এমনি করে পাঁচদিন চলার পর আমরা এসে পৌঁছলাম আলা-অল-মূলকের এলাকা লাহারী শহরে। সমুদ্রতীরে সিন্ধুনদীর মোহনায় লাহারী একটি চমৎকার শহর। এখানে বড়ো রকমের একটি পোতাশ্রয় আছে। য়েমেন, ফার এবং অন্যান্য বহু দেশের লোকজন সর্বদা এখানে যাতায়াত করে। এজন্য এখানকার খাজাঞ্চীখানার আয় খুব বেশি। আলা-অল-মূলক আমাকে বলেছিলেন, শুধু এই শহরের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ ষাট লক্ষ মুদ্রা। এ-আয়ের বিশ ভাগের এক ভাগই স্বয়ং শাসনকর্তার প্রাপ্য। একদিন ঘোড়ায় চড়ে আলা-আল-মুলকের সঙ্গে আমি লাহারীর শত মাইল দূরে তারানা নামক এক সমতল ভূমিতে বেড়াতে যাই। যেখানে দেখতে পেয়েছিলাম বিভিন্ন জানোয়ার ও মানুষের অসংখ্য প্রস্তর-মূর্তি। মূর্তিগুলোর অধিকাংশই তখন বিকৃত ও বিধ্বস্ত-কোনটার মাথা, কোনটার বা পা মাত্র অবশিষ্ট আছে। যব, মটর, কলাই, মসুর প্রভৃতি শস্যের। আকৃতি বিশিষ্ট কতকগুলো পাথরও সেখানে রয়েছে। আর রয়েছে শহরের ও গৃহের প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ। খোদাই-করা পাথরের প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট একটি অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষও আমাদের দৃষ্টিগোচর হল। প্রকোষ্ঠের মধ্যস্থলে খোদাই করা পাথরের একটি বেদী। বেদীর উপরে পিঠমোড়াভাবে বদ্ধ অবস্থায় একটি মানুষের মূর্তি। জায়গাটায় দুর্গন্ধময় পানির একটা নহরও আছে। একটি দেয়ালের গায়ে রয়েছে ভারতীয় অক্ষরে শিলালিপি।
এ-শহরে পাঁচদিন কাটাবার পর আলা-অল-মূলক রাহা-করচ বাবদ প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে আমাকে বিদায় দিলেন। অতঃপর আমি রওয়ানা হলাম বাকার শহরের উদ্দেশ্যে। সুন্দর শহর এই বাকার। সিন্ধু নদীর একটি খাল বাকার শহরকে দ্বিধা-বিভক্ত করেছে। খালের উপরে চমৎকার একটি মুসাফিরখানা। রাহাগীদের এখানে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। বাকার ছেড়ে আমি উপস্থিত হই উজ (উ) শহরে। শহরটি অপেক্ষাকৃত বড়ো। চমৎকার বাজার এবং কোঠাবাড়ীবিশিষ্ট এই শহরটি নদীর পারে অবস্থিত। সে সময় শরীফ জালাল উদ্দিন আল-কিজি এখানকার শাসনকর্তা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক আর দয়ালু। আমাদের উভয়ের মধ্যে বেশ হৃদ্যতা জন্মেছিল। তার সঙ্গে আমার পুনরায় সাক্ষাৎ হয়-আমি যখন দিল্লীতে অবস্থান করছিলাম তখন। সুলতান। মাহমুদ দৌলতাবাদ রওয়ানা হবেন, আমাকে বলে গেলেন রাজধানীতে অবস্থান করতে। শরীফ জালাল উদ্দিন সে-সময় আমার কাছে প্রস্তাব করলেন, সুলতান ফিরে না আসা পর্যন্ত তার নিজের জমিদারীর আয়ে আমার ব্যয় নির্বাহ করতে। কারণ আমার নিজের খরচের জন্যে অনেক টাকার দরকার। আমি তার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে মোট পাঁচ হাজার দিনার তার জমিদারীর আয় থেকে পেয়েছিলাম। খোদা যেন শত গুণে এর প্রতিদান তাঁকে দেন!
