১৫। দৌলতাবাদ বা দেণ্ডগিরি হায়দারাবাদ (দেকান) রাজ্যের উত্তর-পশ্চিমে। সুলতান মুহাম্মদ এটাকে তার রাজধানী করতে চেয়েছিলেন দক্ষিণ ভারতে সামরিক অভিযানের কেন্দ্র হিসাবে স্থানটির শুরুত্বের জন্য। দু বার (বা তিনবার) তিনি দিল্লীর সমস্ত জনতাকে এখানে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করেছিলেন। ভাগ্যের পরিহাসে তার জীবদশাতেই এটা দেকানের বাহমনী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দখল করে নিয়েছিলেন। পরিচ্ছেদ ৭, টীকা ৭ দ্রষ্টব্য। ১৬। এ সংস্করণে যে অধ্যায়টি স্থান পায়নি তেমনি একটি পূর্বের অধ্যায়ে ইব্নে বতুতা শেখ শিহাব উদ্দীনের ইতিহাস বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছেন। সুলতানের অধীনে চাকুরী করার অসম্মতি প্রকাশের দ্বারা তিনি তার বিরাগভাজন হন এবং দিল্লীর নিকটে মাটির তলায় সুরঙ্গ করে কয়েক বছর কাটান। এ সুরঙ্গের তলায় কয়েকটি কামরা, গুদামঘর, রান্নাঘর এবং গোসলখানা ছিল। অতঃপর পুনরায় তাকে দরবারে তলব করা হলে তিনি প্রকাশ্যে মুহাম্মদ শাকে বিশ্বাসঘাতক বলেন-এবং তার উক্তি ফিরিয়ে নিতে বলা হলে তিনি তাতে অসম্মতি জানান এবং দণ্ডিত হন।
০৭. উপহার বিনিময়
সাত
চীন দেশের বাদশাহ সুলতানকে মূল্যবান কতকগুলো উপহার পাঠিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে একশ ক্রীতদাস ও দাসী, পাঁচশ মখমল ও রেশমি-কাপড়ের টুকরা, জরির পোষাক এবং অস্ত্রশস্ত্র। এসব পাঠিয়ে কারাজিল (হিমালয়) পাহাড়ের নিকটস্থ একটি মন্দির পূণনির্মাণের অনুমতি চেয়েছেন তিনি সুলতানের কাছে। চীন দেশীয় তীর্থযাত্রীদের এ মন্দিরটি সমহল নামক স্থানে অবস্থিত। ভারতের মুসলমান সৈন্যরা এক সময়ে এ-মন্দিরটি আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে ফেলে। চীন সম্রাটের উপহার গ্রহণ করে সুলতান তাকে লিখে পাঠালেন, ইসলাম ধর্মের নিয়মানুসারে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। যারা মন্দির নির্মাণের জন্যে বিশেষ ধরণের কর দেয় মুসলিম সাম্রাজ্যে শুধু তাদেরই মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। তারপরে লিখলেন, “আপনিও যদি “জিজিয়া” কর দিতে সম্মত থাকেন তবে আপনাকে মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে। যারা সত্য পথ অনুসরণ করে তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।” পত্রের সঙ্গে তিনি পাল্টা উপহারও পাঠালেন। সে উপহার সম্ভার চীন থেকে প্রাপ্ত উপহারের চেয়ে অনেক বেশী। তার ভেতরে প্রধান ছিল একশ ভাল জাতের ঘোড়া, একশ শ্বেতাঙ্গ ক্রীতদাস, একশ হিন্দু নর্তকী ও গায়িকা, বারশ বিভিন্ন শ্রেণীর বস্ত্রখণ্ড, সোনারূপার তৈজসপত্র, সোনালী কাজকরা পোষাক পরিচ্ছদ, তরবারী, মুক্তার কাজ করা দস্তানা এবং পনের জন খোজা ভৃত্য।
