অতঃপর সুলতান প্রায়ই তার সামনে বসে আহার করতে আমাদের ডাকতেন। তখন তিনি আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতে ভুলতেন না।
তিনি সবাইর জন্য ভাতা নির্দিষ্ট করে দিলেন। আমার ভাতা বরাদ্দ হলো বছরে বার হাজার দিনার। এছাড়া আগে যে তিনটি গ্রাম লিখে দিয়েছিলেন তার সঙ্গে আরও দুটি গ্রাম যোগ করে দিলেন।
একদিন উজির এবং সিন্ধুর শাসনকর্তা এসে আমাদের বললেন,”সুলতান বলেছেন, আপনাদের ভেতর উজির, সিপাহ্ সালার, হাকিম, শিক্ষক বা শেখ হবার যোগ্যতা যার আছে সুলতান তাকে সে পদে নিয়োজিত করবেন। উপস্থিত সবাই প্রথমে চুপ করে রইলেন। কারণ, তারা এসেছিলেন কিছু ধনদৌলত লাভ করে দেশে ফিরে যাবেন এই আশায়। তাদের কেউ নিজ-নিজ বক্তব্য পেশ করার পরে উজির আমাকে আরবীতে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বক্তব্য কি?”
আমি বললাম,”ওজারত বা অন্য কোন পদ আমার কাম্য নয়। কাজীগিরি বা শেখগিরি আমার পেশা। পূর্বপুরুষরাও তাই করতেন।”
সুলতান আমার এ জবাবে খুব খুশী হয়েছিলেন। পরে আমাকে প্রাসাদে ডেকে দিল্লীর কাজীর পদে আমাকে বহাল করেন।
***
টিকা
পরিচ্ছেদ ৬
১। মুসলিম দেশগুলিতে ডাক ব্যবস্থা পুরাতন যুগের মতো একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল– রাজ্যের প্রয়োজনীয় ব্যাপার সত্বর আদান-প্রদানের জন্য এর ব্যবহার চলতে-সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহারে লাগতো না।
২। সামিরদের প্রথা এত পরিষ্কারভাবে তাদের হিন্দু থেকে উৎপত্তির নির্দেশ দেয় যে আরব সামিরাদের সঙ্গে তাদেরকে মেলানো একটি কাল্পনিক বংশধারা বলে মনে হয়, যেটা তাদের ইসলাম গ্রহণের সময় থেকে হিসেব করা হয়। মনে হয় এই সব সামিরা হচ্ছে রাজপুত। সামাস- এরা এ সময়ে নিম্ন সিন্ধুর প্রভু হয়ে বসেছিল। অতএব জানানি সম্ভবতঃ রোহনি এবং সেওয়ানের মাঝের অর্ধপথে অবস্থিত ছিল।
৩। সিন্ধুদেশ গ্রীষ্মের তাপ পড়ে জুন এবং জুলাই মাসে। ইব্নে বতুতা যখন সেপ্টেম্বর মাসে সিন্ধুতে পৌঁছেন সেখানে বর্ণনার মধ্যে ন’মাসের একটা ফাঁক পড়েছে বলে দেখা যায়। খুব সম্ভব তার বিবরণ কিছুটা স্থানচ্যুত–অথবা কাফেলা কিছুটা অস্বাভাবিক তাপ ভোগ করেছিল।
৪। ইব্নে বতুতা নিম্নে বছেন যে ভারতে প্রদেশের শাসক এবং উঁচু পদের কর্মচারীকে রাজা উপাধি দেওয়া হয়।
৫। লাহারির ধ্বংসাবশেষ (“ল্যারিবান্দার”) রাহু প্রণালীর উত্তর দিকে পড়ে আছে- করাচি থেকে ২৮ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব এবং এর দ্বারাই এটা স্থানচ্যুত হয়েছিল ১৮০০ সালে এর অগভীর প্রবেশ পথের জন্য। “সমুদ্র উপকুলে” কথাটি বলা ঠিক হয় না। কেননা সমুদ্র তীর কয়েক মাইল ভিতর পর্যন্ত জনশূণ্য-কারণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু প্রবাহের সময় সেটা নিয়ত প্লাবিত থাকে।
