তৃতীয় দরওয়াজা পার হয়েই আরেকটি প্রকাণ্ড দরবার-গৃহ। এটির নাম হাজার উস্তান বা হাজার স্তম্ভ। স্তম্ভগুলির সবই কাঠের তৈরী। স্তম্ভের মাথায় কাঠের কারুকার্য খচিত সুদৃশ্য ছাদ। ছাদের নীচেই বসে সুলতানের আম দরবার।
সাধারণ নিয়মানুযায়ী সুলতানের দরবার বসে অপরাহ্নে; কিন্তু অনেক সময় সকালের দিকেও তিনি দরবার ডাকেন। একটি ছোট বেদীর উপরে সাদা কাপের্ট বিছানো, তারই উপর সুলতানের মসনদ। পায়ের উপর পা রেখে তিনি বসেন। তার পাশে দুটি আর পেছনে একটি প্রকাণ্ড তাকিয়া। সুলতান আসন গ্রহণ করলে উজির দাঁড়ান তার সামনে, তারপর পদানুসারে অন্যান্য কর্মচারীরা। তখন নকিবরা উচ্চস্বরে বিসৃমিল্লাহ’ উচ্চারণ করে। প্রায় শতেক শান্ত্রী এসে দাঁড়ায় সুলতানের ডাইনে আর শতেক দাঁড়ায় বামে। তাদের কারো হাতে থাকে ঢাল, তলোয়ার, কারো হাতে তীর–ধনুক। অন্যান্য কর্মীরাও ডাইনে ও বামে সারি বেধে দাঁড়ায়। তারপর রাজকীয় সাজে সাজিয়ে সেখানে আনা হয় ষাটটি ঘোড়া। ঘোড়াগুলির অর্ধেক দাঁড় করানো হয় ডাইনে অর্ধেক বামে। তারপরে আনা হয় পঞ্চাশটি হাতী। হাতীগুলির পিঠে রেশমী বস্ত্রের আচ্ছাদন। দাঁত মোড়ানো হয়েছে লোহা দিয়ে। হাতীর এই লোহা বাঁধানো দাঁত দিয়ে প্রাণদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামীদের হত্যা করা হয়। প্রতিটি হাতীর উপর একজন করে মাহুত। মাহুতের হাতে ছোট কুঠার জাতীয় একটি লোহার অস্ত্র। হাতীর পিঠে প্রকাণ্ড সিন্দুকের মত একটি বস্তু। এর ভিতর কমবেশী কুড়িজন যোদ্ধা অনায়াসে থাকতে পারে। এই হাতীগুলিকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে মাথা নত করে সুলতানকে যথারীতি কুর্ণিশ করতে। হাতীগুলি যখন একযোগে সুলতানকে কুর্ণিশ করে, নকিব, নায়েব ও দেওয়ান প্রভৃতি কর্মচারীরা তখন পুনরায় উচ্চস্বরে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে উঠে। এরপর একে একে লোকজন এসে যখন নিজ-নিজ নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়ায় নকিবরা তখনও বিবিল্লাহ্’ বলে। আগন্তকের পদ-মর্যাদানুসারে বিসমিল্লাহ্ বলার সুরের উচ্চতা বাড়ানো বা কমানো হয়। বিধর্মী এসে যদি সুলতানকে কুর্ণিশ জানায় তাহলে নকিবেরা বিসমিল্লাহর পরিবর্তে বলে ওঠে খোদা তোমাকে সুপথে চালিত করুন।
যদি সুলতানের জন্য কোন উপঢৌকন নিয়ে কেউ দরওয়াজায় এসে হাজির হয়, নকিবরা তখন সুলতানকে গিয়ে সে খবর পৌঁছায়। সুলতানের কাছে পৌঁছতে তিন জায়গায় তিনবার তাদের কুর্ণিশ জানাতে হয়। আগন্তুককে নিয়ে যাবার হুকুম পেলে প্রথমে একজন পরিচারকের হাতে উপঢৌকনের বস্তু পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরিচারক সেগুলি নিয়ে সুলতানের কাছে দাঁড়ায়। এরপর সুলতান আগন্তককে কাছে ডাকেন। আগন্তককেও যেতে-যেতে তিনবার কুর্ণিশ জানাতে হয়। তাকে সর্বশেষ আরেকবার কুর্ণিশ করতে হয় সুলতানের কাছে পৌঁছে। সুলতান তখন অত্যন্ত আদর সহকারেই আগন্তককে সম্বোধন করেন ও যথারীতি কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন। আগন্তক তেমন উপযুক্ত পাত্র হলে সুলতান তার সঙ্গে মোসাহেফা করে বা আলিঙ্গন দিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। পরে উপঢৌকনের জিনিষগুলি হাত দিয়ে নেড়ে দেখে নিজের সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করেন; এবং উপঢৌকন দাতাকে উৎসাহিত করেন। সুলতান আগন্তকদের অনেক সময় সম্মানসূচক পোষাক দান করেন এবং সেই সঙ্গে কিছু নগদ অর্থ দিয়ে থাকেন।
