ডাক্তার শামসউদ্দিন ছিলেন একাধারে দার্শনিক এবং স্বভাব কবি। তিনি একবার সুলতানের প্রশংসাসূচক একটি কবিতা রচনা করলেন। কবিতাটিতে ছিল সাতাশটি স্তবক। সুলতান প্রতিটি স্তবকের জন্য কবিকে এক হাজার রৌপ্য দিনার পারিতোষিক দিলেন। এর আগে এ-ধরণের কাব্যরচনার জন্য কোন সুলতানই এত বেশী টাকা পারিতোষিক দেন নাই। তারা সাধারণতঃ দিয়েছেন একটি কবিতার জন্যে এক হাজার দেহরাম অর্থাৎ বর্তমান সুলতানের দানের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগ। সিরাজে সাজউদ্দিন নামে একজন কাজী ছিলেন। তার জ্ঞান ও ধর্মপ্রাণতার খ্যাতি শুনে সুলতান তাঁকে দশ হাজার রৌপ্য দিনার পাঠিয়ে দেন। এ ছাড়া সমরখন্দের নিকটে সাগার্জ নামক এক জায়গায় বোরহানউদ্দিন নামে একজন ধর্মপ্রচারক ও ইমাম ছিলেন। তিনি অর্থব্যয়ের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত উদার। অনেক সময় তিনি নিজের যথাসর্ব ব্যয় করে বসে থাকতেন এবং অপরকে কিছু দেবার প্রয়োজন হলে অনায়াসে ঋণ গ্রহণ করতেন। সুলতান ইমাম বোরহানউদ্দিনের কথা শুনে তাকে চল্লিশ হাজার দিনার পাঠিয়ে দিলেন এবং সেই সঙ্গে দিল্লীতে আগমনের জন্য তাকে আমন্ত্রণ করে পাঠালেন। ইমাম পারিতোষিক গ্রহণ করে নিজের ঋণ পরিশোধ করলেন কিন্তু সুলতানের কাছে এসে দেখা করতে অস্বীকার করলেন। বলে পাঠালেন, “যে সুলতানের সম্মুখে গিয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আমি সে সুলতানের কাছে যেতে রাজী নই।”
ভারতের একজন আমীর একবার কাজীর দরবারে নালিশ করলেন, সুলতান তার ভাইকে বিনা কারণে হত্যা করেছেন। সুলতান নিরস্ত্র অবস্থায় পদব্রজে গিয়ে কাজীর দরবারে হাজির হলেন এবং যথারীতি কাজীকে অভিবাদন করলেন। সুলতান কাজীকে আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন দরবারে সুলতানের উপস্থিতিতে দণ্ডায়মান না হতে। কাজেই সুলতান কাজীর সম্মুখে সাধারণ আসামীর মত দাঁড়িয়ে রইলেন এবং কাজী সুলতানের সম্মানার্থে উঠে দাঁড়ালেন না। তাকে মামলায় রায় দিতে হলো সুলতানের বিরুদ্ধে। সুলতান সে রায় বিনাদ্বিধায় মেনে নিলেন এবং রায়ের মর্মানুসারে ফরিয়াদীকে সন্তুষ্ট করে বিদায় করলেন। আরেকবার একজন মুসলমান সুলতানের কাছে টাকা পাবে বলে নালিশ করলো। কাজী সুলতানের বিরুদ্ধে ডিগ্রি দিলেন এবং সুলতান ডিগ্রির টাকা পরিশোধ করলেন।
একবার ভারতে ও সিন্ধুতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। এক মণ গমের দাম হলো ছয় দিনার। সুলতান হুকুম দিলেন, আবাল বৃদ্ধ বনিতা বা আমীর ফকির নির্বিশেষে দিল্লীর প্রতিটি অধিবাসীকে ছয় মাসের আহার্য রাজকীয় শস্য-ভাণ্ডার থেকে খুলে দিতে। রাজকর্মচারীরা দিল্লীর অধিবাসীদের নামের তালিকা করে ফেললো। সবাই দলে দলে এসে ছয় মাসের বরাদ্দ আহার্য নিয়ে যেতে লাগলো।
