আমাদের মূলতান পৌঁছবার ছ’মাস পরে একদিন বাদশার একজন কর্মচারী এসে হাজির। তাঁর সঙ্গে এলেন পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা। তারা এলেন আমাদের দিল্লী যাত্রার আয়োজন করতে। প্রথমেই তারা আমার ভারত আগমণের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। ভারতের সুলতানকে সম্মান করে বলা হতো খোন্দআলম বা দুনিয়ার প্রভু। তাদের প্রশ্নের। উত্তরে আমি বললাম, খোন্দআলমের খেদমতে এসেছি তার অধীনে চাকুরী করব বলে। সুলতানের হুকুম ছিল, ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে না এলে খোরসানের কাউকে ভারতে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। আমার উত্তর শুনে তারা একজন কাজী এবং একজন দলিল লেখককে ডাকলেন। আমার ও আমার সঙ্গীদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাক্ষী-সাবুদ রেখে রীতিমত একটা দলিল তৈরি হল। সঙ্গীদের কেউ-কেউ অবশ্য স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রস্তাবে অসম্মত হল। অতঃপর আমাদের মধ্যে শুরু হল রাজধানী দিল্লী যাত্রার আঞ্জাম। মূলতান থেকে দিল্লী বিভিন্ন জনপদের মধ্যে দিয়ে একটানা চল্লিশ দিনের পথ। আমার সহযাত্রীদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিলেন তিরমিজের কাজী খোদাওজাদা। তিনি রওয়ানা হয়েছেন স্ত্রী ও পুত্রকন্যাদের নিয়ে। মূলতানের চল্লিশ জন বাবুর্চি এসেছে তার সঙ্গে। প্রতি রাত্রে তারা আহার্য প্রভৃতি তৈরি করে।
মূলতান থেকে রওয়ানা হয়ে আমরা এসে পৌঁছি আবুহার নামক শহরে। ভারতের মাটিতে পা দিয়ে ঐটিই আমাদের প্রথম শহর। এ-শহরের পরেই এক দিনের পথব্যাপী। বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। সমতল ভূমির শেষপ্রান্তে দূরধিগম্য পর্বতশ্রেণী-হিন্দু বিধর্মীদের বাস স্থান। তাদের অনেক মুসলমান শাসনাধীনে রায়ত। শাসনকর্তার নিযুক্ত একজন মুসলিম সর্দারের অধীনস্থ গ্রামে তারা বাস করে। আর অবশিষ্ট সবাই বিদ্রোহী এবং যোদ্ধা। পার্বত্য দূর্গে বসবাস করে এবং লুটতরাজের জন্যে দল বেঁধে বেরিয়ে আসে। এ-পথে আসতেই আমাদের সঙ্গে একদল দস্যুর সাক্ষাৎ হয়। ভারতবর্ষে আমার সঙ্গে দস্যুর সংঘর্ষ ঐ প্রথম। আমাদের প্রধান দলটি আবুহার ত্যাগ করে এসেছিল খুব। ভোরে। আমি আমার ক্ষুদ্র দলবল নিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম মধ্যাহ অবধি। আরবী, পারশী ও তুর্কী মিলিয়ে আমাদের দলে ছিলাম মোট বাইশ জন ঘোড়-সওয়ার। সমতল ভূমিতে পৌঁছতেই আশিজন বিধর্মী এসে আমাদের আক্রমন করে। তাদের মধ্যে মাত্র দু’জন ছিল ঘোড়-সওয়ার। আমার সঙ্গীরা সবাই ছিল সাহসী এবং সুদক্ষ। যুদ্ধে বিপক্ষের একজন ঘোড়সওয়ার এবং বার জন পদাতিক মারা গেল। শত্রু পক্ষের একটি তীরে আমি এবং অপর একটি তীরে আমার ঘোড়াটি আহত হয়ে পড়ল। খোদা আমাকে রক্ষা করলেন, তাদের তীরগুলো মোটেই দ্রুতগামী ছিল না। আমাদের দলের আরও একজনের ঘোড়া আহত হয়েছিল। শত্রুদের যে-ঘোড়াটা আমরা ধরেছিলাম সেটাই তাকে দেওয়া হলো। আহত ঘোড়াটা হত্যা করে আমাদের দলের তুর্কীদের দেওয়া হলো খেতে। মৃত বিধর্মীদের মাথাগুলো কেটে নিয়ে আমরা আবুবকরের প্রাসাদে গিয়ে যখন পৌঁছলাম, রাত্রি তখন দ্বিপ্রহর। মাথাগুলো দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হলো।