সুলতান যখন কোন দেশভ্রমনের পরে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন তার হাতীগুলিকে সাজানোনা হয় সুন্দর করে। মোলটি হাতীর উপরে রঙ্গীন রেশমী মোলটি ছাতা। ছাতাগুলি সোনা ও জহরতের কারুকার্য খচিত থাকে। পথের স্থানে স্থানে তৈরী করা হয় কয়েকতলা উঁচু কাঠের মঞ্চ। মঞ্চগুলিও মণ্ডিত করা হয় রঙ্গীন রেশমী বস্ত্র দিয়ে। মঞ্চের প্রত্যেক তলায় নৃত্যরত সুসজ্জিত নর্তকীর দল। প্রত্যেকটি মঞ্চের মধ্যস্থানে চামড়ার তৈরী জলাধার। তার ভিতর রাখা আছে সুপেয় সরবৎ। দেশী-বিদেশী নির্বিশেষে সবাইকে সরবৎ পান করতে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে বিতরণ করা হয় পান সুপারী। দুই সারি মঞ্চের মধ্যবর্তী পথেও কাপড় বিছিয়ে দেওয়া হয়। সুলতানের অশ্ব তার উপর দিয়েই যায়। পথের দুপাশের বাড়ীর দেয়ালগুলিতেও রঙ্গীন কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নগরের প্রবেশদ্বার থেকে আরম্ভ করে প্রাসাদ পর্যন্ত এভাবে সাজানো হয়। সুলতানের গোলামদের থেকে বাছাই করা একদল পদাতিক মিছিলের সম্মুখভাগে চলতে থাকে। তাদের সংখ্যা হবে কম করেও কয়েক হাজার। মিছিলের পেছনে থাকে জনসাধারণ এবং সৈন্যদল।
একবার সুলতানের রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনের সময় দেখেছিলাম হাতীর পিঠে রাখা। হয়েছে তিন চারিটি গুতি (Catapults)। সুলতানের রাজধানীতে পদার্পণের সময় থেকে শুরু করে প্রাসাদের প্রবেশ পর্যন্ত সর্বক্ষণ সেই গুতির সাহায্যে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা নিক্ষেপে করা হচ্ছে দর্শক জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে।
এখন আমি সুলতানের দানশীলতা ও উদারতার কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি।
শেহাবউদ্দিন ছিলেন কাজরুণের একজন প্রসিদ্ধ সওদাগর। সে সময়ে আল কাজীরুণী নামে ভারতেও একজন খ্যাতনামা সওদাগর ছিলেন। দুজনের মধ্যে বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। আল-কাজরুণীর দাওয়াত পেয়ে একবার শেহাবউদ্দিন এলেন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। সুলতানের জন্য মুল্যবান উপহার সামগ্রী তিনি সঙ্গে এনেছিলেন। দুইবন্ধু উপহারের জিনিসপত্র নিয়ে সুলতানের কাছে আসবার পথে একদল বিধর্মীর দ্বারা আক্রান্ত হন। বিধর্মীরা আল-কাজারুণীকে পথেই হত্যা করে এবং সমস্ত মালপত্র অপহরণ করে। সওদাগর শেহাবউদ্দিন কোন রকমে পালিয়ে প্রাণরক্ষা করেন। তাই লুণ্ঠন ও নরহত্যার সংবাদ কানে যেতেই সুলতান শেহাবউদ্দিনকে ত্রিশ হাজার দিনার দিয়ে স্বদেশে পাঠিয়ে দিতে হুকুম করলেন। কিন্তু সওদাগর শেহাবউদ্দিন তাতে রাজী হলেন না। তিনি বলে পাঠালেন আমি এজন্য আসিনি। আমি এসেছিলাম মহামান্য সুলতানকে দর্শনের বাসনা নিয়ে। শেহাবউদ্দিনের কথা পুনরায় সুলতানকে লিখে জানানো হলো। সুলতান পরম সন্তুষ্ট হয়ে হুকুম করলেন শেহাবউদ্দিনকে সসম্মানে দিল্লীতে নিয়ে আসতে। শেহাবউদ্দিন দিল্লী পৌঁছে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতেই তিনি তাকে মূল্যবান উপহার দিয়ে সমাদর জানালেন। তারপরে কয়েক দিন শেহাবউদ্দিনকে অনুপস্থিত দেখে সুলতান তার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। শুনা গেল তিনি অসুস্থ। সুলতান একথা শুনেই তার একজন পারিষদকে হুকুম করলেন খাজাঞ্চীখানা থেকে এক লক্ষ স্বর্ণ টংগা (তা) বের করে শেহাবউদ্দিনকে দিতে। (এক টগা মরক্কোর আড়াই দিনারের সমান) এ টাকা দিয়ে ভারতীয় যে কোন পণ্য কিনে দেশে নিয়ে যাবার স্বাধীনতাও শেহাবউদ্দিনকে দেওয়া হলো। সুলতান হুকুম দিলেন শেহাবউদ্দিনের সওদা কিনা শেষ হবার আগে সে সওদা আর কেউ যেনো না কিনে। তাছাড়া সম্পূর্ণ লোক-লস্কর ও সাজসরঞ্জামসহ তিনখানা জাহাজও সুলতান মঞ্জুর করলেন শেহাবউদ্দিনকে পৌঁছে দিতে। শেহাবউদ্দিন হরমুজ দ্বীপে গিয়ে প্রকাণ্ড একটি গৃহ নির্মাণ করলেন। আমি পরে এ-গৃহটি দেখেছিলাম এবং শেহাবউদ্দিনকেও দেখেছিলাম সর্বস্বান্ত হয়ে সিরাজের সুলতানের কাছে দান ভিক্ষা করতে। ভারতের ধন-দৌলতের রীতিই ছিল এই। ক্কচিৎ এখান থেকে ধন-দৌলত নিয়ে কেউ স্বদেশে ফিরে যেতে পারে। যদি কখনও কেউ ধন-দৌলত নিয়ে যায় তবে এমন এক বিপদে সে পড়বে যার ফলে অচিরেই তাকে যথাসর্বস্ব খোয়াতে হবে। হরমুজের বাদশাহ ও তার ভ্রাতুস্পুত্রদের মধ্যে এক গৃহবিবাদের ফলে শেহাবউদ্দিন সব কিছু ছেড়ে হরমুজ ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।