সুলতান আমার সহগামী-দূত হিসাবে নিযুক্ত করলেন জান্জানের খ্যাতনামা বিদ্বান আমীর জহিরউদ্দিনকে। উপহার দ্রব্যের হেফাজতের ভার দিলেন কাফুর নামক একজন খোঁজার উপর। আমাদের জাহাজে আরোহণের পূর্ব পর্যন্ত এগিয়ে দেবার জন্য এক হাজার সৈন্যসহ পাঠালেন আমীর মোহাম্মদকে।
আমাদের সঙ্গে ফিরে চললেন চীনের পনের জন দূত এবং তাদের ভৃত্যগণ, সব মিলে প্রায় শতেক লোক।
সুলতান আদেশ দিলেন, আমরা তাঁর রাজ্যের বাইরে গিয়ে-না-পৌঁছা অবধি সরকার থেকেই আমাদের খাদ্য সরবরাহ করা হবে। হিজরী ৭৪৩ সনের ১৭ই সফর মোতাবেক ১৩৪২ খৃষ্টাব্দের ২২ শে জুলাই আমাদের যাত্রা শুরু হল। যাত্রার জন্যে বিশেষ করে এ-দিনটি নির্দিষ্ট করার একটি কারণ ছিল। এখানকার লোকেরা প্রতিমাসের ২রা, ৭ই, ১২ই, ১৭ই, ২২শে এবং ২৭শে তারিখকে বিদেশযাত্রার জন্যে শুভদিন মনে। করে।
প্রথম দিন যাত্রা করে আমরা দিল্লীর সাত মাইল দূরে তিলবাতে উপস্থিত হলাম। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে বায়না শহরে কুল-এ (আলিগড়) পৌঁছে একটি মাঠের উপর তাবু ফেললাম।
কুলে পৌঁছে শুনতে পেলাম কতিপয় অবিশ্বাসী হিন্দু আল-জালালী শহরটি আক্রমণ করে ঘেরাও করে রেখেছে। এ শহরটি কুল থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত। অগত্যা আমরা সে দিকেই রওয়ানা হলাম। ইত্যবসরে হিন্দু বিদ্রোহীরা শহরের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করেছে এবং তাদের প্রায় ধ্বংস করে এনেছে। আমরা সেখানে পৌঁছে তাদের পালটা আক্রমণ করার পূর্ব পর্যন্ত তারা আমাদের সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারেনি। তাদের মধ্যে অশ্বারোহী ছিল এক হাজার, পদাতিক তিন হাজার। কিন্তু তাহলেও দলের শেষ লোকটি অবধি আমাদের হাতে প্রাণহারায় এবং তাদের বহু ঘোড়াও অস্ত্রশস্ত্র আমাদের হস্তগত হয়। অবশ্য আমাদের দলেরও কিছু সংখ্যক লোক নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিল তেইশ জন অশ্বারোহী, পঞ্চান্ন জন পদাতিক, সেই সঙ্গে উপহার দ্রব্যের হেফাজতকারী কাফুর।
আমরা পত্রযোগে সুলতানকে কাফুরের মৃত্যু-সংবাদ জানিয়ে সুলতানের জবাবের প্রতীক্ষায় রইলাম। এ সময়ে আল-জালালীর নিকটবর্তী দুরধিগম্য এক পাহাড় থেকে দলে-দলে হিন্দুরা এসে শহরের আশে-পাশে আক্রমণ চালাত। আমাদের দলের লোকেরা প্রায় প্রতিদিন তাদের প্রতিরোধ করতে বেরিয়ে যেত।
এ-উপলক্ষে একবার আমি কতিপয় বন্ধুর সঙ্গে অশ্বারোহণ করে একবার বেরিয়ে এক বাগানে বসে বিশ্রাম করছিলাম, কারণ তখন গ্রীষ্মকাল। এমন সময় অদূরে বহু লোক-জনের চীৎকার শুনতে পেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম বিদ্রোহী হিন্দুরা একটি গ্রাম আক্রমণ করেছে। আমরা তাদের পাল্টা আক্রমণ করতেই তারা ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে গেল। আমরাও তাদের পথ অনুসরণ করে ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে তাদের পিছু নিলাম।