৬। ইব্নে বতুতা যে ধ্বংসাবশেষের কথা বলেছেন সেটা নিশ্চিতরূপে চেনা যায়নি। হেই বছেন এগুলি মোরা-মারির ধ্বংসাবশেষ হতে পারে, লাহারি থেকে আট মাইল উত্তর-পূর্বে এবং এ কথাও বলা হয়েছে। (প্রথমে কানিংহাম কর্তৃক) যে এগুলি দেবুল বা দেবলের। এ স্থানটি ছিল সিন্ধু তীরে অবস্থিত পূর্বের বন্দর, করাচী থেকে ৫৪ মাইল পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৭১০ ৭১৫ খ্রীষ্টাব্দে সিন্ধুদেশ আক্রমণের সময় আরবগণ এটা দখল করেছিলেন এবং পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।
৭। বাশার (ইণ্ডিয়ার গেজেটিয়ারের বুখুর) হচ্ছে সিন্ধু নদের একটি দূর্গ বেষ্টিত দ্বীপ-সুকুর এবং রোহরের মাঝখানে অবস্থিত।
৮। এই নদীটি ছিল রুইর পুরাতন প্রণালী। এটা সে সময়ে সম্মিলিত ঝিলাম এবং চেনাবকে মুলতানের নিয়ে যুক্ত করেছিল।
৯। আজুদাহান আবুহানের আগে আসা উচিৎ ছিল।
১০। কুশাই ক্কচিৎ কৃষ্ণকে বুঝায়। এটা হচ্ছে ফরাসী আরবদের ইঙ্গিত। সম্ভবতঃ এর অর্থ গোসাই। মানে ধর্মীয় গুরু। (“একটি দেবতার নামও”। প্লটের হিন্দুস্তানী ডিনারী)।
১১। মাসুদাবাদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে নাজাফগড়ের এক মাইল পূর্বে এবং পালেম। ষ্টেশনের উত্তর দিয়ে ছ’ মাইল পশ্চিমে।
১২। মধ্যযুগীয় দিল্লীর ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে বর্তমান শহরের দশ মাইল খানিক দক্ষিণে ‘খাশ দিল্লী’ জাহানপানা, এবং সিরি একটি ধারাবাহিক শ্রেণী সাহরাওলি থেকে উত্তর-পূর্বে তোলাবাদ বাশ দিল্লীর চার মাইল পূর্বে এবং আধুনিক তোলাবাদের দু মাইল পূর্বে। সুলতান মাহমুদ কর্তৃক এ শহরগুলির যে ক্ষতি সাধন করা হয়েছিল সে সব আর কখনো পূরণ করা হয়নি। এ কথা ইনে বতুতা নিম্নে উল্লেখ করেছেন। অতঃপর ১৩৯৮ সালে তৈমুর তৈমুল ক) আবার এ শহরগুলির উপর ধ্বংসকার্য করে যান। নতুন দিল্লী নির্মাণ করেন মোগল সুলতান শাজাহান (১৬২৭-৫৮)। দিল্লীর প্রথম যুগের মুসলিম সুলতানদের কিছু বিবরণ পাওয়া যাবে। ভূমিকার ২২-২৪ পৃষ্ঠায়।
১৩। নিম্নে কুতুব মিনার এবং আলাই মিনারের বিবরণের ন্যায় এখানেও ইব্নে বতুতার হিসাব অতিরঞ্জিত হয়েছে। চন্দ্রগুপ্তের লোহস্তম্ভ মুত্রা থেকে আনা হয়েছিল এবং দিল্লীতে স্থাপিত হয়েছিল এর প্রতিষ্ঠাতা কর্তৃক এগারো শতাব্দীতে। এটার ব্যাস ১৬ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ২৩ ফিট। কুতুব মিনারের উচ্চতা ২৩৮ ফিট, আই মিনারের অসম্পূর্ণ অংশের উচ্চতা (ইব্নে বতুতা এটা ভুলক্রমে কুতুবুদ্দিনের বলেছেন) ৭০ ফিট এবং তিনি যতটা বলেছেন ততটা প্রশস্ত নয়।
১৪। এখানে সুলতান মুহাম্মদ ইব্নে তুগলকের যে চরিত্র আঁকা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণভাবে ঐতিহাসিক। ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
