সেখানে গিয়েই জলাশয়ে নেমে বিধবারা তাদের কাপড় জামা ও গহনা খুলে ফেলল। সেগুলো সবই ভিক্ষাস্বরূপ দান করা হলো। তারপর তাদের প্রত্যেককে। একখানা করে মোটা কাপড় দেওয়া হলো। তারই এক অংশ কোমরে জড়িয়ে বাকি অংশে তারা মাথা কাঁধ ঢাকলো। জলাশয়ের কাছে নিচু জায়গায় আগুন জ্বালা হয়েছে। আগুনের শিখা যাতে বেড়ে ওঠে সেজন্য ঢেলে দেওয়া হয়েছে তিলের তেল। জনপনর। দাঁড়িয়ে আছে সরু কাঠ নিয়ে আর জনদশেক রয়েছে কাঠের মোটা-মোটা টুকরো নিয়ে। জয়ঢাক ও দামামা বাজনাওয়ালারা বিধবাদের আসবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আগুন দেখে যাতে বিধবারা ভয় না পায় সে-জনন্য কয়েকজনে কম্বল ধরে আগুন ঢেকে রেখেছে। বিধবাদের একজনকে দেখলাম, এসে তাদের হাত থেকে কম্বলটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল। তারপর বলে উঠল, আগুন দেখিয়ে আমাকে ভয় পাওয়াবে? এ যে আগুন তা আমি জানি। আমাকে ছেড়ে দাও। এই বলে সে জোড়হাত মাথায় ঠেকিয়ে আগুনকে নমস্কার করে তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে এক সঙ্গে জয়ঢ়ক, দামামা আর সিঙ্গা বেজে উঠল। প্রথমে সরু কাঠগুলো নিক্ষেপ করা হলো। অতঃপর বিধবা নারী যাতে না নড়তে পারে সেজন্যে মোটা কাঠগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। সবাই ভীষণ সোরগোল করে উঠল। আমার সঙ্গীরা যদি তাড়াতাড়ি করে পানি এনে আমার মুখে ছিটিয়ে না দিতো তাহলে আমি ঘোড়া থেকে পড়েই যেতাম। এরপরই সেখান থেকে চলে এলাম।
গঙ্গানদীতে ডুবে আত্মহুতি দেবার প্রথাও ভারতীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে। গঙ্গানদীতে হিন্দুরা তীর্থস্নানে যায় এবং চিতাভস্ম নিক্ষেপ করে। তারা বলে থাকে, গঙ্গা স্বর্গের নদী। গঙ্গায় ডুবে যারা আত্মাহতি দিতে যায় তারা বলে যে, কোনো পার্থিব কারণে তারা ডুবে মরছে না, ডুবে মরছে কুশাই (গোশাই) এর সান্নিধ্য লাভের জন্যে। তাদের ভাষায় গোশাই ঈশ্বরের নাম। গঙ্গায় ডুবে যারা মরে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে দাহ করা হয় এবং দেহাবশেষ পুনরায় গঙ্গায়ই নিক্ষেপ করা হয়।
এবার আমাদের পূর্বের আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসা যাক। আজুদাহান থেকে রওয়ানা হয়ে চার দিন চলার পর আমরা এসে হাজির হলাম সারাসাতি (সারসুতি বা সিরসা) শহরে। এখানে উৎকৃষ্ট ধরণের এক প্রকার চাউল পাওয়া যায়। সে চাউল রাজধানী দিল্লীতে রপ্তানী হম্।এ-শহরের রাজস্বের আয় খুব বেশী; কিন্তু আয়ের সঠিক পরিমাণ কত তা আমার মরণ নেই। সেখান থেকে আমরা যাই হাসিতে। হাসি সুন্দরভাবে তৈরী জনবহুল একটি চমৎকার শহর। শহরটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দু’দিন পরে হাসি থেকে আমরা এসে হাজির হলাম মাসুদাবাদে। মাসুদাবাদ দিল্লী থেকে দশ দিনের পথ। সেখানে আমরা তিন দিন কাটাই। সুলতান সে সময় রাজধানীর বাইরে কনৌজে ছিলেন। কনৌজ দিল্লী থেকে দশ দিনের পথ। সুলতানের উজির এবং বেগমমাতা তখন রাজধানীতে হাজির ছিলেন। আমাদের অভ্যর্থনার জন্যে উজির কয়েকজন উপযুক্ত কর্মচারী পাঠিয়ে ছিলেন। দূতের সাহায্যে পত্র দিয়ে সুলতানকে তিনি আমাদের আগমন সংবাদও পাঠিয়েছিলেন। মাসুদাবাদে আমরা যে তিনদিন কাটালাম তারই মধ্যে সুলতানের জবাব এসে হাজির হল। কাজী, চিকিৎসক, শেখ আর আমীরদের কয়েকজন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। অতঃপর আমরা মাসুদাবাদ থেকে রওয়ানা হয়ে পালাম নামক একটি গ্রামের কাছে এসে বিশ্রাম করলাম। পরের দিন পৌঁছলাম দিল্লীতে।