দরিদ্রের প্রতি সুলতানের করুণা, সুবিচার, অসাধারণ দয়া-দাক্ষিণ্য প্রভৃতি যেসব সদ্গুণের কথা বলেছি, সে সব থাকা সত্ত্বেও তিনি নিষ্ঠুর কম ছিলেন না। এমন কি কথায় কথায় তিনি রক্তপাত করতে কসুর করতেন না। তিনি ছোট বড় সকল রকম অপরাধেরই শাস্তি বিধান করতেন। কিন্তু অপরাধীকে শাস্তি দিতে গিয়ে তিনি কখনও অপরাধীর পদমর্যাদা বা তার বিদ্যাবত্তার প্রতি লক্ষ্য রেখে শাস্তির তারতম্য করতেন না। প্রতিদিন শত শত লোককে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে, পিঠমোড়া বেঁধে সুলতানের দরবারে আনা হতো এবং তাদের মধ্যে কাউকে প্রাণদণ্ড, কাউকে প্রহার অথবা অমানুষিক ভাবে শারীরিক জ্বালা যন্ত্রণা দেওয়া হতো। তার রীতি ছিল একমাত্র শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন প্রত্যেক কয়েদীকে কয়েদখানা থেকে বের করে দরবার-গৃহে আনা হবে। শুক্রবার দিনটি কয়েদীদের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট। সেদিন তারা কিছুটা পরিষ্কার। পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে এবং কথঞ্চিৎ আরামে থাকতে পারে।
মাসুদ খাঁ নামে সুলতানের একজন বৈপিত্রেয় Hেalf-brother) ভাই ছিলেন। তার মা ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিনের কন্যা। মাসুদ খার মতো সুন্দর সুপুরুষ আমার জীবনে খুব কমই দেখেছি। তিনি বিদ্রোহের আয়োজন করছেন বলে সুলতান একবার সন্দেহ করলেন। তাই মাসুদ ধাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। মাসুদ সুলতানের ভয়ে বিশেষ করে তার দেওয়া অকথ্য শারীরিক জ্বালা যন্ত্রণার ভয়ে অপরাধ স্বীকার করলেন। তিনি জানতেন এ ধরনের অপরাধের জন্য কাউকে সন্দেহ করা হলে স্বীকারোক্তি আদায় না করা পর্যন্ত সুলতান যে অসহ্য শারীরিক অত্যাচার করতে হুকুম করেন তা সত্যিই অমানুষিক। সে অত্যাচারের চেয়ে মৃত্যুবরণ করা বরং শ্রেয়। হতভাগ্য মাসুদের স্বীকারোক্তি শুনে সুলতান হুকুম করলেন, বাজারের প্রকাশ্য স্থানে নিয়ে তার মাথা কেটে ফেলতে এবং শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে তার মৃতদেহ যথারীতি তিন দিন সেই প্রকাশ্য স্থানে ফেলে রাখতেও তিনি হুকুম দিলেন।
সুলতানের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হয় তার ভিতর সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো প্রজাদের দিল্লী শহর ত্যাগ করতে বাধ্য করা। এর কারণ হলো, প্রজারা নাকি সুলতানকে কুৎসিত গালাগালি দিয়ে চিঠি লিখৃতো। সেই চিঠি খামে ভরে রাত্রির আঁধারে তারা নিক্ষেপ করতে দরবার-গৃহে। চিঠির উপরে লিখিতভাবে অনুরোধ থাক্ততা, সুলতান ছাড়া অপর কেউ যেনো সে চিঠি না পড়েন। সুলতান সে সব চিঠি খুলে দেখতেন, তাকে উদ্দেশ্য করে গালাগালি বর্ষণ ছাড়া আর কিছুই তাতে নেই। এর কফলে সুলতান স্বভাবতঃই নিজকে অত্যন্ত অপমাণিত বোধ করতে লাগলেন। অবশেষে ক্রোধান্ধ সুলতান মনস্থ করলেন, দিল্লী শহরকে তিনি শ্মশানে পরিণত করে ছাড়বেন। এ সঙ্কল্পের পরেই তিনি দিল্লীর অধিবাসীদের সমুদয় বিষয়-সম্পত্তি কিনে ফেললেন এবং দিল্পী ত্যাগ করে তাদের সবাইকে দৌলতাবাদে গিয়ে বসবাস করতে আদেশ করলেন। তারা দিল্লী ছেড়ে যেতে প্রথমে অস্বীকার করলো। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে সুলতান ঘোষণা করে দিলেন, তিন রাত্রি পার হয়ে যাবার পরে কেউ যেনো দিল্লীতে অবস্থান না করে। অধিকাংশ লোকই দেশত্যাগের এ মর্মান্তিক আদেশ মেনে নিল, কেউ অবশ্য নিজনিজ গৃহে লুকিয়ে রইলো। সুলতান সমস্ত গৃহ-তল্লাসীর হুকুম দিলেন। সুলতানের অনুচরেরা দিল্লীর রাস্তায় দু’জন লোকের দেখা পেল। তাদের একজন বিকলাঙ্গ ও আতুর, অপর জন অন্ধ।