উজ থেকে আমি হাজির হই মুলতানে। মুলতান সিন্ধুর রাজধানী এবং প্রধান আমীরের বাসস্থান।
মুলতান যেতে দশ মাইল দূরে একটি নদী, নাম খসরু-আবাদ। নদীটি বড়ো। নৌকার সাহায্য ছাড়া পার হবার উপায় নেই। যারা এখানে নদী পার হতে আসে, তাদের জিনিষ-পত্ৰ তল্লাশী করা হয়। সওদাগররা এ-পথে যা কিছু নিয়ে আসে তার এক–চতুর্থাংশ এখানে কর বাবদ দিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি ঘোড়ার জন্য দিতে হয় সাত দিনার। আমার জিনিষ-পত্রও তল্লাশী হবে এ-প্রস্তাব আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হল। সাধারণ লোকে যাই মনে করুক, আমার সঙ্গে মূল্যবান তেমন কিছুই ছিল না। খোদার অনুগ্রহে সে-সময়ে মূলতান শাসনকর্তার একজন উপচ্চপদস্থ কর্মচারী সেখানে এসে হাজির হন। তার হুকুমে আমি সেবার তল্লাশীর হাঙ্গামা থেকে রেহাই পাই। নদীর তীরেই আমাদের রাত্রি কাটাতে হল। পরদিন ভোরে দেখা হল স্থানীয় পোষ্ট মাষ্টারের সঙ্গে। শহরে বা জেলার যেখানে যা-কিছু ঘটে বা বিদেশের যে-কেউ আসে আগে তার সম্বন্ধে যথাযথ সংবাদ সুলতানকে পৌঁছে দেওয়া এ-ব্যক্তির কাজ। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় জমে ওঠে। তাকে সঙ্গে করেই আমি সুলতানের শাসনকর্তা কুতুব-আল-মূলকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই।
কুতুব-অল-মুলকের সম্মুখে হাজির হতেই তিনি নিজে দাঁড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং করমর্দন করে পার্শ্বে আসন গ্রহণ করতে বললেন। আমি তাঁকে উপহার দিলাম শ্বেতকায় একজন গোলাম, একটি ঘোড়া এবং কিছু কিমিস ও বাদাম। কাউকে উপহার দেওয়ার পক্ষে এ-সব জিনিষই উত্তম। কারণ, কিসমিস, বাদাম এ-দেশে জন্মায় না, খোরাসান থেকে আমদানী করতে হয়। শাসনকর্তার আসনটি কার্পেট মোড়া বেদীর উপরে। সিপাহসালাররা বসেন তার দক্ষিণে ও বামে, সাধারণ সৈনিকরা পাতে। সৈনিকদল পর্যবেক্ষণের কাজ তার সাক্ষাতেই হয়ে থাকে। তিনি কতকগুলো ধনুক রাখেন কাছে। কোনো সৈনিক তীরন্দাজের দলে ভর্তি হতে এলে তাকে একটা ধুনক দেওয়া হয় টানতে। ধুনকগুলো দৃঢ়তার তারতম্য হিসাবে পর-পর সাজানো থাকে। ধনুক ব্যবহারে সৈনিক যে পরিমাণ শক্তির পরিচয় দেয় তার প্রাপ্য বেতন সেই অনুপাতে নির্ধারিত হয়। কেউ ঘোড়সওয়ার সৈনিক হতে এলে তাকে দেওয়া হয় একটা ঘোড়। ঘোড়াটা কদমে চলতে থাকবে, সে অবস্থায় সৈনিক তার হাতের বর্শা দিয়ে। লক্ষ্য ভেদ করবে। তাছাড়া নিচু দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় একটা আংটা, ঘোড়সওয়ার চলন্ত ঘোড়র উপর থেকে চেষ্টা করে বর্শার সাহায্যে আংটাটা তুলে নিতে। চেষ্টা যার সফল হয় সেই সবচেয়ে ভাল ঘোড়সওয়ার। যারা ঘোড়সওয়ার তীরন্দাজ হতে চায় তাদের জন্য মাটিতে ফেলে রাখা হয় একটা বল। চলন্ত ঘোড়র উপর থেকে। বলটাকে বিদ্ধ করতে হবে তীর দিয়ে। এ ব্যাপারে যে যতটুকু সফলকাম হবে তার বেতন সে অনুপাতে কম-বেশি হবে।