ভারতের প্রধান নগর দিল্লী যেমনি বিশাল, তেমনি ঐশ্বর্যশালী। শক্তি ও সৌন্দর্যের চমৎকার সমন্বয়। দিল্লী নগর যেরূপ প্রাচীরে ঘেরা, পৃথিবীতে তার তুলনা নেই। শুধু ভারতেরই নয়–সমগ্র মুসলিম প্রাচ্যের বৃহত্তম নগর দিল্লী।
দিল্লী নগর আশেপাশের চারটি শহর নিয়ে গঠিত। প্রথমটি হিন্দু বিধর্মীদের তৈরী খাঁটি দিল্লী। এ-শহরটি মুসলমান দখলে আসে ১১৮৮ খৃস্টাব্দে। দ্বিতীয় শহরটির নাম। সিরি। সিরি খলিফার বাসস্থানরূপেও পরিচিত ছিল। আব্বাসীয় বংশের খলিফা মুস্তাসিরের পৌত্র গিয়াস উদ্দিনকে সুলতান এ-শহরটি দান করেছিলেন। তৃতীয় শহরটির নাম তোগলকাবাদ। বর্তমান সুলতানের পিতা সুলতান তোগলক এ-শহরের নির্মাণকর্তা। শহরটি নির্মাণের একটি বিশেষ কারণ আছে। পূর্ববর্তী কোন এক সুলতান মোহাম্মদ তোগলককে একবার পরামর্শ দিয়েছিলেন ঠিক এ-জায়গাটিতে একটি শহর তৈরী করতে। সুলতান তোগলককে সেদিন পরিহাস করে বলেছিলেন, তুমি যখন সুলতান হবে তখন এখানে শহর তৈরী করো। খোদার ইচ্ছায় কালক্রমে তিনি সুলতান হলেন এবং এখানে সত্যই একটি শহর নির্মাণ করে নিজের নামে তার নাম করণ করলেন। চতুর্থ শহরটির নাম জাহানপানা। বর্তমান সুলতানের বাসস্থানরূপে এটি পৃথক। করা। তিনিই এ-শহরটি নির্মাণ করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল একটি প্রাচীর দিয়ে তিনি শহর চারিটি একত্র ঘিরে ফেলবেন। এ-প্রাচীরের কিছুটা তৈরী হলে তার বিপুল ব্যয়ের বিষয় বিবেচনা করে তিনি সে কাজ ত্যাগ করেন।
দিল্লীর প্রসিদ্ধ মসজিদটি বিস্তৃত জায়গা জুড়ে তৈরী। মসজিদের দেয়াল, ছাদ ও মেঝে সাদা মার্বেলের তৈরী। সুন্দরভাবে চৌকোণ করে কাটা পাথরগুলো সীসা দিয়ে। আঁটা। মসজিদের কোথাও কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। এবং তেরটি গুম্বুজ সবই পাথরের তৈরী। মিম্বরটিও পাথরের তৈরী। মসজিদের মধ্যস্থানে বিস্ময়কর একটি মিনার। মিনারটি কি ধাতুর তৈরী কেউ তা বলতে পারে না। এখানকার একজন বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন মসজিদের মিনারটি হাত কুশ’ বা সপ্ত ধাতুর মিশ্রণে প্রস্তুত। মিনারের এক। আঙ্গুল চওড়া একটি অংশ পালিশ করা হয়েছে। সে অংশটি বেশ চঞ্চকে। লোহা এর উপর কোন দাগ কাটে না। মিনারটি ত্রিশ হাত লম্বা। পুব দিকের প্রবেশ দ্বারে পাথরের উপরে দুটি পিতলের মূর্তি ফেলে রাখা হয়েছে। যে-কোন মসজিদে ঢুতে বা বেরিয়ে যেতে মূর্তিগুলোর উপর পা দিয়ে যায়। পূর্বে এ স্থানটিতে একটি দেব মন্দির ছিল। পরে দিল্লী মুসলমান অধিকারে এলে এটিকে মসজিদে পরিণত করা হয়। মসজিদের উত্তরাংশে মিনার। এর সঙ্গে তুলনা হয় এমন একটি মিনারও ইসলাম-জগতে আর নেই। সুউচ্চ এ-মিনারটি লাল পাথরের তৈরী এবং কারুকার্যময় লিপি-শোভিত। মিনারের মাথার গোলকটি উজ্জ্বল শ্বেতপাথরের তৈরী এবং উপরের ছোট গোলকগুলো স্বর্ণ নির্মিত। উপরে উঠবার সিঁড়িটি এত প্রশস্ত যে, একটি হাতী উপরে উঠে যেতে পারে। একজন বিশ্বাসযোগ্য লোকের মুখে শুনেছি, পাথর নিয়ে একটি হাতাঁকে তিনি ঐ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যেতে দেখেছেন। সুলতান কুতুবউদ্দিন মসজিদের পশ্চিমাংশে এর চেয়েও উচ্চ একটি মিনার প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার এক তৃতীয়াংশ তৈরী হতেই তিনি এন্তেকাল করেন। এ-মিনারটি পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য বস্তু। এ-মিনারের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি তিনটি হাতী উপরে উঠে যেতে পারে। এ-অসমাপ্ত মিনারের এক-তৃতীয়াংশই উচ্চতায় অপর মিনারটির সমান। কিন্তু অসমাপ্ত মিনারটি প্রশস্ত বলে দেখতে এতটা উচ্চ মনে হয় না।
