দিল্লীর বাইরে প্রকাণ্ড একটি জলাশয়ের নামকরণ হয়েছে সুলতান লালমিশের নামে। দিল্লীর অধিবাসীরা এখান থেকেই পানীয় জল সংগ্রহ করে। বৃষ্টির জলে পূর্ণ এ জলাশয়টি দু’মাইল লম্বা এবং এক মাইল চওড়া। এর মধ্যস্থলে চৌকোণ পাথরে তৈরী দু’তলা একটি অট্টালিকা। জলাশয়টি যখন পরিপূর্ণ থাকে তখন শুধু নৌকাযোগে এ অট্টালিকায় যাওয়া যায়, অন্য সময় সর্ব-সাধারণ নৌকার সাহায্যে ছাড়াই যেতে পারে। এর ভেতর একটি মসজিদও আছে। প্রায় সর্বদাই মসজিদটি মুছল্লিদের দ্বারা পূর্ণ থাকে। জলাশয়ের পাড়গুলো শুকিয়ে গেলে এখানে ইক্ষু, শশা, তরমুজ ও লাউ প্রভৃতি গাছ লাগানো হয়। তরমুজ ও লাউগুলো আকারে ছোট কিন্তু খেতে মিষ্টি। দিল্লীও খলিফার আবাসস্থানের মধ্যবর্তী স্থানে বৃহত্তর আরও একটি জলাশয় আছে। এর চারিপার্শ্বস্থ চল্লিশটি অট্টালিকায় গায়ক ও বাদ্যকরগণ বাস করে।
দিল্লীর জ্ঞানী ও ধার্মিক অধিবাসীদের মধ্যে এমাম কামালউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ ও স্ত্র। দিল্লী নগরের বাইরের এক গুহায় তিনি বাস করতেন এবং গুহাবাসী। বলে পরিচিত ছিলেন। আমার একজন ক্রীতদাস বালক একবার পালিয়ে যায়। কিছুদিন পর তাকে আমি দেখতে পাই একজন তুর্কীর গৃহে। আমি বালকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করি। কিন্তু শেখ কামালউদ্দিন আমাকে সে কাজে নিবৃত্ত করেন। তিনি বলেছিলেন বালকটি তোমার পক্ষে ভাল হবে না, তাকে না আনাই উচিত। তুর্কী ভদ্রলোক আমার সঙ্গে রফা করতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি আমাকে একশত দিনার দিয়ে বালকটিকে নিজের কাছে রেখে দেন। এর ছয় মাস পরে একদিন ঐ বালক তার মনিবকে হত্যা করে। সুলতানের বিচারে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় তুর্কীর পুত্রদের হাতে। অবশেষে তারাও বালকটিকে হত্যা করে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করে। শেখের এ অলৌকিক শক্তি দেখে আমি তার প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হয়ে পড়ি এবং পার্থিব জগৎ ছেড়ে নিজের যা-কিছু ছিল সব গরীর দুঃখীদের বিলিয়ে দেই। কিছু দিন আমি তার সঙ্গে বাস করেছিলাম; তাকে দেখতাম তিনি দশ দিন রোজা রাখেন এবং রাত্রির অধিকাংশ সময় দাঁড়িয়ে এবাদৎ করেন। এমাম কামালউদ্দিনের সঙ্গে কিছুদিন কাটানোর পর। সুলতান আমাকে ডেকে পাঠান এবং তার ফলে আমি পুনরায় পার্থিব জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি।
সমস্ত মানুষের মধ্যে এই সুলতানের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল একাধারে রক্তপাত করা এবং দান ধ্যান করা। তার দ্বারে হয়ত দেখা যেত একজন দরিদ্রকে বিত্তশালী হতে অথবা একজন জীবন্ত লোককে প্রাণদান করতে। এর কোন ব্যতিক্রম প্রায়ই হতো না। তার দানশীলতা ও সাহস এবং অপরাধীদের প্রতি অত্যাচার ও নির্মম ব্যবহারের অনেক। গল্প পাঠানদের মধ্যে প্রচলিত আছে। তা হলেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে এবং সাম্য ও সুবিচার দেখতে সর্বদাই প্রস্তুত থাকতেন। তাঁর দরবারে ধর্মীয় সব অনুষ্ঠানগুলোই কঠোরভাবে পালন করা হতো। নামাজ আদায়ের জন্যও তিনি কঠোর ব্যবস্থা করতেন এবং নামাজে অবহেলা দেখালে কঠিন শাস্তি বিধান করতেন।
তার মধ্যে সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার দানশীলতা। এ-সম্বন্ধে এমন কতকগুলো গল্প আমি বলব, যার চমৎকারিত্ব অপর যে-কোন গল্পকে ছাড়িয়ে যায়। আমি খোদা, ফেরেস্তাগণ এবং পয়গম্বরকে সাক্ষী রেখে বলতে পারি,সুলতানের অসাধারণ দয়া দাক্ষিণ্যের সে সব গল্প বর্ণে বর্ণে সত্য। আমি জানি, যে-সব কাহিনীর বর্ণনা আমি দেব, তার কিছুটা অনেকেরই কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে, কেউ কেউ অসম্ভব বলেও মনে করবেন। কিন্তু-যা কিছু আমি স্বচক্ষে দেখেছি, যার ভেতরে আমি নিজেও অংশতঃ জড়িত ছিলাম, তার সম্বন্ধে সত্য কথা না বলে উপায় কি?
