সুলতানের সম্মুখে তাদের হাজির করা হলো। সুলতান তৎক্ষণাৎ হুকুম দিলেন তাদের যথোপযুক্ত শাস্তিবিধানের। সুলতানের হুকুম অনুসারে আতুর লোকটিকে যুদ্ধকালীন পাথর নিক্ষেপের যন্ত্রের সাহায্যে দূরে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হলো। অন্ধ লোকটির প্রতি হুকুম হলো, তার পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নেওয়া হবে দিল্লী থেকে দৌলতাবাদ চল্লিশ দিনের পথ। হতভাগ্য অন্ধের দেহ পথেই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, শুধু পা দু’খান গিয়ে পৌঁছলো দৌলতাবাদ। সুলতানের এ কুকীর্তি দেখে সবাই নিজ নিজ আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী ফেলেই দিল্লী পরিত্যাগ করলো। ফলে দিল্লী একটি পরিত্যক্ত শহরে পরিণত হলো। একজন অতি বিশ্বস্ত লোক আমাকে বলেছেন, এ-ঘটনার পরে একদিন রাত্রে সুলতান গিয়ে প্রাসাদের ছাদের উপর উঠলেন এবং দিল্লী শহরের চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কোন গৃহে একটি প্রদীপও দেখতে পেলেন না। এমনকি কোথাও সামান্য আগুনের চিহ্ন বা ধূম উঠতেও দেখলেন না। এ দৃশ্য দেখে তিনি বলে উঠলেন “এতদিনে আমার মনে শান্তি এসেছে, আমার রাগ প্রশমিত হয়েছে। তারপরে তিনি অন্যান্য শহরের বাসিন্দাদের লিখে পাঠান দিল্লী শহরে এসে। বসবাস করতে। তার ফলে এই হলো যে, যারা দিল্লীতে এলো তাদের পরিত্যক্ত শহরগুলো তো ধ্বংস হলোই অধিকন্তু দিল্লীও আর আগের মতো জনবহুল নগরীতে পরিণত হলো না। তার কারণ দিল্পী সারা দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ শহর। ঠিক এই অবস্থায় আমরা এসে দিল্লী পৌঁছলাম। দিল্লী তখন জনবিরল শুন্য শহর।
এবার আমাদের আসল কথায় ফিরে আসা যাক। আমরা রাজধানীতে কি করে পৌঁছলাম এবং সুলতানের অধীনে চাকুরী গ্রহণ করে কি ভাবে আমার ভাগ্য ফিরে এলো। তাই এখন বলছি। আমরা দিল্পী যখন পৌঁছলাম সুলতান তখন রাজধানীর বাইরে। ছিলেন। আমরা প্রাসাদে উপস্থিত হয়ে প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরওয়াজা অতিক্রম। করতেই প্রধান নকীব আমাদের নিয়ে হাজির হলেন প্রশস্ত একটি দরবার গৃহে। এখানে উজির আমাদের প্রতীক্ষা করছিলেন। তৃতীয় দরওয়াজার পরবর্তী এই বিশাল কক্ষই হাজার উসতান’ নামে পরিচিত। সেখানে হাজির হতেই উজির আভূমি নত হয়ে আমাদের অভিবাদন জানালেন; আমরাও প্রায় তেমনি ভাবে তাকে প্রত্যাভিবাদন জানালাম। সুলতানের মসনদের উদ্দেশে নত হয়ে আমরা অঙ্গুলী দ্বারা মাঠি স্পর্শ করলাম। আমাদের এ অনুষ্ঠানটি শেষ হবার পরেই নকীব বিছমিল্লাহ’ বলে চীৎকার করে উঠলো এবং আমরা সবাই প্রস্থান করলাম।
অতঃপর সুলতানের মাতার প্রাসাদে গিয়ে আমরা তাকে কিছু উপঢৌকন দিলাম এবং আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বাসগৃহে প্রবেশ করলাম। আমাদের সেই গৃহে আসবাব-পত্র গালিচা, মাদুর, তৈজসপত্র, বিছানা প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সব কিছুই মোতায়েন দেখতে পেলাম। ভারতে ব্যবহৃত বিছানা খুবই হালকা। একজন লোকই অনায়াসে তা বহন করতে পারে। সফরে যেতে হলে সবাই তার বিছানা নিয়ে যায় এবং একটি বালক ভৃত্য তা মাথায় বহন করে মনিবের অনুসরণ করে। চারটি কুদাননা পায়ার সঙ্গে আড়াআড়ি চার টুকরা কাঠ জুড়ে এবং সেই সঙ্গে রেশমী বা সূতী ফিতা বুনে এ বিছানার সৃষ্টি। এ বিছানায় শুলে নরম অন্য কিছুরই দরকার হয় না। বিছানার সঙ্গে দুটি তোসকও দেওয়া হয়েছে, সেই সঙ্গে আছে বালিশ আর বিছানার চাদর। সবই রেশমী। এখানকার রীতি। হলো, তোষক বালিশের উপরে সূতী বা রেশমী আবরণী ব্যবহার করা। ময়লা হলে আবরণীটি ধুইয়ে ফেললেই মিটে যায়, বিছানা বরাবর পরিষ্কারই থেকে যায়।