দু’দিন পরে আমরা হাজির হলাম আজুদাহান (পাপত্তন) শহরে। ছোট এই শহরটির মালিক ধর্মপ্রাণ শেখ ফরিদউদ্দীন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে আমি তাবুতে ফিরছিলাম, দেখতে পেলাম আশেপাশের লোকজন সবাই ছুটাছুটি করে বেরিয়ে। আসছে। আমাদের দলেরও অনেকে তার মধ্যে আছে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, একজন হিন্দু কাফেরের মৃতদেহ দাহ করবার আয়োজন হয়েছে। মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকেও। সেই সঙ্গে দাহ করা হবে। দাহকার্যের পর আমার সঙ্গীরা এসে বলল, এই হিন্দু নারী। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মৃতদেহটি আলিঙ্গন করেই ছিল।
এ-ঘটনার পর প্রায়ই দেখেছি মূল্যবান পোষাক ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে চলেছে। ঘোড়-সাওয়ার হিন্দুনারী। তার পশ্চাতে থাকে অনুসারী দল; সম্মুখে বাজতে থাকে দামামা ও জয়ঢাক। তার সঙ্গে থাকে ব্রাহ্মণগণ। হিন্দুধর্মে ব্রাহ্মণরাই বর্ণশ্রেষ্ঠ। সুলতানের রাজত্বে হিন্দুদের সতীদাহের জন্য সুলতানের অনুমতি চাইতে হয় এবং চাইলেই তার অনুমতি পাওয়া যায়। স্বামী মৃত দেহের সঙ্গে স্ত্রীকে দাহ করা হিন্দুদের। পক্ষে একটি প্রশংসনীয় কাজ; কিন্তু অবশ্য কর্তব্য নয়। কোনো পরিবারে সতীদাহ হলেই সে পরিবারের সম্মান বেড়ে যায় এবং সতীত্বেরও প্রশংসা হয়। কোনো বিধবা সহমরণে সম্মত না-হলে তাকে মোটা কাপড় পরাতে হয়, এবং আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে থেকেই বিষাদময় জীবন যাপন করতে হয়; কিন্তু কেউ সহমরণে বাধ্য করতে পারে না।
একবার আমজরি (ধর এর নিকটবর্তী আমঝেরা) শহরে আমি তিনজন বিধবাকে দেখেছিলাম। তাদের তিনজনেরই স্বামী যুদ্ধে নিহত হয়েছে এবং তারা সহমরণে স্বীকৃত হয়েছে। মূল্যবান পোক সজ্জিত হয়ে এবং গন্ধদ্রব্য মেখে তারা এক একটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়েছে। প্রতিজনের ডান হাতে একটি নারকেল, বাঁ হাতে মুখ দেখার আর্শি। তাদের ঘিরে চলেছে ব্রাহ্মণ এবং আত্মীয়-স্বজনের দল। আগে আগে চলেছে জয়ঢাক, দামামা আর শিক্ষা বাদকের দল। সঙ্গের বিধর্মীরা প্রত্যেকেই বিধবাদের মারফত স্ব-স্ব মৃত পিতা, মাতা বা বন্ধুর কাছে শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের অনুরোধ জানাচ্ছে। বিধবারাও মৃদু হেসে সম্মতি জানাচ্ছে। সতীদাহ কিভাবে করা হয় দেখবার জন্যে সঙ্গীদের নিয়ে। ঘোড়ায় চড়ে আমি তাদের অনুসরণ করলাম। তিন মাইল পথ গিয়ে আমরা এসে। পৌঁছলাম একটা অন্ধকার জায়গায়। জায়গাটা সেঁতসেঁতে এবং ঝাড়াগাছে পূর্ণ। তার। মধ্যে রয়েছে চারিটি বেদী। বেদীর ওপর একটি করে পাথরের মূর্তি। বেদীগুলোর মধ্যস্থলে একটি ক্ষুদ্র জলাশয়। গাছের নিবিড় ছায়ায় জলাশয়টি এ-ভাবে ঢেকে আছে। যে, সূর্যের আলো সেখানে কখনও প্রবেশ করতে পারে না। জায়গাটা মনে হয় নরকের মত–খোদা আমাদের সে নরক থেকে রক্ষা করুন।