দিল্লীতে সুলতান মাহমুদের যে প্রাসাদ তা’ দার-সারা নামে পরিচিত। দার-সারার দরওয়াজা ছিল অনেকগুলি। প্রথম দরওয়াজায় থাকত দ্বাররক্ষীর দল, তার একটু দূরে জয়ঢাক ও শানাই বাদকেরা। এদের কাজ হল যখন কোন আমীর ওমরাহ বা বিখ্যাত। কোন ব্যক্তি দরবারে আসেন তখন নিজের নিজের বাজানো এবং আগন্তকের নাম। ঘোষণা করা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরওয়াজায় ঠিক একই ব্যবস্থা। প্রথম দরওয়াজার। বাইরে আছে কয়েকটি বেদী। বেদীর উপরে মোতায়েন থাকে একদল জল্লাদ, তাদের ভিতর নিয়ম হল, বাদশাহ কারও প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে। দরবার-গৃহের সামনে। সেখানেই তার প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা। প্রাণদণ্ডের পরে লাশটি সেখানেই তিনরাত্রি ফেলে রাখা হয়।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরওয়াজার মধ্যবর্তী স্থানে একটি প্রকাণ্ড বেদীর উপরে বসে প্রদান নকিব। নকিবের হাতে সোনার রাজদণ্ড। মাথায় স্বর্ণও মণিমুক্তা খচিত পাগড়ী। পাগড়ীর উপরে ময়ুরের পালক। দ্বিতীয় দরওয়াজা দিয়ে এগিয়ে গেলেই সুবিস্তৃত দরবার-গৃহ। দর্শকদের বসবার নির্দিষ্ট স্থান।
তৃতীয় দরওয়াজায় যে বেদী আছে তাতে বসে লেখক বা মুন্সীগণ। সুলতানের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অপর কেউ যাতে এ-দরওয়াজা দিয়ে ঢুকতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা মুন্সীদের একটি প্রধান কাজ। অনুমতি প্রাপ্ত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কর্মচারীদের কে কে আসবে তারও নির্দেশ সুলতানই দেন। এই দরওয়াজার কেউ এলেই মুগীরা তৎক্ষণাৎ তার পরিচয় এবং আগমনের সময় লিখে রাখে। সাধারণতঃ মাগরেবের নামাজের পরে সুলতান এগুলো দেখেন। মুসীদের আরেকটি কাজ হল, প্রাসাদে যারা অনুপস্থিত থাকে তাদের হিসেব রাখা। সুলতানের অনুমতি নিয়ে অথবা বিনা অনুমতিতে প্রাসাদের কেউ যদি তিন দিন বা তার বেশী অনুপস্থিত থাকে তবে পুনরায় অনুমতি লাভের আগে প্রাসাদে ঢুকতে পায় না। যদি কেউ অসুস্থতা বা অন্য কোন অজুহাত দেখায় তবু নিজের ক্ষমতানুযায়ী কিছু উপঢৌকন নিয়ে আসতে হয়। সুলতানের জন্য।
