লোককে দেখিয়ে দিল। কাজেই আমি তার সঙ্গে কথা বললাম। মুসলমান দুজন। দোভাষীর কাজ করতে লাগল।
অত:পর সরদার আমাকে তিনজন লোকের জিম্মা করে দিল। তাদের একজন ছিল বৃদ্ধ, দ্বিতীয় জন তার ছেলে। তৃতীয় ব্যক্তি কৃষ্ণকায় একজন দুষ্ট প্রকৃতির লোক। এ তিনজন লোকের সঙ্গে কথাবার্তায় জানতে পারলাম, আমাকে হত্যা করার ভার পড়েছে এদের উপর।
সেই দিনই বিকাল বেলা তারা আমাকে হাজির করল একটি গুহার কাছে। সেখানে কৃষ্ণকায় লোকটি আমার গায়ের উপর তার পা দিয়ে রাখল এবং বৃদ্ধ ও তার ছেলে ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরে উঠে তারা নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলল এবং আমাকে পুকুরে যেতে ইশারা করল। আমার তখন আশঙ্কা হল, এবার আমাকে হত্যা করা হবে। কাজেই আমি বৃদ্ধলোকটির সঙ্গে কথা বলে তার দয়া ভিক্ষা করতে লাগলাম। আমার। উপর তার কিছুটা দয়া হল।
দুপুরে বেলা পুকুরের কাছে কিছু লোকজনের সোরগোল শুনা গেল। তারা মনে করল, তাদেরই দলের লোক। কাজেই তারা আমাকেও সেখানে যেতে বলল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা গেল এ-দলের লোক তারা নয়। নতুন দলটি আমার প্রহরীদের পরামর্শ দিল তাদের সঙ্গে যেতে। কিন্তু এরা তাতে রাজী না হয়ে বরং আমাকে তাদের সামনে রেখে বসে রইল। তাদের সামনে একগাছি শনের দড়ি। আমার মনে হল, আমাকে হত্যা করার সময় হয়তো এই দড়ি দিয়েই বাঁধবে আমাকে।
অনেকক্ষণ পরে শেষোক্ত দলের তিনজন লোক আমার কাছে এল। তাদের মধ্যে সুদর্শন এক যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমাকে আমি মুক্তি দিলে খুশি হবে?
আমি সম্মতি জানাতেই সে বলল, বেশ যাও।
বলতেই আমি আমার গায়ের জামাটি খুলে তাকে দিলাম। বিনিময়ে সেও তার গায়ের একটি জামা আমাকে দিল। অত:পর আমি চলে এলাম কিন্তু সারাক্ষণ ভয় হতে লাগল, হয়ত তাদের মনের অবস্থার কোন রকম পরিবর্তন হলে আবার আমাকে গ্রেফতার করতে পারে। তাই আমি তাড়াতাড়ি একটা নল-খাগড়ার বনে গিয়ে লুকিয়ে রইলাম এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানেই কাটালাম।
যুবক আমাকে যে রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়েছিল, সূর্যাস্তের পরে সেই রাস্তা ধরেই চলতে লাগলাম। রাস্তাটা একটি ছোট খালে গিয়ে পড়েছে সেখানে গিয়ে আমি তৃষ্ণা নিবারণ করলাম। প্রায় দুপুর-রাত অবধি চলবার পর আমি একটা পাহাড়ের নিকট এসে সেখানেই রাত কাটালাম। ভোরে উঠে আবার আমার যাত্রা শুরু হল এবং দুপুর বেলা একটা উচ্চ পাহাড়ের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। এখানে কুল জাতীয় এক প্রকার ফল পেড়ে খেতে গিয়ে কাঁটার আঁচড় লেগেছিল আমার বাহুতে। বাহুর সে দাগ আজও মিলায়নি।
সপ্তম দিনে বিধর্মীদের এক গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম আমি। গ্রামে একটি কুপ আছে, শাক-সজীর ক্ষেতও আছে। আমি কিছু আহার্য চাইলাম কিন্তু গ্রামের লোকেরা আমাকে কিছুই খেতে দিতে রাজী হল না। একটি কুপের কাছে কিছু মূলো-শাক দেখতে পেয়ে অগত্যা আমি তাই খেলাম।