পরদিন ভোরে আমরা গেলাম উজিরকে ছালাম করতে। তিনি আমাকে এক হাজার রৌপ্য মুদ্রাসহ দুটি তোড়া উপহার দিলেন। দিয়ে বললেন, “এ যৎসামান্য অর্থ দেওয়া হলো আপনার মাথা ধোওয়ার (সম্মানের জন্য। এছাড়া আর দিলেন চিক্কণ ছাগ-লোমে তৈরী একটি পোক। আমার সঙ্গী ভৃত্য ও গোলামদের একটি তালিকা তৈরী করে। তাদের চার পর্যায়ে ভাগ করা হলো। প্রথম পর্যায়ে যারা তারা প্রত্যেক পেলে দুশো দিনার; দ্বিতীয় পর্যায়ে দেড়শো দিনার; তৃতীয় পর্যায়ে একশো এবং সর্বশেষ বা চতুর্থ পর্যায়ে যারা তারা পেলো পঁয়ষট্টি দিনার। তারা সংখ্যায় ছিল প্রায় চল্লিশ জন। সবাই মিলে তারা মোট পেলে চার হাজার দিনারের বেশী। অতঃপর ঠিক হলো সুলতানের অতিথির বরাদ্দ। আমাদের জন্য বরাদ্দ হলো হাজার পাউণ্ড ভারতীয় ময়দা, হাজার পাউণ্ড গোশত সেই সঙ্গে ঘি, চিনি, সুপারী পান কতটা ঠিক আমার স্মরণ নেই। ভারতীয় প্রতি পাউণ্ডের ওজন হলো মরক্কোর বিশ পাউণ্ড বা মিনারের পঁচিশ পাউণ্ডের। সমান। পরে সুলতান আমার নামে কয়েকটি গ্রাম লিখে দিয়েছিলেন। তার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় পাঁচ হাজার দিনার।
সাওয়াল মাসের ৪ঠা তারিখে (৪ঠা জুন ১৩৩৪খ্রীঃ) সুলতান ফিরে এলেন রাজধানী থেকে সাত মাইল দূরবর্তী তিলবাত দূর্গে। উজির আমাদের হুকুম করলেন সেখানে গিয়ে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা দূর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সুলতানকে উপহার দেবার জন্য ঘোড়া উট, ফলমূল তরবারী প্রভৃতি সঙ্গে নিয়ে দূর্গের প্রবেশ দ্বারে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। একে একে দর্শনার্থীদের ভিতরে নিয়ে জরির কাজ করা মূল্যবান পরিচ্ছদ উপহার দেওয়া হলো। আমার পালা যখন এলো আমি ভিতরে গিয়ে দেখতে পেলাম সুলতান একখানা কেদারায় বসে আছেন। প্রথমে আমি তাকে একজন সুলতান ওমরাহ্ বলে ভুল করেছিলাম। আমি দু’বার তাকে কুর্ণিশ করার পরে সুলতানের একজন অন্তরঙ্গ ওমরাহ বলে উঠলেন “বিছমিল্লাহ্, ইনি মওলানা বদরউদ্দিন।” এখানে সবাই আমাকে বদরউদ্দিন বলে সম্বোধন করতো। মওলানা” (আমাদের প্রভু) পণ্ডিত ব্যক্তিদের উপাধি। আমি সুলতানের দিকে এগিয়ে যেতেই তিনি আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন এবং হাত ধরে রেখেই পাণীতে বললেন, “আপনার আগমন শুভ হয়েছে। আপনি নিঃসঙ্কোচে এখানে থাকুন। আপনার প্রতি খাতির যত্ন ও আমার অনুগ্রহের কোন অভাব হবে না। বরং সে সবের কথা আপনার মুখে শুনে আপনার দেশবাসীরা আপনার। সঙ্গে এসে যোগদান করবেন। এরপর তিনি আমার নামধাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি তার যথাযথ উত্তর দিলাম। আমাদের এই আলাপ আলোচনা প্রসঙ্গে যত বারই তিনি কোন উৎসাহ ব্যঞ্জক কথা বললেন ততবারই আমি তার হস্তচুম্বন করলাম। এভাবে সাতবার আমি সুলতানের হস্তচুম্বন করলাম। সমস্ত দর্শনেচ্ছুরা পরে একত্রিত হলে। সুলতান এক ভোজের আয়োজন করে তাদের আপ্যায়িত করলেন।
